Home কলাম চাটুকারিতার পরিণাম

চাটুকারিতার পরিণাম

151

অধ্যক্ষ মো: নাজমুল হুদা।।
চাটুকারিতা বা তোষামোদি এক ভয়ংকর অস্ত্র। চাটুকারিতার অপর অর্থ মোসাহেবি করা যা দিয়ে সহজেই শত্রুকে বশীভূত করা যায়। চাটুকারিতার মাধ্যমে অন্যের নিকট হতে সহজেই অনৈতিক সুবিধা হাসিল করা যায়। মূলত চাটুকারিতার মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের কোনো অকল্যাণ ছাড়া কল্যাণ সাধিত হয় না। হাদিস শরিফে মহানবী সা: বলেছেন, তোমার সম্মুখে কেউ যদি তোমার প্রশংসা করে তাহলে তার মুখে মাটি ছুড়ে মারো। অর্থাৎ প্রশংসাকারীর প্রশংসায় বিগলিত হয়ে সত্যানুসন্ধ মনকে হত্যা করো না। প্রশংসায় অবগাহিত হলে নিজের কর্ম স্পৃহা হ্রাস পায়। অনেক ক্ষেত্রে চাটুকারিতার কারণে মানুষ কল্যাণকর কর্ম ছেড়ে দিয়ে অকল্যাণকর কর্মে নিয়োজিত হয়ে পড়ে। অপর দিকে গঠনমূলক সমালোচনা মানুষের চরিত্র গঠনে সহায়ক। সমালোচনা মানুষের ভুলকে শুধরে নিতে সহায়তা করে। সে কারণে বলা যায়, গঠনমূলক বা সত্যানুসন্ধ সমালোচক মানুষের শত্রু নয়, বরং সে মানুষের বন্ধু। ইসলামী শরিয়তে যেকোনো অন্যায় কর্মের প্রতিবাদ করা জিহাদের সমতুল্য।

ইসলামে অন্যায় বা অনৈতিক কর্মের প্রতিবাদের তিনটি স্তর রয়েছে। ১. সম্ভব হলে যে কোনো অন্যায় কর্মকে হাত দিয়ে বা সরাসরি প্রতিরোধ করা। ২. সে পরিবেশ না থাকলে মুখ দিয়ে সমালোচনা করা। ৩. সে পরিবেশও না থাকলে মনে মনে ঘৃণা করা। তৃতীয় স্তরটি হলো একজন মুমিনের জন্য সর্বনিম্ন স্তর। এ তিন স্তরের কোনো দায়িত্ব পালন না করলে তা ঈমানের ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হবে। আমরা জানি, খোলাফায়ে রাশেদার যুগে ইসলামের মহান দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রা: একদা মসজিদে নববীতে বক্তৃতারত ছিলেন। সে সময় একজন সাধারণ মুসলমান দণ্ডায়মান হয়ে খলিফার কাছে তার কর্মের জবাবদিহিতা চেয়েছিলেন। মহান খলিফা সে যুবকের প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রদান করে তাকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। খলিফার সামনে সরাসরি তার কর্মের জবাবদিহিতা চাওয়াতে তিনি কোনো অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি। প্রকৃত পক্ষে ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণার্থে কারো সমালোচনা করতে হলে তার অনুপস্থিতিতে না করে তার সম্মুখেই করা উচিত। সমালোচিত ব্যক্তিরও কর্তব্য, প্রকৃত সমালোচনাকারীকে তিরস্কার না করে পুরস্কৃত করা। অপর দিকে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে কারো প্রশংসা করতে হলে তার অনুপস্থিতিতেই করা কর্তব্য। কোনো মহৎ কার্যের প্রশংসা করার উদ্দেশ্য সে মহৎ কর্মকে সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা করা।

আমরা জানি, বিগত সময়ে অনেক ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্র তোষামোদির আশ্রয় গ্রহণ করাতে সার্বিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। উসমানীয় খিলাফতের অবক্ষয়ের যুগে খলিফাদের অনেকে প্রকাশ্য দরবারে মদ্য পান করতেন। একশ্রেণীর তোষামোদকারী তাদের এ অন্যায় কর্মকে সমর্থন করতেন। সে শ্রেণীর ভেতরে নামধারী কিছু আলেম ও ছিলেন। খলিফার সূরা পানকে বৈধতা দেয়ার জন্য তারা মহানবী সা: একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিতেন যে হাদিসটি এখনো আমাদের দেশে প্রতি জুমার খুতবায় পঠিত হয়ে থাকে। হাদিসটির ভাষ্য ‘সুলতান বা রাষ্ট্র প্রধান পৃথিবীতে আল্লাহপাকের ছায়াস্বরূপ’। চাটুকাররা এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলতেন, রাষ্ট্র প্রধান যেহেতু আল্লাহপাকের ছায়াস্বরূপ সে কারণে সে যে কাজই করবে তা বৈধ। অথচ এ হাদিসের তাৎপর্য এই যে, ন্যায়পরায়ন সুলতান বা রাষ্ট্র প্রধান পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা ছায়াস্বরূপ। অপব্যাখ্যার মাধ্যমে এ হাদিস দ্বারাই চাটুকাররা রাষ্ট্রপ্রধানদের অনৈতিক কর্মে সহায়তা করতেন। এ ধরনের তোষামোদকারীদের তোষামোদে সিক্ত হয়ে তৎকালীন উসমানীয় খলিফাদের অনেকে অসামাজিক কর্মকাণ্ড বা পাপাচারে লিপ্ত হয়ে তাদের কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলেছিলেন।

