০ মোঃ গোলজার হুসাইন।।
পৃথিবীতে ফিৎনা-ফাসাদ বা সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে অসন্তোষ ও ঘৃণা। যে কোন ধরনের ফিৎনা বা বিপর্যয় সৃষ্টিকে প্রকাশ্য হত্যাকান্ডের চেয়ে ভয়াবহ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “পৃথিবীতে বিপর্যয় (সন্ত্রাস) সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়ো না, আল্লাহ তাআলা ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না”-সূরা আল-কাসাস: ৭৭। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ফিৎনা বা সন্ত্রাস হত্যাকান্ডের চেয়ে মারাত্মক অপরাধ”সূরা আল-বাকারা: ১৯১। ইসলাম কখনো চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে না। ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম। সম্প্রীতি হলো ইসলামের মূলনীতি। উদারতা আর পরম সহিঞ্চুতাই ইসলামের শিক্ষা। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। হত্যাকারীর স্থান হবে জাহান্নামে উল্লেখ করে আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে।’- সূরা আন-নিসা: ৯৩
চরমপন্থার পরিচিতি:
চরমপন্থা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে উগ্রপন্থা, উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদি।
এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Extremism.
যার ব্যাখ্যায় প্রসিদ্ধ ইংরেজি অভিধান Oxford–এ বলা হয়েছে ঃ
˝Ideas or actions that is extreme and not normal, reasonable or acceptable to most people.” ‘‘এমন ধারনা বা চেতনা -যা চরমপন্থী এবং অধিকাংশ মানুষের কাছে তা স্বাভাবিক, ন্যায়সঙ্গত, সঠিক বা গ্রহণযোগ্য নয়।’’
চরমপন্থা বোঝানোর জন্য শরীয়তে কয়েকটি শব্দের ব্যবহার করা হয়। যেমন:(গুলু)-বাড়াবাড়ি,(তানাত্তু)-গোড়ামী, (তাশাদ্দুদ)-কড়াকড়ি।এর ব্যাখ্যায় সুপ্রসিদ্ধ আরবী অভিধান আল-মু‘জামুল ওয়াসীত এ বলা হয়েছে: ‘ন্যায়নীতির সীমা অতিক্রম করেছে।’ আর এ থেকেই চরমপন্থী। আবার কেউ বলেছেন: ‘‘সে ন্যায়নীতির সীমা অতিক্রম করেছে এবং মধ্যপন্থী হয়নি।’’ ‘চরমপন্থাবাদ’ কথাটি সাধারণভাবে মানবতাবাদবিরোধী চিন্তাধারাপ্রসূত এক মতবাদ সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
সন্ত্রাসবাদ এর পরিচিতি:
সন্ত্রাসবাদ কী ? সেটা জানার পূর্বে জেনে নেওয়া জাক সন্ত্রাস কী ? সন্ত্রাস শব্দটি ত্রাস থেকে গ্রহন করা হয়েছে, ত্রাস হলো : ভয়, শংকা, ভীতিকর। আর সন্ত্রাস হলো: আতংগ্রস্ত করা, অতিশয় ত্রাস বা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা। সন্ত্রাসিত-সন্ত্রাসযুক্ত, সন্ত্রস্ত।
সন্ত্রাস শব্দের ইংরেজি প্রতি শব্দ হলো Terror- extreme fear, যৎপরোনাস্তি আতংক, সন্ত্রাস; A dreadful object. ভয়ংকর ব্যক্তি, প্রাণী, বা বস্তু . সঙ্গবদ্ধভাবে ভয় দেখিয়ে বশ মানানোর নীতি, সন্ত্রাসবাদ। সন্ত্রাসবাদ ইংরেজিতে Terrorism নামে অভিহিত। আধুনিক আরবীতে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদ বুঝাতে (ইরহাব) ও (ইরহাবিয়া) শব্দ ব্যবহার হয়।
পারিভাষিক অর্থে সন্ত্রাস হলো ঃ যে কোন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অত্যাচার,হত্যা প্রভৃতি হিংসাত্মক ও ত্রাসজনক পথ বেছে নেয়া, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক,তথ্য, ইত্যাদী ক্ষমতা লাভের জন্য সংঘবদ্ধভাবে ভয় দেখিয়ে বশ বানানোর নীতি অবলম্বন করা। সন্ত্রাসবাদী যে সন্ত্রাসবাদে আস্থাশীল বা তদনুযায়ী কাজ করে।
The illegal use of (threats of) violence to obtain political, demands.
