স্পোর্টস ডেস্ক।।
চেষ্টা করা, লড়াই চালিয়ে যাওয়া, লক্ষ্য খুঁজে নেওয়া এবং কখনও আত্মসমর্পণ না করা- ফুটবলের এই আপ্তবাক্য যেন ইংল্যান্ডের বেলায় খাটল না। আটলান্টার বিশাল স্টেডিয়ামে গগনবিদারী চিৎকারের মাঝে থেমে গেল ইংলিশদের এবারের বিশ্বকাপ যাত্রা। পরিষ্কার হয়ে গেল তাদের সামর্থ্য। আসলে এদিন তারা এমন একজনের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যিনি এখনই ফুটবলকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত নন, অন্তত এভাবে তো নয়ই। তিনি লিওনেল মেসি।
ম্যাচের ৫৫ মিনিটে ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে জয়ের সুবাস পাচ্ছিল ইংল্যান্ড। অ্যান্থনি গর্ডনের পা থেকে আসা গোলটিই ছিল পুরো ম্যাচে ইংলিশদের তৈরি একমাত্র নিখুঁত ও দৃষ্টিনন্দন মুহূর্ত। কিন্তু গোলটির পর যেন মাঠের মূল মঞ্চ থেকে হারিয়ে গেলেন টমাস টুখেলের শিষ্যরা। বদলি খেলোয়াড় নামিয়েও কোনো কাজ হলো না। অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে দেখে মনে হয়েছে, তিনি বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে খেলছেন না, যেন মাঠে হালকা জগিং করতে নেমেছিলেন।
এদিনও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার কাজটা করেন লিওনেল মেসি। মাঠের পরিস্থিতির পরিবর্তনটা ছিল এমন- ঘড়ির কাঁটা ৯০ মিনিটের কাছাকাছি যেতে শুরু করেছে এবং আকাশ কালো হয়ে আসছে, তখনই স্টেডিয়ামের সমস্ত শক্তি ও মনোযোগ হঠাৎ করে ধাবিত হয় গাঢ় নীল রঙের এক চেনা ১০ নম্বর জার্সির দিকে। হাঁটার গতি থেকে শুরু করে খেলার কলাকৌশলে তিনি এমন কিছু করেন, যা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে তছনছ করে দেয়। মাঠের ফাঁকা জায়গা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চারপাশের সবকিছু নিজের পক্ষে আবর্তিত করতে শুরু করেন তিনি। যেন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ থেকেও প্রতিরোধ কোন পথ খোলা নেই। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা যেন মুহূর্তে গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলেন।
ম্যাচ তখন ৯১ মিনিটে। স্কোরবোর্ড ১-১ গোলে সমতায়। দেখে মনে হচ্ছিল এটি সাময়িক প্রদর্শন মাত্র। ঠিক এই মুহূর্তে ম্যাচের চূড়ান্ত ফয়সালা করলেন সেই লিওনেল মেসি। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ তখন ডি-বক্সের সামনে ডুবে যাওয়া জাহাজের নাবিকদের মতো দিশেহারা। এর ঠিক আগে, আর্জেন্টিনার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি নিচু শট গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসে। পুরো ম্যাচ লড়াই করা ইংলিশ ডিফেন্ডার জেড স্পেন্স তখন মেসির সামনে এসে বলটি কেড়ে নিতে পেরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু রাখতে পারেননি। মুহূর্তের মধ্যে মেসির নিখুঁত শটে বলটি ভেসে গেল ডি-বক্সের ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে যাওয়াই সবচেয়ে যৌক্তিক ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল, কেউ একজন অত্যন্ত ধীরস্থির ও ধৈর্যশীলভাবে কোনো জটিল গণিতের সমাধান বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আর স্টেডিয়ামের দর্শকরা তখন ম্যাচের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন।
লাউতারো মার্টিনেজ চমৎকার হেডে পরাস্ত করলেন ইংলিশ গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ডকে, বল গিয়ে জড়াল জালে। ব্যস, এটুকুই! ইংল্যান্ড শিবিরে তখন শুধু কষ্টই দেখা যাচ্ছিল। ড্যান বার্ন আর্জেন্টিনার ডি-বক্সের ভেতর লম্বা বলের আশায় নিজের শরীর ছুড়ে দিচ্ছিলেন, যা দেখতে দোতলার জানালা থেকে একটি ডাবল তোশক নিচে ছুড়ে ফেলার মতো লাগছিল। খেলা ততক্ষণে শেষ। ইংল্যান্ড আরো একটি বড় মঞ্চের চাপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যখন প্রেসিং করা উচিত ছিল তখন তারা গুটিয়ে গেছে। আর দিনশেষে আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় প্রতিভার কাছে পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। এই জাদুকরী প্রতিভা এমন একজনের, যিনি মাঠে সবচেয়ে মলিন দিনেও নিজের চেনা ছন্দ খুঁজে নেন।
রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে স্টেডিয়ামে আছড়ে পড়ে উল্লাসের অন্তহীন ঢেউ। এই উন্মাদনার মাঝেও মেসি নিজের মতো হেঁটে যাচ্ছিলেন, ফাঁকা জায়গা খুঁজছিলেন এবং সতীর্থদের উল্লাসের ভিড় থেকে নিজেকে কিছুটা আড়ালে রেখে, দুই হাত বাতাসে ছুড়ে নিজের মতো করে জয় উদ্যাপন করছিলেন। ইংল্যান্ড নিঃসন্দেহে বাজে খেলেছে, একটি সেমিফাইনাল ম্যাচ নিজেদের ভুলে হাতছাড়া করেছে। তাদের খেলায় আক্রমণাত্মক ধার ছিল না, ছিল না ম্যাচ জয়ের তাড়না। ইংলিশদের এই ভরাডুবির কারণ বিশ্লেষণ করার, দলের ফাটল খুঁজে বের করার এবং দল নির্বাচন থেকে শুরু করে আলোর সামনে এসে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার চেনা রোগ নিয়ে আক্ষেপ করার মতো প্রচুর সময় এখন ব্রিটিশ মিডিয়া পাবে।











































