Home সম্পাদকীয় অপরাধী ছাত্রলীগ হলে বিচার হয় না: ক্যাম্পাসে চলছে নির্মম নারকীয়তা

অপরাধী ছাত্রলীগ হলে বিচার হয় না: ক্যাম্পাসে চলছে নির্মম নারকীয়তা

10

বিচারব্যবস্থার এক অভূতপূর্ব নজির সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। প্রকাশ্যে অন্যায়-অনিয়ম-অবিচার করে দাপটের সাথে চলাফেরা করছে সমাজে অপরাধীরা। তাদের বিরুদ্ধে সহজে মামলা করা যায় না। পুলিশের কোনো ধরনের দৃশ্যমান ব্যবস্থাও নেই। সমাজের অন্যান্য অংশের মতো শিক্ষাঙ্গনে এমন অপরাধ অহরহ ঘটছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ অনায়াসে যা খুশি করে যাচ্ছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভয় দেখানোর মতো কাজ তাদের জন্য মামুলি নস্যি। যাকে খুশি তাকে অপমান, লাঞ্ছনা, নির্মম মারধর তারা ক্যাম্পাসে করছে। অপরাধ করে তার একপক্ষীয় বয়ানও তারা দিচ্ছে। কারো যেন কিচ্ছু বলার নেই। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের (চমেক) চার ছাত্রকে তারা রাতভর পিটিয়েছে। ঘটনার পাঁচ দিন পরও দেখা গেল, কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
নারকীয় মারধরের শিকার হওয়া দু’জন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের বিবরণে জানা যাচ্ছে, তারা কিছুটা সুস্থ হলে এ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন। সাকিব হোসেন লিখেছেন, গভীর রাতে তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে ক্রিকেট স্ট্যাম্প, পাইপ ও কাঠের তক্তা দিয়ে পেটানো হয়। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে কিছুটা বিরতি দিয়ে আবার প্রতিটি গিরার সংযোগস্থলে থেঁতলানো হয়। তার ওপর পানি থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। নিঃশ্বাস বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত পানি ঢালা চলতে থাকে।
কেন তাদের পৈশাচিক কায়দায় পেটানো হচ্ছে তা-ও অভিযোগে লিখেছেন। সাধারণত রাজনীতি কিংবা শত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষকে নির্মম নির্দয়তা করার একটি বাজে সংস্কৃতি দেশে রয়েছে। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, নিজেদের বন্ধু বড় ও ছোট ভাইয়েরা তাদের ওপর নারকীয়তা চালিয়েছে উল্লেøখযোগ্য কোনো কারণ ছাড়া। ‘শিবির’ করার সন্দেহ ও ক্লাস নেতৃত্বের হিংসা থেকে এমনটি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। দুর্বৃত্তদের মারধর ও জিজ্ঞাসাবাদের ধরন ছিল নির্যাতন সেলে পেশাদার অপরাধীরা যেভাবে কথা আদায়ের জন্য করে থাকে সে ধরনের। তারা একটি তালিকা ধরিয়ে দিয়ে, তাদের সাথে সম্পর্ক আছে ও কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেয় কিনা তার স্বীকারোক্তি আদায় করতে চেয়েছে। তাদেরকে আবার মুখোমুখি করে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন থানাহাজত হয়ে গেছে। এ যেন একটি মিনি ক্যান্টনমেন্ট।
অভিযুক্তরা এখন পর্যন্ত একেবারে স্বাধীনভাবে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করছে। তারা প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যমে নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়ে যাচ্ছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে- যাদের তারা মেরেছে এরা সন্দেহভাজন শিবির। ‘শিবির’ অভিযোগটিকে সারা দেশেই ছাত্রদের ওপর নির্যাতন চালানোর জন্য ছাত্রলীগ ব্যবহার করছে। বুয়েটে আবরার ফাহাদকে হত্যা করার পরও একই অভিযোগ তুলে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা হয়েছে। অথচ শিবির এ দেশে নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন নয়। ছাত্র সংগঠনটি প্রকাশ্যে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালায়। কিন্তু এ ধরনের একটি আবহ তৈরি করে তকমাটি এঁটে দিয়ে কেন ছাত্র নির্যাতনে একে ব্যবহার করা হচ্ছে? দুর্ভাগ্য হচ্ছে- প্রশ্নটি জোরালোভাবে কেউ তুলছে না। তা হলে ছাত্রলীগকে অন্যায় করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য একে একটি অবাধ লাইসেন্স হিসেবে দেয়া হয়েছে? সেই প্রশ্ন সামনে এসে যায়।
চমেকে ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীরা চিহ্নিত। এর আগেও তারা ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়েছে। তাতে বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছে। এক ছাত্রের খুলি উড়ে গিয়েছিল তখন। এদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা কি নেয়া হয়েছে? নেয়া হয়ে থাকলে এরা নতুন করে কিভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে? মেডিক্যাল কলেজটি দু’জন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার দ্বন্দ্বে নিয়মিত বিরতিতে রক্তাক্ত হচ্ছে। অথচ উপরের এই নেতারা খুব নিরাপদে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো ঝামেলা নেই। ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে পড়তে আসা সাধারণ ছাত্ররা। আমরা মনে করি, এ ঘটনার জন্য সরাসরি যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। যাদের যতটুকু অপরাধ রয়েছে তাদের ততটুকু শাস্তি হোক। পেছনের ইন্ধনদাতাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক। তাহলে এমন ছাত্র নির্যাতনের অবসান হবে আশা করা যায়।