আরবী ভাষায় ইরহাবিয়্যুনÑএমন একটা গুণবাচক নাম তাদের যারা রাজনৈতিক লক্ষ্যসমূহ পূরণে শক্তি প্রয়োগ ও কঠোরতার পথ অবলম্বন করা বোঝায়।
অদৃশ্যলোকের গ্যাং-এর নাম সন্ত্রাসী (Terrorist)। কতো যে এর রূপ ঃ নারী পাচারকারী, শিশু-কিশোর অপহরণ,জিম্মীকরণ অবশেষে হত্যাকারী। খুব সম্ভব সেকালের গ্যাং সর্দারগণই স্বভাবে খাসলাতে আজ গডফাদার রূপে পরিচিত…নারী,শিশু-কিশোর অপহরণ ,জিম্মীরূপে রাখা,মুক্তিপণ আদায়ে নানান ফন্দি-ফিকির ,ধর্ষণ করা, শেষতক দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া। উত্তর আধুনিক যুগের আনন্দদায়ক তামাশা। এসব তামাশাকারীর জাল দেশ থেকে দেশে বিস্তৃত।৫
প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন ফোরামে সন্ত্রাসবাদের বিভিন্ন অর্থ আলোচিত হলেও সর্বসম্মত পারিভাষিক অর্থ এখনও নির্ধারণ সম্ভব হয়নি। ১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাসে আরব রাষ্টগুলোর স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীদের এক সন্মেলনে সন্ত্রাস দমনে সন্মিলিত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং এতে সন্ত্রাসবাদের নিন্মোক্ত সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। সন্ত্রাস হলো ব্যক্তিক বা সামষ্টিক অপরাধ মনোবৃত্তি হতে সংঘটিত নিষ্ঠুর কাজ বা কাজের হুমকি যে প্ররোচনা বা লক্ষ্যেই তা হোক না কেন,যা দ্বারা মানুষের মাঝে ভীতি সঞ্চার করা হয় বা তাদেরকে কষ্টে ফেলার হুমকি দেয়া বা তাদের জীবন,তাদের স্বাধীনতা,তাদের নিরাপত্তাকে ধ্বংসের মুখে ফেলা হয় বা পরিবেশকে ক্ষতির মুখোমুখি করা হয় অথবা প্রাইভেট বা সরকারী সম্পত্তি ছিনতাই করা ,দখল করা ,নষ্ট করা হয় অথবা কোন রাষ্ট্রীয় উৎস ধ্বংসের মুখে ফেলা হয়।
সাধারণভাবেই সন্ত্রাসকে দু’ভাবে বিভাজন করা যায়: ক. জাতীয় সন্ত্রাস ও
খ. আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস।
ক. জাতীয় সন্ত্রাস
এটি যে কোন দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এই সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত রয়েছে সমাজের উঁচু-নিচু স্তরের মানবিক ব্যবধান-বৈষম্য,অসহায়-দুর্দশাগ্রস্ত জীবন ব্যবস্থা ও মানুষের কুপ্রবৃত্তিগত। আর কুপ্রবৃত্তির বিজয় মানে সুকুমার বৃত্তিগুলো হারিয়ে যাওয়া। ফলে মানুষের যেকোন অমানবিক কান্ড ঘটাতে দ্বিধা করে না।ঘুষখোরী,চাঁদাবাজী,চুরি ডাকাতি,রাহাজানি,ছিনতাই,ধর্ষণ ও অপহরণসহ সকল অনৈতিক কর্মকান্ড তারই পরিণতি।আমাদের দেশে সন্ত্রাসে যে বীভৎসরূপ সৃষ্টি হয়েছে তার পুরোটাই এর অন্তর্ভূক্ত।
খ.আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস:
কোন শক্তিশালী দেশ নিজেদের আধিপত্য বিস্তার কিংবা কায়েমী স্বার্থ হাসিলের জন্য কোন দুর্বলরাষ্টের উপর আক্রমণ করা। এই সন্ত্রাসী কর্মতৎপরতার বিরুদ্ধে দুর্বল দেশের মানুষ যখন তাদের জাতিগত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়,অত্যাচার-নিঃপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ইয়াহুদী নিয়ন্ত্রিত পাশ্চাত্য মিডিয়া সেগুলোকেই সন্ত্রাসবাদ (Political violence or Terrorism) বলে অভিহিত করে। এই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে তথ্য সন্ত্রাস।