পরিণতিতে তারা নিজের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বড় ক্ষতির কারণ হয়েছিলেন। তাদের কর্মের পরিণতি এমন হয়েছিল যে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য উসমানীয় খিলাফতের রাজত্ব ইতিহাসের পাতা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ভারত বর্ষে মোঘল সাম্রাজ্যে মোঘল বাদশাহদের অভিবাদনের জন্য অনইসলামিক বা কুপ্রথা চালু হয়েছিল। প্রথাটা এমন ছিল যে, মোঘল রাজ দরবারে কাউকে বাদশাহ এর সম্মুখে হাজির হতে হলে তাকে বাদশাহকে দাড়িয়ে সালাম, কুর্নিশ ও সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতো না।

বাদশাহকে মাথা নিচু করে, অনেক ক্ষেত্রে ভূমিতে অবনত হয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে হতো যে রীতি বা প্রথা ছিল সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী বা শিরক। অথচ একশ্রেণীর চাটুকার ও মোসাহেবরা বাদশাহের এসব অনৈতিক কর্মকে সমর্থন প্রদান করতেন। সেসব চাটুকারদের মধ্যে মন্ত্রী ও আমলাদের অনেকেই ছিলেন। যে সব মহান ব্যক্তি এসব কুপ্রথার বিরোধী ছিলেন তারা বাদশাহের রোষানলের ভয়ে প্রতিবাদ করতে সাহস পেতেন না। সে যুগের ভারত বর্ষের শ্রেষ্ঠ বুজর্গ ও আলেম মোজাদ্দিদে আলফে সানি শেখ আহমদ সেরহিন্দি এ কুপ্রথা ও শিরকের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন। যে কারণে বাদশাহ তার প্রতি রুষ্ট বা ক্রোধান্বিত হন। বাদশাহের মোসাহেব ও চাটুকাররা বাদশাহকে মোজাদ্দিদ শেখ আহমদ সাহেবের বিরুদ্ধে বাদশাহের কানে নানাভাবে প্ররোচনা দিতে থাকে। তারা বাদশাহকে বোঝায় যে, মোজাদ্দিদ সাহেব আপনাকে মাথা অবনত করে সম্মান জানানোর কেবল বিরোধিতাই করছেন না; বরং তিনি আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করছেন। আপনি যদি বিষয়টি আরো বিশদভাবে উপলব্ধি করতে চান, তাহলে রাজ দরবারের সম্মুখে একটি নিচু তোরণ তৈরি করুন। অতঃপর মোজাদ্দিদ সাহেবকে আপনার দরবারে আহ্বান করুন। তাহলে বোঝা যাবে, মোজাদ্দিদ সাহেব আপনাকে’ কিভাবে বা কতটুকু সম্মান প্রদর্শন করেন।

পরিকল্পনা মাফিক একটি সুসজ্জিত তোরণ তৈরি করা হলো। অতঃপর মোজাদ্দিদ সাহেবকে দরবারে আমন্ত্রণ জানানো হলো। মোজাদ্দিদ সাহেব নির্দিষ্ট দিনে যথারীতি বাদশাহর দরবারে হাজির হলেন। তিনি এ নিচু তোরণ তৈরির উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে নিচু তোরণের নিচে মাথা অবনত না করে এক পা সামনে দিয়ে সোজা হয়ে বসে মাথা উঁচু করে ভেতরে প্রবেশ করলেন। চাটুকাররা বাদশাহকে বোঝালেন যে, মোজাদ্দিদ সাহেব আপনাকে সম্মান তো করলেনই না বরং আপনাকে অপমানিত করলেন। মূলত মানুষ আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তা ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথা নত করতে পারে না। চাটুকারদের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে বাদশা প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে বাদশাহকে অপমানিত করার জন্য মোজাদ্দিদ সাহেবকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন যদিও পরে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ও জ্ঞানী সভাসদগণ, মন্ত্রী ও আমলারা বিশেষত জনসাধারণের প্রতিবাদের মুখে বাদশাহ তার প্রহসনমূলক মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। মোজাদ্দিদ সাহেবের প্রতিবাদের কারণে মোঘল রাজ দরবারের এ কুপ্রথা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে চাটুকারের অভাব নেই।

মূলত চাটুকাররাই চাটুকারিতার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের নিকট হতে অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে চলেছেন। এমনকি নামধারী অনেক আলেম-ওলামা ও পীর মাশায়েখরা বর্তমানে চাটুকার পরিবেষ্টিত অবস্থায় চলাফেরা করেন। তোষামোদকারীদের কারণে তারা অনেক ক্ষেত্রে বিব্রত অবস্থার সম্মুখীন হন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বর্তমানে আমরা কোনো ধরনের সমালোচনা তা ভালো হক বা মন্দ হোক, সহ্য করতে রাজি না। সে কারণে সমাজ ও রাষ্ট্র হতে গঠনমূলক সমালোচনাও ক্রমান্বয়ে তিরোহিত হয়ে যাচ্ছে। অধিকন্তু অন্যায় কাজের সমালোচনাকারীদের বা প্রতিবাদকারীদের কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে। আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে এ অন্যায় সংস্কৃতি পরিহার করা একান্ত কর্তব্য।

লেখক : গবেষক, কলামিস্ট।