Home কলাম শ্রদ্ধাঞ্জলি: সময়ের মানুষ আনিসুজ্জামান

শ্রদ্ধাঞ্জলি: সময়ের মানুষ আনিসুজ্জামান

12

 সেলিনা হোসেন

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন মুক্তচিন্তার মানুষ; সংস্কৃতির বহুত্ববাদে বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িক, নিজের ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, প্রগতিশীল চিন্তায় স্নাত। এমন আধুনিক চিন্তার মানুষ সমাজ-পরিম-লে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। যে কেউ তার কাছে আধুনিকতার পাঠ গ্রহণ করতে পারে। একুশ এবং একাত্তরের মতো জাতীয় ঘটনাকে তিনি নিজের কর্মে এবং সৃজনে ধারণ করেছেন। ১৯৫২ সালে সংঘটিত ভাষা আন্দোলনে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকাশে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “কিন্তু তার আগেই সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে গেছে ভাষা আন্দোলন। পেনসিলে লেখা হয়ে গেছে। ‘অমর একুশে’ কবিতা, ছাপাও হয়ে গেছে বোধহয় ফজলুল হক হল বার্ষিকীতে। সেই থেকে মাথায় ঘুরছে একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনের পরিকল্পনা। আমিনুল ইসলাম প্রচ্ছদ করেছেন। মুর্তজা বশীরের লেখা ছাড়াও স্কেচ যাচ্ছে। কোনোমতে কাগজের দামটা জোগাড় হয়েছে, বাকিতে তৈরি হচ্ছে ব্লক, বাকিতে ছাপা হচ্ছে প্রেসে। আবদুল্লাহ আল মুতীর লেখা বেনামিতে সম্পাদকীয় মুখবন্ধ হিসেবে ছাপা হলো। উৎসর্গপত্রটি হাসান একবার লেখেন, আমি একবার। চূড়ান্ত রূপটা যখন পছন্দ হলো, হাসান স্থির করলেন, আমার হাতের লেখাটা ব্লক করেই ছাপা হবে বইতে। তা-ই হলো।” এভাবে তিনি তরুণ বয়স থেকেই দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি বুঝেছেন। বুঝেছেন গভীর এবং নির্ভুলভাবে।

১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের সামরিক সরকার বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে সুশীল সমাজ। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বিবৃতি সংগ্রহের উদযোগী ছিলেন। ১৯৬৮ সালে তিনি ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে প্রায় চারশ পৃষ্ঠার প্রবন্ধ সংকলন সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। সে সময়ে এ বইয়ের প্রকাশ ছিল একটি সময়োপযোগী দুঃসাহসী উদ্যোগ। ইতিহাসের পক্ষে তিনি নিজের ভূমিকাকে আগাগোড়াই বলিষ্ঠ রেখেছেন। ১৯৭১। বাঙালি জাতির জীবনে এক শ্রেষ্ঠ সময়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আগরতলা হয়ে কলকাতায় যান। তার ছাত্র ড. মাহবুবুল হক লিখেছেন, ‘একাত্তরের জুন মাসের ৪-৫ তারিখের দিকে আমিও আগরতলায় পৌঁছাই। সেখানে স্যারকে দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। তিনি সেখানে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করছেন। এমনকি যে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে আগরতলায় পৌঁছেছেন সেটিও মুক্তিযুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগরতলায় ক্র্যাফটস হোস্টেলে থাকার সময়ে এবং কর্তাবাড়ি ক্যাম্প পরিচালনার কাজে মাঝেমধ্যেই সে গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছি।’

তিনি কলকাতায় এসে প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা সেলের সদস্য হিসেবে ছয় মাস দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ আল জামান লিখেছেন, এই সময় আনিসুজ্জামান শুধু বাংলাদেশের শিক্ষকদের সংগঠিত করেননি, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগ্রহের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। মুজিবনগর সরকারের প্ল্যানিং সেলের সদস্য হয়ে কত ধরনের কাজেই না ব্যাপৃত হয়েছিলেন। তিনি এই সময়ে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকেও নানা বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা ভাষ্য রচনার প্রধান দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সাবলীল ভাষায় রচিত সংবিধান সবার কাছে যে বোধগম্য হয়ে উঠেছিল, সে ভাষার উদাহরণ এমন (২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে। দেশের সুশীল সমাজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গোলাম আযমের বিচারের জন্য গণআদালতের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই আদালতে বিচার চলাকালে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগনামা পাঠ করেছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। এই ভূমিকার কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। দেশদ্রোহিতার মামলা দায়ের হয়েছিল। জনগণ, গণআন্দোলন, গণআদালত ইত্যাদি শব্দের বহুবচনজ্ঞাপক ‘গণ’ প্রত্যয়টিকে তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি সর্বদাই একাত্ম থেকেছেন। এভাবে তিনি নিজেকে জনগণের একজন করে তুলেছেন। বিভিন্ন সময় তিনি তার বক্তৃতায়, সাক্ষাৎকারে অকপটে বলেছেন দেশের সব গণআন্দোলনে বুদ্ধিজীবীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। স্পষ্টত বোঝা যায় যে জনবিচ্ছিন্ন হওয়া তার জীবনের দর্শন ছিল না।