তথ্য সন্ত্রাস:
পশ্চিমা বিশ্ব বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত প্রচার মাধ্যমের উপর একচেটিয়া প্রধান্য বিস্তার ও কর্তৃত্ব স্থাপনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে গোটা মিডিয়া জগত। তথ্য বিকৃতি ও ভুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে মানুষকে বিশেষত মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করছে। নানা কায়দায় ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্ম,কৃষ্টি,সভ্যতা, ও আকীদা বিশ্বাসকে সমূলে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র লিপ্ত রয়েছে।
মুসলিম জনগোষ্ঠির ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্টার আন্দোলন ও জাগরণকে ,সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত আখ্যা দিয়ে এরা বিশ্ব জনমতকে বিভ্রান্ত করার অপকৌশল চালাচ্ছে। দুনিয়ার সব কয়টি আন্তজার্তিক সংবাদ সংস্থা ও টিভি নেটওয়ার্ক ইয়াহুদী এবং পশ্চিমা জগতের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদের দেয়া তথ্য ও সংবাদ এবং প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে গোটা দুনিয়ার মানুষ। যার ফলে তারা আজ ইসলাম ও সন্ত্রাসকে একই সরলরেখায় নিয়ে এসেছে এবং দু’টোকে পরস্পরের সমর্থক হিসাবে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করে চলছে।
মিডিয়ার অব্যাহত তথ্য সন্ত্রাসের ফলে ভিন্নধর্মালম্বীরা ছাড়া খোদ কিছু মুসলমানের মধ্যে এ সংশয় দেখা দিয়েছে যে, আসলে কি ইসলাম সন্ত্রাসী ধর্ম ? মুসলমানরা কি কট্টর,গোঁড়া,জঙ্গী ও সন্ত্রাসীবাদী সম্প্রদায় ? না ইসলাম শান্তির ধর্ম।
১৯৯৯ এর ৩১ অক্টোবর ম্যাসাচুসেটসের অদূরে সমুদ্রউপোকূলে মিসরীয় এয়ার লাইনসের ফ্লাইট-৯৯০ বিধ্বস্ত হয়। এতে বিমানের ২১৭ জন আরোহীর সকলেই নিহত হন। ডুবুরীরা বিমানের ভয়েস রেকর্ডার উদ্ধার করে। ভয়েস রেকর্ডারে পাইলটের সর্বশেষ কন্ঠস্বর বাজিয়ে তদন্তকারীরা অভিমত দেন যে , পাইলট আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং আত্মহত্যার আগে দোয়া পড়ছিলেন। তদন্তকারীদের এ অভিমত প্রচার মাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়। পাশ্চাত্য তাই বিশ্বাস করেছে। কিন্তু তারা এটা জানে না যে,মুসলমান যে কোন বিপদে অথবা যাত্রা শুরুর আগে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেকে আল্লাহর ইচ্ছার সমর্পণ করে। মিসরীয় পাইলটও দুর্ঘটনার আগে কায়মনোবাক্যে আরøাহর সাহায্য কামনা করেছিলেন। কিন্তু পাশ্চাত্য প্রচার মাধ্যম ভুল ব্যাখ্যা করেছে এবং বলেছে যে তিনি নাকি আত্মহত্যা করার জন্য বিমান নিয়ে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে দোয়া পাঠ করেছিলেন। ইসলাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের কি বিচিত্র ধারণা !১
Terrorism the systematic
use of violence of create a general climate of fear in a population and there by to bring about a particular political objective
অথাৎ সন্ত্্রাস হলো, নিদিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষে সুশৃঙ্খল ভাবে সহিংসতা ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা ।
