Home কলাম সুনীল অর্থনীতির উর্বর ক্ষেত্র বঙ্গোপসাগর

সুনীল অর্থনীতির উর্বর ক্ষেত্র বঙ্গোপসাগর

12

-রকিবুল ইসলাম

 

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে চিরাচরিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা খাপ খাওয়াতে পারছে না। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মত মৌলিক চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ফলে বিশ্ববাসী এক অনিশ্চিত অনিরাপত্তা সর্বদা অনুভব করছে। ক্রমবর্ধমান এই চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞেও আনা প্রয়োজন বৈপ্লবিক পরিবর্তন। অর্থনীতির ভিত্তিকে টেকসই, ফলপ্রসু এবং সহজলভ্য করা প্রয়োজন যেন প্রান্তিক পর্যায়ে এর সুফল পাওয়া যায়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং অর্থনীতিকে আরো টেকসই, আরো বেগবান করতে ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি ধারণার উদ্ভব। বর্তমান সময়ের বিশ্ব ব্যবস্থায় সুনীল অর্থনীতি অন্যতম সাড়া জাগানো বিষয়।

সাধারণভাবে সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি বলে। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি না করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নত জীবিকা এবং কর্মসংস্থানের জন্য সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহারকে ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি বলে। ১৯৯৪ সালে অধ্যাপক গুন্টার পাউলি সুনীল অর্থনীতিকে ভবিষ্যত অর্থনীতির একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেন। ২০১২ সালে রিও+২০ সম্মেলনের পর থেকে সুনীল অর্থনীতি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এসডিজি’র ১৪ নং লক্ষ্য সুনীল অর্থনীতির কথা মাথায় রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর যত পরিবেশ সম্মেলন হয়েছে সবখানেই সুনীল অর্থনীতির গুরুত্ব ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সমুদ্র অর্থনীতির কয়েকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র নির্ধারণ করেছে যা আগামী দিনের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হবে। নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস, মৎস্য সম্পদ, সামুদ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা, পর্যটন শিল্প, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টসহ আরো অনেক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করবে এই তুমুল আলোচিত সুনীল অর্থনীতি।

বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণী, উদ্ভিদ ও মাছ থেকে। সমুদ্রতলের বিভিন্ন তেল ও গ্যাসক্ষেত্র পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানী তেলের যোগান দিচ্ছে। সমুদ্রকে ঘিরে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকান্ড সংঘটিত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্যের ৯০ ভাগ সম্পন্ন হচ্ছে সমুদ্রের মাধ্যমে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের খাদ্য ও শক্তির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে ৯০০ কোটি। তাছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বৃদ্ধির সাথে সাথে শক্তি চাহিদা বিপুল পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছে। ফলে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও শক্তির জন্য সমুদ্র অর্থনীতির দিকে ধাবিত হতে হচ্ছে বর্তমান বিশ্বকে।

সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মায়ানমারের সাথে বাংলাদেশের বিবাদ বহু পূরনো। অবশেষে ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের কাছ থেকে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশ লাভ করেছে। এই সমুদ্র বিজয়ের ফলে ১২ নটিক্যাল মাইল রাজনৈতিক সীমা, ২০০ নটিক্যাল মাইল এক্সক্লুসিভ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল হতে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরণের প্রাণীজ-অপ্রাণীজ সম্পদের ওপর পেয়েছে একচ্ছত্র অধিকার। মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রে বিরোধপূর্ণ ১৭টি ব্লকের মধ্যে ১২টি এবং ভারতের কাছ থেকে ১০টি ব্লকের ১০টিই বাংলাদেশ লাভ করেছে। সমুদ্রসীমায় এই বিজয় সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে বাংলাদেশের জন্য। বঙ্গোপসাগরের এই সমুদ্র সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

বঙ্গোপসাগরে বিপুল পরিমাণ জলরাশির উপর আমাদের সার্বভৌমত্ব থাকলেও তার যথাযথ ব্যবহার এখনও হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের জিডিপিতে সমুদ্র খাতের অবদান যতটা থাকার কথা ততটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বঙ্গোপসাগরে প্রাণীজ ও অপ্রাণীজ উভয় সম্পদে পরিপূর্ণ। প্রাণীজ সম্পদের মধ্যে সামুদ্রিক প্রাণী, মৎস্য, শেওলা ও অন্যান্য উদ্ভিদ উল্লেখযোগ্য। চারটি মৎস্যক্ষেত্র রয়েছে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় যেখানে ৪৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ৭ প্রজাতির কচ্ছপ, ৩ প্রজাতির তিমি, ১০ প্রজাতির ডলফিনসহ প্রায় ২৮০ প্রজাতির সামুদ্রিক ঘাস রয়েছে। রুটাইল, জিরকন, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট, মোনাজাইট ইত্যাদিসহ ১৭ ধরণের মূল্যবান খণিজ বালি পাওয়া যায় যার মজুতের পরিমাণ প্রায় ৪৪ লাখ টন। এর মধ্যে প্রকৃত সমৃদ্ধ খনিজের পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন। এগুলো বঙ্গোপসাগরের ১৩টি স্থানে পাওয়া যায়। তাছাড়া সমুদ্রের পানি এবং সৌরশক্তি ব্যবহার করে অপরিশোধিত লবণ উৎপাদন করে লবণ চাষীরা।