একুশ আর একাত্তর ইতিহাসের এক আশ্চর্য মিল। এ দুটি শব্দই বাংলা বর্ণমালার ‘এ’ বর্ণ দিয়ে শুরু। স্বরবর্ণের ‘আ’ অক্ষর দিয়ে লিখিত হয়েছে আনিসুজ্জামানের নাম। তিনি ইতিহাসের দুটি সময় প্রবাহকে নিজের জীবনে ছুঁতে পেরেছেন। দুই সময়ে সক্রিয় থেকে সময়ের মানুষ হয়েছেন। বস্তুত সময়কে তিনি কখনো ছেড়ে যাননি। সময়ের স্বাভাবিক চলাতেও তিনি সমান সক্রিয় থেকেছেন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার জন্য তার চেষ্টা প্রশ্নহীন। বিভিন্ন আলোচনা সভা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি সাংস্কৃতিক পরিম-লকে সুস্থ, নির্বিরোধ করে রাখার উপাদান জোগায়। সেইসব সমাবেশে তার মুক্ত কথামালা সামগ্রিকভাবে মানবিক ভাবনার শুভ ও কল্যাণের দিকটিই উজ্জ্বল করে তোলে। অসাম্প্রদায়িক মানবিক বোধে উজ্জীবিত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এ সময়ের একজন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মানুষ। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার ডিগ্রি প্রাপ্তি একজন গবেষকের সাধনার স্বীকৃতি শুধু নয়, তা সেই মানুষটির বহুমাত্রিক জ্ঞানেরও স্বীকৃতি। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে কেউ বড় হতে পারেন না, যদি না তার সঙ্গে মানুষের কল্যাণচিন্তাকে জাগিয়ে তোলার নানামুখী চেষ্টায় তিনি সক্রিয় থাকেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এই ধরনের মানুষ।

এখানে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই। ১৯৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রাজশাহী নিউমার্কেটের ‘বইপত্র’ নামক একটি দোকান থেকে আমি বইটি কিনি। তখন পর্যন্ত আমি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে সামনাসামনি দেখিনি। এখনো বইটি আমার কাছে আছে। ১৯৬৬ থেকে ২০২০ দীর্ঘ চুয়ান্ন বছর। এ বইয়ের অবতরণিকা অংশে তিনি লিখেছেন, মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের অবদানে সমৃদ্ধ। এর তুলনায় আধুনিক বাংলাসাহিত্যের ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের পশ্চাৎপদতা বিস্ময়কর। বাংলাসাহিত্যের উৎসাহী পাঠকমাত্রই লক্ষ করেছেন যে, ১৮০০ থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ আধুনিক বাংলাসাহিত্যের প্রস্তুতিপর্বে বাঙালি মুসলমান সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয়। অথচ তাদের সাহিত্যানুরাগ বা সৃষ্টিক্ষমতা যে লোপ পায়নি তার প্রমাণ আরবি-ফারসি শব্দবহুল কাব্যধারার মধ্যে পাওয়া যায়। এই রীতির কাব্য অবশ্য রসে-রূপে বিচিত্র নয়, দৃষ্টিভঙ্গির পরিচ্ছন্নতাও সেখানে অনুপস্থিত। বাংলাসাহিত্যে মুসলিম-সাধনার ইতিহাসে এই কাব্যধারা মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের মধ্যে ঐতিহাসিক সূত্র রক্ষা করেছে মাত্র। এভাবে বাঙালি মুসলমানের সৃষ্টিশীলতাকে তিনি নির্মোহ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তরুণ বয়সে তার লেখা থেকে পাওয়া এই স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি নিজের ভেতরের বোধকে গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত সহায়ক ছিল। এজন্য তিনি আমার শ্রদ্ধেয়।

ড. আহমদ শরীফ এই বইটি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এ এমন একটি বই, যা একবার পড়ে ফেলে রাখার মতো নয়, বারবার পড়ার প্রয়োজন এবং প্রতিবারেই নতুন নতুন তথ্য ও তত্ত্বের উদ্ভাস ঘটে এবং চিন্তার উদ্দীপন হয়। তিনি এই বইয়ে পেয়েছেন লেখকের সুষ্ঠু চিন্তার এবং নিরপেক্ষ ও পরিচ্ছন্ন উদার দৃষ্টির প্রসূন।’ আরেকজন গবেষকের পর্যবেক্ষণ আনিসুজ্জামানের গবেষণাকাজের গভীরতা মূল্যায়ন করে। ফরাসি ভাষার অধ্যাপক ফ্রাঁস ভট্টাচার্য লিখেছেন : Professor Anisuzzaman has all the qualities of a great man and a great scholar.. শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিনটন বি সিলি লিখেছেন :  As impressive as he is as a truly good human being, Anis bhai is equally impressive and respected as a productive and wide ranging scholar.

বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে তার বইয়ের সংখ্যা অনেক। তিনি শহীদ মুনীর চৌধুরী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোতাহের হোসেন চৌধুরীর জীবনী লিখেছেন। আমার একাত্তর এবং কাল নিরবধি গ্রন্থদ্বয়কে বলা যায় সময়ের দলিল। তিনি অনুবাদ করেছেন নাটক। অস্কার ওয়াইল্ডের অ্যান আইডিয়াল হাজব্যান্ডের অনুবাদ করেছেন ‘আদর্শ স্বামী’ নামে। আলেকসেই আরবুঝভের স্তারোমোদোনাইয়া কোমেদিয়া নাটকের অনুবাদ করেছেন ‘পুরনো পালা’ শিরোনামে। তার শিশুতোষ বইয়ের সংখ্যাও রয়েছে। একটি জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জীবনী। অপরটির নাম কতকাল ধরে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাজের পরিসর অনেক বড় ছিল। বলা যায় তার মনন সর্বভুক, তার চিন্তা নৈর্ব্যক্তিক, তার কর্ম পরিমাপহীন। তিনি সেই মানুষ, যিনি বাংলাদেশকে সুখী-সমৃদ্ধ দেখতে চেয়েছেন। তিনি সেই মানুষ, যার স্বপ্নের ভূমিতে আকাল নামবে না। সেলিনা হোসেন : কথাসাহিত্যিক।