চরমপন্থার বিভিন্ন স্বরুপ:
‘চরমপন্থা’ চেনার বহু উপয় রয়েছে। এখানে বিশেষ কিছু চেনার উপয় আলোচনা করা হলো।
অন্ধত্ব ,পক্ষপাতিত্ব এবং অসহিষ্ণুতা
চরমপন্থী বা গোঁড়া ব্যক্তিগণ নিজস্ব অভিমতের উপর একগুঁয়ে হয়ে অটল ও অবিচল থাকে। কোন যুক্তিই তাদেরকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে টলাতে পারে না। অন্যের মতামত তাদের কাছে অগ্রাহ্য। অন্য মানুষের স্বার্থ-সুবিধা,শরীয়তের উদ্দেশ্য ও যুগের অবস্থনের প্রতি তারা দৃষ্টি দেয় না। অন্যের সাথে মতবিনিময় কিংবা নিজের অভিমত কে অন্যের সাথে তুলনা করার জন্যও অন্যের সাথে আলোচনায় রাজি হয় না। তাদের বিবেচনায় যা ভাল কেবল তা অনুসরণেই তারা প্রবৃত্ত হয়। তারা অন্যের মতামত দাবিয়ে রাখা ও উপেক্ষা করার চেষ্টা চালায়। তারা নিজেদেরকে কেবল নির্ভেজাল,খাঁটি ,বিশুদ্ধ এবং অন্যদেরকে ভ্রান্ত বলে মনে করে ও তাদের কঠোরভাবে নিন্দা করে। এমনকি ভিন্নমতেরঃ জন্য প্রতিপক্ষকে জাহিল, স্বার্থান্বেষী, নাফারমান,ফাসেক ইত্যাদি বলেও আখ্যায়িত করে।
কুরআন-সুন্নাহ্র উদ্ভট ব্যাখ্যা প্রদান,মর্জি মাফিক ফতোয়াদান
সূক্ষ ও জটিল মাসআলায় তারা নিজেদেরকে যোগ্য-বিশেষজ্ঞ মনে করে তাদের খেয়াল-খুশিমতো ফতোয়া প্রদান করে,তা শরীয়তসম্মত হোক বা না হোক। তারা কুরআন-সুন্নাহর এমন হাস্যকর ব্যাখ্যা দেয় যা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ,আধুনিক ও সমসাময়িক বিদ্ধানগণের ব্যাখ্যার পরিপন্থী। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা নিজেদেরকে খোলাফায়ে রাশিদীন ,সালফে সালেহীন ও সাহাবায়ে কিরামের সমপর্যায়ের মনে করে।
অন্যের উপর নিজের মত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা
চরমপন্থীরা তাদের মতামত অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায়ও লিপ্ত হয়। তাদের এ তৎপরতা কখনো শক্তি প্রয়োগে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, কখনো অন্যের বিদআতী ,দ্বীনবিরোধী,কাফির ভ্রান্তবাদী ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করে। চিন্তাগত বা বুদ্ধিবৃত্তিক এ সন্ত্রাস সাথারণ সন্ত্রাসের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর ও মারাত্বক।
কঠোর নীতি অবলম্বন
সহজ-সরল পদ্ধতি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও সর্বদা কঠোরতা অবলম্বন করা এবং অন্যকেও নিজের মতো আচরণ করতে বাধ্য করতে সচেষ্ট হওয়া যদিও কাজটি শরীয়তসম্মত নয়। আল্লাহভীতি, পরহেজগারিতা ও সতর্কতার কারণে কোন কোন সময় কঠোর মত পোষণ করা যায়। কিন্তু তা অভ্যাসে পরিণত করা অনুচিত। এমনকি যেসব ক্ষেত্রে সহজসাধ্য রীতি-নীতি গ্রহণ করা যায় সেসব ক্ষেত্রেও তা প্রত্যাখ্যান করা ও রুচিসম্মত গ্রহণের সুযোগ পেয়েও তা ত্যাগ করে কঠোরতা অবলম্বন করা অনুচিত ও গোঁড়ামী।
এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: ‘‘আল্লাহ তোমাদের উপর সহজ বিধান আরোপ করতে চান, কঠোরতা আরোপ করতে চান না।’’
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:‘‘ তোমরা মানুষের উপর সহজ ব্যবস্থা আরোপ করো ,কঠোর ব্যবস্থা আরোপ করো না। আশ্রয় দাও, তাড়িয়ে দিও না।’’