 

ব্লু ইকোনমির যাদুর ছোঁয়ায় বহুদেশের ভাগ্য বদলে গেছে। বিশ্বের বহুদেশ ব্লু ইকোনমিকে কাজে লাগিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে। অস্ট্রেলিয়া সমুদ্র থেকে বছরে ৪৭.২ বিলিয়ন ডলার আয় করছে এবং ২০২৫ সালে এই আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আয়ারল্যান্ড, মরিশাস, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশ ব্লু-ইকোনোমিকে কাজে লাগিয়ে তাদের জিডিপির আকার বাড়িয়েছে। গ্লোবাল ওশান কমিশন (২০১৪) এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় উৎপাদিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মোট রাজস্ব এর পরিমাণ প্রায় ২.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (এড়ষফবহ বঃ ধষ.২০১৭)। ব্লু ইকোনমির এই বিপুল কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে আছে।

 

বঙ্গোপসাগরে প্রতিবছর প্রায় ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ ধরা হলেও আমরা মাত্র ০.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ ধরতে পারছি (কালের কন্ঠ,১ জুন ২০১৭)। সমুদ্রের আকার আমাদের স্থলভাগের প্রায় সমপরিমাণ হলেও আমাদের মোট মৎস্য সম্পদের মাত্র ১৫.৪২% আসে সমুদ্র থেকে। পার্শ্ববর্তী মায়ানমার বঙ্গোপসাগরে গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে এবং গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো তেল গ্যাসের সঠিক তথ্য নিরূপণ করতে পারেনি। আমাদের স্থল্ভাগের গ্যাসের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাই বঙ্গোপসাগরের খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য আরো তৎপর হওয়া এখন সময়ের দাবি। নেপাল, ভুটান, ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ শুল্ক আয় করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রসম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। পর্যাপ্ত নীতিমালার ও সঠিক কর্মপরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, দক্ষ জনশক্তি, সঠিক তথ্য, উন্নত যোগাযোগের অভাবে বাংলাদেশ ব্লু ইকোনোমিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না।

 

ব্লু ইকোনমিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে প্রাণীজ ও অপ্রানীজ সম্পদ আহরণের জন্য উন্নত সার্ভে ইকুইপমেণ্ট ক্রয়, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা ও উন্নয়ন ইত্যাদি আরও জোরদার করতে হবে। উপকূলীয় তটরেখায় নিরাপদ পর্যটন এলাকা গড়ে তুলতে হবে। পর্যটন এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন, আকর্ষণীয় রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল ইত্যাদি আধুনিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা গেলে ইন্দোনেশিয়া-মালদ্বীপের মত বাংলাদেশও পর্যটন খাত থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে।

 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমুদ্র অর্থনীতির গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭৪ সালে ‘ ঞযব ঞবৎৎরঃড়ৎরধষ ডধঃবৎং ধহফ গধৎরঃরসব তড়হবং অপঃ’ নামক একটি আইন প্রণয়ন করেন। সুনীল অর্থনীতির গুরুত্ব উপলদ্ধি করে ২০১৭ সালে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্লু ইকোনমি সেল গঠন করা হয়েছে। ২০১৯ সালে মেরিটাইম জোন এক্ট করা হয়েছে সমুদ্র সম্পদ সুরক্ষার জন্য। সমুদ্রে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও নজরদারি বৃদ্ধির জন্য ২০১৬ সালে চীনের নিকট থেকে দুইটি সাবমেরিন ক্রয় করা হয়েছে। সুনীল অর্থনীতির বহুমুখী ব্যবহার ও গবেষণার জন্য বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইন্সটিটিউট গঠন করা হয়েছে। পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবহারের জন্য সরকার ডেল্টা প্লান-২১০০ নামক একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ব্লু ইকোনমির গুরত্ব তুলে ধরতে সরকার সেমিনার, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সভা-সমাবেশ, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ইত্যাদি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

 

বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় আমরাও নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন রয়েছি। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভূক্তি, ২০৩১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতকরণ, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দারিদ্র্যমুক্ত একটি স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ। আগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তাসহ দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার। সমুদ্র সম্পদের এই বিশাল ভাণ্ডার সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা অনেকখানি সহয হয়ে যাবে। পিআইডি ফিচার/ লেখক-রকিবুল ইসলাম, তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।