-রকিবুল ইসলাম
উত্তরে হিমালয় এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মাঝে অবস্থিত বাংলাদেশ। ভৌগলিক এই অবস্থান বাংলাদেশকে যেমন সুবিধা প্রদান করেছে তেমনি অসুবিধাও নেহাত কম নাই। বাংলাদেশ একটি নীরব এবং অশুভ হুমকির মুখে আছে যা তার পৃষ্ঠের তলদেশে লুকিয়ে আছে। আর তা হলো – ভূমিকম্প। বাংলাদেশ একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। তাই এদেশে ভুমিকম্প সংঘটিত হলে তা কিরূপ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে তা সহযে অনুমেয়। যদিও প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অফ ফায়ার এবং অন্যান্য অঞ্চলগুলো প্রায়শই ভূমিকম্প সংঘটনের সাথে যুক্ত, তবুও বাংলাদেশও শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুকি থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু এই বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, ভুমিকম্প আসলে কি? ভূমিকম্প হচ্ছে ভূমির কম্পন। ভূ অভ্যন্তরে যখন একটি শিলা অন্য একটি শিলার উপরে উঠে আসে তখন ভূমি কেপে ওঠে। পৃথিবীপৃষ্ঠের অংশবিশেষের এই হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন বা আন্দোলনই ভূমিকম্প। হঠাৎ যদি ঘরের কোনো জিনিস দুলতে শুরু করে যেমন, দেয়ালঘড়ি, টাঙানো ছবি বা খাটসহ অন্য যেকোন আসবাব বুঝতে হবে ভূমিকম্প হচ্ছে। সহজ কথায় পৃথিবীর কেঁপে ওঠাই ভূমিকম্প। ভুমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাক-পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও ভুমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়া এখনো সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। ভুমিকম্পকে যে যন্ত্র দিয়ে পরিমাপ করা হয় তাকে বলা হয় সিসমোগ্রাফ এবং যে স্কেলে এটি প্রকাশ করা হয় তাকে বলা হয় রিখটার স্কেল।
বাংলাদেশে ভুমিকম্প ঝুকির প্রধান কারণ হলো এর ভৌগলিক অবস্থান। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলকে ভূমিকম্পের সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে কতকগুলো ভাগে বিভক্ত করা হয়। এর প্রতিটি অঞ্চলকে টেকটোনিক প্লেট বলা হয়। এ টেকটোনিক প্লেটের বৈশিষ্ট্য অনুসারে এক একটি ভূমিকম্প অঞ্চলের ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়েছে। বাংলাদেশ ভারতীয় এবং ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের সীমানার উপরে অবস্থিত। এ কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্প সংঘটনের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই প্লেটগুলির মধ্যে সংঘর্ষের ফলে ধীরে ধীরে শক্তি তৈরি হয়, যা ভূমিকম্পের আকারে প্রকাশিত হয়। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই অঞ্চলে মারাত্বক ভূমিকম্প না হলেও, ভূতাত্ত্বিক অবস্থা নির্দেশ করে যে, অদূর ভবিষ্যতে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটতে পারে। বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, “আমাদের এখানে মোটামুটি ৫টি ফল্ট লাইন আছে। ১৮৯৭ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের একটি ফল্ট লাইনে ৮ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। সীমান্ত এলাকায় এরকম আরও ২-৩টি ফল্ট লাইন আছে। দেশের ভেতরেও বঙ্গবন্ধু সেতুর আশপাশে এবং নোয়াখালীতে এরকম ফল্ট লাইন আছে।” (সূত্রঃ ডেইলি স্টার, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৩)।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি হল এর জনসংখ্যার ঘনত্ব। প্রায় ১৭ কোটিরও বেশি লোক এত অল্প জায়গায় বসবাস করায়, যে কোনো ভূমিকম্পের ঘটনা ব্যাপক ধ্বংস ও প্রাণহানির কারণ হতে পারে। রাজধানী ঢাকা সহ দেশের অনেক শহুরে অঞ্চলে অপরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। এসব ভবন ভুমিকম্প সহনশীল করে গড়ে তোলা হয় নি। ফলে মৃদু ভুমিকম্প অনুভুত হলেই এসব ভবনে ফাটল দেখা দেয়। বড় রকমের ভুমিকম্প হলে এই ভবনগুলো যে টিকবে না তা সহযেই অনুমেয়। বিশেষ করে পুরনো বিল্ডিংগুলো বেশী ঝুকিতে রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৯টি মেগাসিটিতে অধিকাংশ ভবনই টিকবে না। পুরো ঢাকা শহর সম্পর্কে