তিনি আরও বলেন:‘‘আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দেয়া রুখসত গ্রহণ করা তেমনিই পছন্দ করেন যেমন গুনাহ করা অপছন্দ করেন।’’ আলোচ্য আয়াত ও হাদীস প্রমাণ করে মানুষের জন্য কোন কাজকে জটিল ও কঠিন করে তোলা কিংবা তার উপরে চাপ সৃষ্টি করা ইসলাম পরিপন্থী। সাথে সাথে ফরয কাজগুলির মতো নফল সম্পাদন করার প্রতি চাপ দেয়া বাড়াবাড়ির অন্তর্ভূক্ত। ফরয ইবাদাতের ব্যাপারে কড়াকড়ি করলেই নফল ইবাদাতের ক্ষেত্রে মানুষকে স্বাধীনতা দেয়া প্রয়োজন। এ মর্মে রাসূল (সঃ)এর নিম্নোক্ত হাদীসটি প্রণিধানযোগ্য ঃ
তালহা ইবনু ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন,একদা এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে অবশ্য পালনীয় কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ,যাকাত ও রমযানের রোযার কথা উল্লেখ করেন। অতঃপর লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলো , আমার উপর এছাড়া আর কিছু করণীয় আছে কি? জবাবে রাসূল (সঃ) বললেন, না। তবে নফল কিছু করতে চাইলে করতে পারো। লোকটি চলে যাওয়ার সময় বললো,আল্লাহর শপথ! আমি এর বেশিও করবো না ,কমও করবো না। একথা শুনে রাসূল (সঃ) বললেন,যদি সে সত্য কথা বলে থাকে তবে সে সফল হবে। অথবা বলেছিলেন, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।৩
নির্দয় ও কঠোরতা
চরমপন্থার অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে যেখানে কঠোরতা আরোপের প্রয়োজন নেই সেখানে কঠোর নীতি অবলম্বন করা । গোঁড়া ও চরমপন্থীরা স্থান-কাল বিবেচনা না করে যেখানে সেখানে বাড়াবাড়ি ও কড়াকড়ি করে থাকে।৪
অশিষ্টতা ও দুর্ব্যবহার
মানুষের প্রতি আচার-ব্যবহারে কঠোরতা ,অশিষ্টতা ,অশালীনতা,কথাবার্তায় কর্কশতা এবং আচরণে অভদ্রতা গোঁড়ামী ও চরমপন্থার আরেকটি লক্ষণ বা অভিভ্যক্তি। অথচ এ ধরনের ব্যবহার কুরআন-হাদীসের পরিপন্থী। কেননা আল্লাহ তা’আলা সুকৌশল ও উত্তম ভাষায় ইসলামের প্রতি মানুষের আহবান করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাাহ বলেন ঃ
‘‘আপনি আপনার পালনকর্তার পথের দিকে মানুষকে সুকৌশলে আহবান জানান এবং সদুপদেশ ও উত্তম পন্থায় তাদের সাথে আলোচনা করুন।’’
মানুষের প্রতি কুধারণা পোষণ করা
চরমপন্থা ও উগ্রপন্থার আরেকটি অভিব্যক্তি হলো নিজেদের দলের লোক ছাড়া অন্যদের প্রতি কুধারণা পোষণ করা এবং তাদেরকে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখা। তাদের ভাল কাজকে গোপন করে মন্দ কাজগুলিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে জনসমক্ষে প্রদর্শন করা। তারা সর্বদা অন্যের প্রতি কু-ধারণা পোষণ করে এবং সাধারণ কারণে অন্যকে অভিযুক্ত করে। তাদের কাছে অন্যের ওজর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়। সর্বদা তারা অন্যের ত্রুটি খুঁজে বেড়ায় এবং তাদের ভুল-ভ্রান্তিকে ফলাও করে প্রচার করে। অন্যের ভুলকে ‘অপরাধ’ বানায় এবং অপরাধকে ‘কুফরী’ বানিয়ে ছাড়ে।
