Home Uncategorized গ্রেফতার এড়াতে রাত কাটে বাগানে: ঘর ছাড়া বিএনপি-জামায়াতের লাখ লাখ নেতাকর্মী

গ্রেফতার এড়াতে রাত কাটে বাগানে: ঘর ছাড়া বিএনপি-জামায়াতের লাখ লাখ নেতাকর্মী

44

-৩ মাসে গ্রেফতার ৩১ হাজার, মামলা দায়ের ১,১৬০টি, আসামি ৭৯,৭৭৮ জন, আহত ৮,৬০৪ জন, মৃত্যু ২৩ জন, মৃত্যুদণ্ডাদেশসহ সাজা ৫৮৮ জনের অধিক – ছেলেকে না পেয়ে বাবাকে হত্যা

 

ঢাকা অফিস।।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবিতে বিরোধী দলগুলো টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে দেশের ৬০টি বিরোধী রাজনৈতিক দল এ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এ আন্দোলন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গতকাল দেশের বিভিন্ন জেলার বিরোধী নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে বাড়ি-ঘরে থাকতে পরছে না। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই তাদের বাড়ি ছাড়তে হয়। নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় বাগানে, ট্রলারে বা ধানক্ষেতে। আর দিনের বেলা বাড়িতে থাকলেও তাদের ও পরিবারের প্রতিটা সেকেন্ড কাটে ভয় ও আতঙ্কে। পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে নতুন বউয়ের সাথে বাসর না করে পালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে। এমনকি বিএনপি নেতাকর্মীকে না পেয়ে তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতারসহ সরকারদলীয় নেতাকর্মী দ্বারা বড় ভাইকে না পেয়ে ছোট ভাইকে হত্যা, ছেলেকে না পেয়ে বৃদ্ধ বাবাকে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে।

বিএনপির দাবি, বিরোধী দলগুলোর এ আন্দোলন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত ২৮ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে নতুন ৮৯৮টি মামলায় মোট আসামি করা হয়েছে ৭৯ হাজার ৭৭৮ জন বিরোধী নেতাকর্মীকে। গ্রেফতার করা হয়েছে ২১ হাজার ৮৪১ জন বিএনপি নেতাকর্মী। মোট ৩২টি মামলায় বিএনপির ৯ জন নেতাকর্মীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশসহ ৫৭৯ জনের অধিক নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। একই সময়ে পুলিশ ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীর সাথে সংঘর্ষের ঘটনায় একজন সাংবাদিক ও বিএনপির ১৯ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৫৫৪ জনের অধিক নেতাকর্মী। ঘর ছাড়া লাখ লাখ নেতাকর্মী।
এ ছাড়া গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মহাসমাবেশের ৪-৫ দিন আগ থেকে গতকাল পর্যন্ত ৫০৫টির অধিক নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে। মোট ১৮ হাজার ৮৬০ জনের অধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে। আহত হয়েছে চার হাজার ৯৭৩ জনের অধিক নেতাকর্মী।

গত ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৩৬টি নতুন মামলায় আসামি করা হয়েছে ২৭ হাজার ১০০ জন নেতাকর্মীকে। গ্রেফতার হয়েছে ৬ হাজার ৮৪৫ জনের অধিক নেতাকর্মী। আহত হয়েছে ৯১৭ জনের অধিক। মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের।

সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের ২৩০ জনের অধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে। নতুন মামলা হয়েছে ১০টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৯৮৫ জনকে। সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের হামলায় আহত হয়েছে ৫০ জন। এসব ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে একজনের।

এ দিকে গত ২৮ অক্টোবরের পর জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে নতুন মামলা হয়েছে ২৬২টি। গ্রেফতার করা হয়েছে ২ হাজার ৮৫৭ জনকে। পুলিশের গুলি ও গুপ্ত হামলায় আহতসহ মোট আহত হয়েছে ৫৫০ জন। গুপ্ত হামলায় নিহত হয়েছে তিনজন। তাদের মধ্যে রাজশাহীতে দুইজন ও রংপুরে একজন। এ ছাড়াও সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকা অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর অসংখ্য নেতাকর্মী হামলা-মামলা ও গ্রেফতারের শিকার হচ্ছে।


গ্রেফতার আতঙ্কের বিষয় জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী  বলেন, সরকার ’৭২-৭৫ এর বাকশালের মতো আরেকটি বাকশাল কায়েম করেছে। ’৭২-৭৫ এ যেমন বিরোধী নেতাকর্মীদের না পেয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো আজো তাই হচ্ছে। ’৭২-৭৫ সালে মানুষকে যেমন ঘর ছেড়ে বনে-জঙ্গলে ঘুমাতে হয়েছে আজো তাই হচ্ছে। তাই বলবা এ দেশের মানুষ গণবিস্ফোরণের মাধ্যমে এই সরকারের পতন নিশ্চিত করবে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, সরকার নির্বিচারে ধরপাকড় করে আন্দোলন দমাতে চাচ্ছে। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুপ্ত হামলা চালিয়ে বিরোধী নেতাকর্মীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করার অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।

তাঁতী দলের সদস্যসচিব হাজী মজিবুর রহমান বলেন, জাতীয়তাবাদী তাঁতী দল করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁত শিল্পীরা। আজকে তারা বাড়িঘর এমনকি তাদের কর্মস্থলেও থাকতে পারছে না। গ্রেফতার আতঙ্কে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এতে করে দেশের তাঁত শিল্পীদের অসম্মান করার পাশাপাশি দেশের তাঁত শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেন, সারা দেশে সরকার একটি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী গ্রেফতার আতঙ্কে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না।

ঝালকাঠি জেলা বিএনপি নেতা গোলাম আজম সৈকত বলেন, পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ভয়ে আমার এলাকার কোনো নেতাকর্মী রাতে ঘরে ঘুমাতে পারে না। নদীতে থাকা ট্রলারে অথবা ধানক্ষেতে নির্ঘুম রাত কাটে বিএনপি নেতাকর্মীদের। এ রকম ঘটনা বর্তমান বিশ্বে বিড়ল।

নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও রূপগঞ্জ উপজেলা যুবদল নেতা শফিকুল ইসলাম শফিক  জানান, পুলিশের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার বাড়িসহ রূপগঞ্জের বিভিন্ন নেতাকর্মীর বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা এখন ভয়ে ক্ষেত-খামার ও বাগানে রাত কাটাচ্ছেন।

রাজধানীর ওয়ারী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়সাল মেহবুব মিজু বলেন, গত ৮ ডিসেম্বর তাকে বাসায় মিজুকে খুঁজতে এসে তাকে না পেয়ে তার বৃদ্ধ বাবাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা।