স্টাফ রিপোর্টার।।
অ্যাম্বুলেন্স সেবায় খুলনা নগর ও উপজেলাগুলোতে চলছে এক ধরনের নৈরাজ্য। সরকারি খাতে যেমন রয়েছে নানা অনিয়ম, বেসরকারি খাতেও চলছে স্বেচ্ছাচারিতা। একক ব্যক্তির মালিকানাধীন অ্যাম্বুলেন্স বৈধ নয়। এগুলোকে কোনো প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলাচল করতে হবে; কিন্তু কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করা হচ্ছে না খুলনায়। রোগী পরিবহনের মতো কোনো সুবিধা ছাড়াই সাধারণ মাইক্রোবাসকে অ্যাম্বুলেন্স বানিয়ে পথে নামিয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে বিআরটিএ দায় চাপায় পুলিশ প্রশাসনের ওপর। আর পুলিশ প্রশাসন দায়ী করছে বিআরটিএকে।
খুলনা সিটি ও উপজেলাগুলোতে বিআরটিএর রেজিস্ট্রেশন করা বৈধ অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা ১০৬; কিন্তু খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের সামনে প্রতিদিন দাঁড়ানো থাকে ১০০-১২০টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স। আছে ব্যক্তিমালিকানাধীন অ্যাম্বুলেন্সও। হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তির নামেও অ্যাম্বুলেন্স আছে।
সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও তা কেউই মানে না। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মালিক-চালকদের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাওয়াটা বেশ কঠিন। ৫০০ শয্যার খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ২৫০ শয্যার খুলনা জেনারেল হাসপাতাল ও শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, এসব হাসপাতালের রোগী পরিবহনে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবহার তেমন একটা হচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী পরিবহন করে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স।
বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের এক চালক জানান, দীর্ঘদিন ধরে অ্যাম্বুলেন্স চালান তিনি। এক হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার সঙ্গে আরেক হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার মিল নেই। সবচেয়ে বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে মরদেহ পরিবহনের ক্ষেত্রে।
অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে নানা সময়ে দুর্ভোগে পড়া তেলিগাতী গ্রামের ফাতেমা বেগম জানান, অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, তার বিন্দুমাত্রও নেই। অধিকাংশ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে নেই রোগী ও চিকিৎসকের বসার আসন, নেই সচল অক্সিজেন সিলিন্ডার ও প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। সাধারণ মাইক্রোবাসের মতো যাত্রী বসার সিট ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি আরও বলেন, মরদেহ বহনে এসব অ্যাম্বুলেন্স চালকরা মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো আচরণ করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতাল ও কয়েকটি উঁচু মানের বেসরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ছাড়া অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করা হয়েছে মাইক্রোবাস কেটে। ফলে এসব অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো নেই; আছে শুধু যাত্রী বসার আসন। রোগী নেওয়ার সময় সিট টেনে হাসপাতালের ট্রলিসহ এসব মাইক্রোবাসে ঢুকিয়ে নেওয়া হয়। রোগী না থাকলে সিট বসিয়ে দিয়ে যাত্রী আনা-নেওয়া করা হয়। অ্যাম্বুলেন্স হলে সাধারণ যে কোনো যানজট থেকে সহজে ছাড়া পাওয়া যায়। হরতাল অবরোধেও নির্বিঘ্নে চালানো যায়। এ সময় সুস্থ লোককে রোগী সাজিয়ে ভাড়া টানা যায়। পুলিশসহ প্রশাসনের কেউ অ্যাম্বুলেন্সের দিকে নজর দেয় না। বিশেষ করে নগরীর ময়লাপোতা থেকে শুরু করে সাত রাস্তা মোড় পর্যন্ত নানা কেটাগরির অ্যাম্বুলেন্স সড়কজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
খুলনাস্থ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্র বলছে, বর্তমানে খুলনা জেলায় অ্যাম্মুলেন্স রয়েছে ১০৬টি। এর মধ্যে খুলনা সিটিতে আছে ১৩টি এবং জেলায় রয়েছে ৯৩টি। বিআরটিএ খুলনা সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মো. তানভির আহমেদ বলেন, ‘লক্কড়ঝক্কড় অ্যাম্বুলেন্স ও অন্য যানকে অ্যাম্বুলেন্সে রূপান্তর করে কেউ কেউ এ ব্যবসা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের অ্যাম্বুলেন্স রোগীর জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। একক ব্যক্তির মালিকানাধীন অ্যাম্বুলেন্স বৈধ নয়। এগুলোকে কোনো প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলাচল করতে হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করার আগে বিআরটিএর অনুমোদন লাগে। একইভাবে বেসরকারি খাতেও বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালুর নিয়ম নেই। সরকারি বিধি অনুযায়ী অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের গাড়িতে রোগী ও চিকিৎসকের জন্য থাকতে হয় বিশেষ আসন বা শয্যা। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য থাকতে হয় সচল অক্সিজেন সিলিন্ডার ও প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জামের বাক্স। রোগীর অন্তত একজন স্বজন বসার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তা ছাড়া অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেওয়া বাধ্যতামূলক; কিন্তু এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করেই খুলনাজুড়ে চলছে অসংখ্য অ্যাম্বুলেন্স। এর বড় একটি অংশ দাঁড়িয়ে থাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের সামনে। এখানেই থাকে প্রায় ১০০-১২০টি অ্যাম্বুলেন্স। অপর অংশটি রয়েছে ময়লাপোতা থেকে সাত রাস্তা মোড় পর্যন্ত। এ সব অ্যাম্বুলেন্সের অধিকাংশেরই নেই ফিটনেস ও অনুমোদন।
খুমেক হাসপাতালের সরকারি অনেক স্টাফের ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এসব গাড়ির গায়ে ‘অ্যাম্বুলেন্স’ লেখা থাকলেও বৈধ কাগজপত্র নেই। কিছু অ্যাম্বুলেন্সের বিআরটিএর অনুমোদন রয়েছে। নগরী জুড়ে কেসিসির ফুটপাত দখলমুক্ত অভিযান চললেও বহাল তবিয়তে রয়েছে অবৈধ অ্যাম্বুলেন্সগুলো। বিষয়টি নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকরা রীতিমতো বাণিজ্য করেন। রেফার করা হাসপাতালে রোগী পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে রিজার্ভ বা লোকাল প্যাসেঞ্জার তুলে আনেন। এমনকি মদ, ইয়াবাসহ নানা অবৈধ পণ্য বহনেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে চালকদের বিরুদ্ধে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মনিরা সুলতানা বলেন, আমাদের কাছে এ ধরনের অভিযোগ নেই। সব ধরনের সড়কে ফিটনেসবিহীন পরিবহন চলাচল প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত আছে বলে তিনি দাবি করেন।
এ ব্যাপারে খুমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. হুসাইন সাফায়ত বলেন, হাসপাতালের মধ্যে ও বাউন্ডারির আশপাশে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স অবৈধভাবে জায়গা দখল করে থাকার বিষয়টি আমি সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ওসিকে বলেছি। তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ^াস দেন। এই চিকিৎসা কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমানে এ হাসপাতালে ৫টি অ্যাম্বুলেন্স আছে। সবকটিই সচল।
সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, খুমেক হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছেন। রাস্তা দখল করে অ্যাম্বুলেন্স রাখা ও সরকারি রাস্তা দখল করে থাকা অ্যাম্বুলেন্স চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।











