তাদের এ কুধারণা শুধু সাধারণ লোক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। তারা বিশিষ্ট লোকদের সম্পর্কেও কুধারণা পোষণ করে থাকে। তাদের এ কুধারণা থেকে কোন ফকীহ,মুফাসসির,মুহাদ্দিস কেউই বাদ যায় না। যারা তাদের মতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তাদেরকেই তারা নাফরমান,বিদআতী,সুন্নাতের অমর্যাদাকারী ইত্যাদি বলে আখ্যায়িত করে এবং তাদের প্রতি কুধারণা পোষণ করে থাকে।
সন্দেহ ও অবিশ্বাস
সন্দেহ ও অবিশ্বাস গোঁড়ামী ও চরমপন্থার একটি লক্ষণ। তারা তাৎক্ষণিকভাবে যেকোন মানুষকে অবিশ্বাস করে বসে এবং তার প্রতি সন্দেহ পোষণ করে। তাদের চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণার পরিপন্থী কথা কেউ বললেই তার প্রতি তারা সন্দেহের বাণ বর্ষণ করতে দ্ধিধা করে না। তাদের এ সন্দেহ থেকে আলিম,ফকীহ,জীবিত,মৃত কেউই বাদ যায় না। তাদের দর্শনের বাইরে গেলেই তারা ইহুদী, জাহামী,মুতাযেলী ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করে।
‘কাফের’ ফতোয়া দানের প্রবণতা
যখন অন্যের মান-মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করে তার জান-মালকে বৈধ মনে করা হয় তখন গোঁড়ামী ও চরমপন্থা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। অন্যের কোন মান-সম্মান আছে বলে মনে করা হয় না। আর এটা তখন হয়ে থাকে যখন অন্যকে ‘কাফির’বলা হয় এবং মুসলিমকে ইসলামের বাইরে চলে গেছে বা আদৌ মুসলমানই নয়-বলে দাবি করা হয়। এটাই উগ্রপন্থা বা চরমপন্থার চূড়ান্ত পর্যায়। এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা চরমপন্থীকে এক মেরুতে আর গোটা উম্মাহকে অন্য মেরুতে অবস্থান করায়।
ইসলামের প্রথম যুগে খারেজীরা এ ধরনের উগ্রপন্থী মতবাদ গ্রহণ করেছিল। তারা ইবাদাত দৃঢ়তার সাথে আদায় করতো। কিন্তু তাদের চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণায় ছিল ফাসাদের উপকরণ। তাদের অপকর্ম-গুলিকে তারা ভাল মনে করেছে। আর পার্থিব জীবনে তাদের সকল কর্ম বিনষ্ট হয়েছে,তথাপি তারা মনে করেছে যে, তারা ভাল কাজ করছে।
কঠোরতা ও দুর্ব্যবহার
গোঁড়ামী ও চরমপন্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের সাথে আচার-ব্যবহারে কঠোরতা ,কথাবার্তা ও বাকশৈলীতে কর্কশতা এবং দাওয়াতী কাজে অভদ্র আচরণ করা যা আল্লাহর হেদায়েত ও রাসূল (সঃ) এর সুন্নাতের বিরোধী। আল্লাহ আমাদেরকে নির্বুদ্ধিতা নয় -সুকৌশলে .কড়া ভাষায় নয়-উত্তম ওয়াজের মাধ্যমে দাওয়াত দানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সর্বোত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক করতে বলেছেন।
‘‘আপনি আপনার পালনকর্তার পথের দিকে দাওয়াত দিন সুকৌশলে , উত্তম ওয়াজের মাধ্যমে ও তাদের সাথে উপযুক্ত পন্থায় বিতর্ক করেন।’’
বড় বড় সমস্যা বাদ দিয়ে ছোট-খাটো বিষয়ে মতদ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া
জ্ঞানের অগভীরতার আরেক প্রমাণ এবং দ্বীনি জ্ঞানের অপরিপক্বতার আরেক অভিব্যক্তি হলো এদের .অনেকেই ছোট-খাটো বিষয় ও সাধারণ ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন-এমন সব বড় বড় বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না যা জাতির অস্তিত্ব,চাওয়া-পাওয়া ও লক্ষ্যের সাথে সম্পৃক্ত।
হারাম ফতোয়া প্রদানে অতিরঞ্জিত করা
