Home জাতীয় উচ্চ আদালতের নির্দেশের বছর পার: খুলনায় উচ্ছেদ হয়নি এমপি চেয়ারম্যানের ইটভাটা

উচ্চ আদালতের নির্দেশের বছর পার: খুলনায় উচ্ছেদ হয়নি এমপি চেয়ারম্যানের ইটভাটা

20

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
খুলনায় ১৪ ইটভাটা মালিকের দখলে থাকা সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশের এক বছর পার হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এসব ইটভাটার তালিকায় স্থানীয় সংসদ-সদস্য (এমপি), চেয়ারম্যানসহ প্রভাবশালীদের নাম থাকায় প্রশাসন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডুমুরিয়ার খর্নিয়া ইউনিয়নের আধা কিলোমিটার দূরে গড়ে উঠেছে এসবি ব্রিকস। এর মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ফজলুর রহমান। ভদ্রা নদীর পাড়ে প্রায় ১০ একর জায়গার ওপর এ ইটভাটা। পাড়েই তৈরি করা হয়েছে ভাটার চিমনি। স্থানীয় রানাই গ্রামের ৭০ বাড়ির মানুষের চরম দুর্ভোগ তৈরি করছে ভাটাটি। নিয়ম না থাকলেও এ ভাটার ইট খাল ও নদীর মাটি দিয়ে তৈরি হয়।

স্থানীয় আনোয়ার হোসেন বলেন, শীতকাল থেকে শুরু হয়ে বর্ষার আগ পর্যন্ত চলে ইট পোড়ানোর কাজ। ধোঁয়া আর ধূলিতে ভরে যায় গ্রামের গাছপালা ও বাড়িঘর। এ গ্রামের প্রায় প্রতিটা মানুষ অ্যাজমা, হাঁপানি ও কাশিতে ভোগেন সারা বছর। ইটভাটার জন্য মানুষের দুর্ভোগের সীমা নেই। মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে জরিমানা করে। পরে আবার শুরু হয় ইট বানানো ও পোড়ানোর কাজ।

শুধু এসবি ব্রিকস নয়, এমন ১৪ ইটভাটা দখল করে নিয়েছে ভদ্রা নদীর দুই পাড়। অন্তত শত বিঘা সরকারি জমি দখলে নিয়ে গড়ে উঠেছে এসব ভাটা। সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে এগুলোর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। এ ভাটাগুলো হচ্ছে ডুমুরিয়া কুলবাড়িয়া-বরাতিয়া ও ভদ্রাদিয়া মৌজার ভদ্রা নদীর তীরবর্তী এসবি ব্রিকস, একই মৌজার স্থানীয় সংসদ-সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নারায়ণ চন্দ্র চন্দের কেপিবি ব্রিকস, কুলবাড়িয়া বরাতিয়া ও খর্নিয়া মৌজার ডুমুরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য গাজী এজাজ আহমেদের সেতু-১ ব্রিকস, বিএনপি নেতা মোল্যা আবুল কাশেমের জামাই শাহজাহান জমাদ্দারের নূরজাহান-১ ব্রিকস ও শান ব্রিকস, ডুমুরিয়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান গাজী হুমায়ুন কবির বুলুর ছেলে সালেহ আকরাম মাহির কেবি-২ ব্রিকস, রানাই মৌজার ভদ্রা নদীর তীরে সোবাহান সানার এফএমবি ব্রিকস, রানাই মৌজার হরিনদী তীরের জাহিদুল ইসলামের কেবি ব্রিকস (বর্তমানে বন্ধ), উপজেলা শ্রমিক লীগের সাবেক আহ্বায়ক ইসমাইল হোসেন বিশ্বাসের আল-মদিনা ব্রিকস, মশিউর রহমানের মেরি ব্রিকস, উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য সচিব আব্দুল লতিফ জমাদ্দারের জেবি ব্রিকস-১, আমিনুর রশীদের লুইন ব্রিকস, চহেড়া মৌজার হরিনদী তীরে রুদাঘরা ইউপি চেয়ারম্যান গাজী মো. তৌহিদুজ্জামানের ভাই এবং উপজেলা সৈনিক লীগের আহ্বায়ক গাজী আব্দুল হকের সেতু-৪ ব্রিকস এবং রুদাঘরা মৌজার হরিনদী তীরের গাজী ইমরানুল কবিরের টিএমবি ব্রিকস। কোর্টের নির্দেশনার বাইরে আরও ৯ ভাটা অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

জেলা প্রশাসন থেকে লাইসেন্স প্রদানের অন্যতম শর্ত, ইট তৈরির জন্য মজাপুকুর, খাল-বিল, খাড়ি-দিঘি, নদ-নদী বা হাওড়-বাঁওড় থেকে মাটি ব্যবহারে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে। তবে ভাটা মালিকরা সে নির্দেশনাও মানছেন না। অবাধে নদীর মাটি ব্যবহার করছেন।

এ বিষয়ে জানতে এমপি নারায়ণ চন্দ্র চন্দকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী এজাজ আহমেদ জানান, ইটভাটায় নিজস্ব জমিসহ স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া জমি কিনে ভাটা পরিচালনা করছি।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, হরি ও ভদ্রা নদীর জায়গা দখল করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটা উচ্ছেদে জনস্বার্থে ২০২১ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে রিট করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। ওই রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করে হরি ও ভদ্রা নদীর সীমানায় সিএস, আরএস রেকর্ড অনুসারে জরিপ করে দখলদারদের তালিকাসহ ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে খুলনা জেলা প্রশাসন ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করে। ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি কামরুল হোসেন মোল্লার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এরপর জেলা প্রশাসক ২০২১ সালের অক্টোবরে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করেন।

এরপর উচ্চ আদালত এসব ভাটা মালিকদের দখলে থাকা সরকারি জমি উচ্ছেদ করে অবমুক্ত করার নির্দেশ দেন। তবে ওই নির্দেশের পর এক বছর পার হতে চললেও কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করেনি প্রশাসন। খাসজমি দখলমুক্ত করার অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে অক্টোবরে আদালত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরীফ আসিফ রহমান জানান, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে কাজ করছে প্রশাসন। ইটভাটায় কতটুকু খাস জমি বা নদীর জায়গা দখল করা হয়েছে তা পরিমাপ করে দেখছেন তারা। ভাটার মধ্যে খাস জমি পাওয়া গেলে সেখানে থাকা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে। হাইকোর্টের তলবের বিষয়ে জানান, অবৈধ ইটভাটার বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করছেন তিনি। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।