বলা আছে, ৫৩ শতাংশ ভবন ও স্থাপনা বিনষ্ট হয়ে যাবে। আরও বলা আছে, যে পরিমাণ ধ্বংসস্তুপ এখানে তৈরি হবে, তা সরিয়ে নিতে ২৫ টনের একটি ট্রাককে ১২ লাখ বার যাতায়াত করতে হবে। সুতরাং আমরা কি পরিমাণ ঝুকিতে আছি তা এই গবেষণাতেই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির, যেখানে এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে, বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকম্পের হুমকিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই শিবিরগুলি এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ভূমিকম্প সংঘটনের ইতিহাস রয়েছে এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলি ভূমিকম্পের প্রভাবের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এই অরক্ষিত সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় কর্তৃপক্ষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভুমিকম্পকে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। প্রথমত, ভবন এবং অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর জন্য স্ট্রাকচারাল নকশাকে অবশ্যই ভূমিকম্প সহনশীল করে করতে হবে। শহরের বহুতল ভবনগুলো পরিকল্পনা ও নকশামাফিক হচ্ছে কি না তা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যথাযথভাবে তদারকি করতে হবে। যেসব বহুতল ভবন পুর্বেই নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো ভুমিকম্প সহনশীল আছে কি না তা পরীক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে দক্ষ প্রকৌশলী এবং বিশেষজ্ঞদ্রে নিয়ে একটি প্যানেল তৈরি করে দেশের সকল ভবনকে পরীক্ষা করতে হবে। যদি কোন ভবন ভুমিকম্প সহনশীল না হয় তাহলে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ফাউন্ডেশন ও কাঠামোর শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। তাও সম্ভব নাহলে ভবনটিকে ঝুকিপূর্ণ ঘোষণা করে যথাসম্ভব নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এবং নাগরিকদের প্রণোদনা দিয়ে এ সকল কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং কলাকৌশল শিখতে হবে। এক্ষেত্রে দুর্যোগকালীন করণীয় বিষয়ে মহড়ার আয়োজন করলে জনসচেতনতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
ভুমিকম্প সংঘটনকালীন শান্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি। কোন পতনশীল বস্তু থেকে রক্ষা পেতে কোন শক্ত আসবাবপত্রের (চেয়ার, টেবিল, খাট ইত্যাদি) নিচে অবস্থান করুন, ছিটকে যাওয়া প্রতিরোধ করতে মাটিতে শুয়ে পড়ুন এবং ঝাঁকুনি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এভাবে অবস্থান করুন। আপনি যদি ইতিমধ্যেই ভিতরে থাকেন তবে সেখানে থাকুন এবং জানালা এবং বড় আসবাব থেকে দূরে থাকুন। আপনি যদি বাইরে থাকেন, এমন একটি স্থান সন্ধান করুন যা খোলা এবং বিল্ডিং, গাছ অথবা অন্যান সম্ভাব্য বিপদমুক্ত। ভূমিকম্পের সময়, কখনও লিফট ব্যবহার করবেন না এবং প্রবেশপথের বাইরে থাকুন কারণ সেগুলো ভুমিকম্পকালীন নিরাপদ স্থান নয়। যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিন এবং আফটারশক সম্পর্কেও সচেতন হোন। আপনি এই বিষয়গলো মেনে চলার মাধ্যমে ভূমিকম্প সংঘটনকালীন সম্ভাব্য বিপদ থেকে নিরাপদ থাকতে পারবেন।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ যে ভুমিকম্পের নীরব হুমকির মুখে রয়েছে তা মোকাবেলায় বহুমুখী প্রশমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। ভৌত অবকাঠামো নকশাতে সিসমিক লোডকে অন্তর্ভুক্তীকরণ, পরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল অবকাঠামোগুলোকে রেট্রফিটিং এর মাধ্যমে শক্তিশালীকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সতর্ক ব্যবস্থা জোরদারের মাধ্যমে এই হুমকি মোকাবেলা করা সম্ভব। সরকারী সংস্থা, সম্প্রদায় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ ভবিষ্যত গড়ে তোলার জন্য আসুন আমরা ভুমিকম্প সম্পর্কে সচেতন হই এবং অন্যকে সচেতন করি।
পিআইডি, ফিচার/ লেখক-রকিবুল ইসলাম, তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।










