জ্ঞানের স্বল্পতা ও দ্বীনি-ফিকহ বা ব্যুৎপত্তিতে অপরিপক্কতা এবং শরীয়তি জ্ঞানের অপূর্ণতার একটা বড় প্রমান হলো সর্বদা সংকীর্ণতা ও কঠোরতা অবলম্বন এবং হারাম বলার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করা। কুরআন- হাদীস ও সালফে সালেহীন কর্তৃক হারামের পরিধি বিস্তৃত করতে নিষেধ থাকা সত্তেও তা বিস্তৃত করা। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
”তোমাদের মুখ থেকে সাধারণতঃ যেসব মিথ্যা বের হয়ে আসে তেমন করে তোমরা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে বলো না এটা হালাল এবং ওটা হারাম। নিশ্চয় যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করে তারা কৃতকার্য হবেনা।১
ইসলামী দৃষ্টিকোণে সন্ত্রাস ও চরমপন্থা
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্য় সন্ত্রাসবাদ বলতে যা বোঝায় তা প্রকাশের জন্য ‘ফিতনা’ এবং ‘ফাসাদ’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। পবিত্র কুরআন গভীরভাবে অধ্যায়ন ও গবেষণা করলে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে মানুষের জান-মাল ,ইযয্ত,আব্রু, ঈমান, কায়-কারবার ইত্যাদি যার কারণে হুমকি ও বিপরযয়ের মুখে পতিত হয় তা হলো ‘ফিতনা’ এবং যার কাণে মানুষের জীবনের স্বাভাবিক যাত্রা ব্যাহত হয় তা হলো ‘ফাসাদ’। পবিত্র কুরআনে ‘ফিতনা’ শব্দটি যে সব অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তার কয়েকটি নমুনা নিম্নে উদ্ধৃত হলো ঃ
কুফর, শিরক এবং মুসলমানদের ইবাদত-বন্দেগীতে বাঁধা প্রদান ও প্রতবন্ধকতা সৃষ্টি করাকে ফিতনা বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ভাষ্য হলো ঃ আর আল্লাহর পথে প্রতবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবয় কুফরী করা, মসজিদে হরামের পথে বাধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিষকার করা আল্লাহ তা‘আলার নিকট বড় ধরনের পাপ। আর ধর্মের ব্যাপারে ফিতনা সৃষ্টি করা, নর হত্যা অপেক্ষাও মহাপাপ।
দুরবলের উপর অত্যাচার করা, তাদের ন্যায্য অধিকার হরণ করা, তাদের ঘরবাড়ী জবরদখল করা এবং তাদেরকে বিভিন্নৃৃ পন্থায় কষ্ট দেয়া । আল্লাহ তা‘আলা বলেন যারা দুঃখ কষ্ট ভোগের পর ফিতনায় নিমজ্জিত হয়ে দেশত্যাগী হয়েছে, অতঃপর জিহাদ করেছে, নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তা এসব বিষয়ের ব্যাপারে অবশ্যই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
জবরদস্তিমূলক সত্যকে দমন করা এবং সত্য গ্রহণ থেকে মানুষকে বাঁধা দেয়া। যেমন পবিত্র কুরআনের ভাষ্য হলো মূসা (আঃ) এর উপর তাঁর জাতির ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কেউ ঈমান আনেনি এই ভয়ে যে, ফিরাউন ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা তাদেরকে বিপদে ফেলে দেবে।
মানুষকে বিভ্রান্ত করা,বিপথে চালিত করা, এবং সত্যের বিরুদ্ধে প্রতারণা, ধোঁকা, বিশ্বাসঘাতকতা ও বল প্রয়োগের চেষ্টা করা । আল্লাহ তা‘আলা বলেন তারা সিন্ধান্ত করে ফেলেছিল যে, তোমাকে প্রলোভন ও পদস্খলনের মাধ্যমে আমার নাযিলকৃত ওহী থেকে ফিরিয়ে নেবে, যাতে তুমি সেটা ছেড়ে দিয়ে আমার সম্বন্ধে অপপ্রচারণায় লিপ্ত হও। তুমি এতে সম্মত হলে তোমাকে তারা বন্ধু করে নিত।
যুগেযুগে ইসলামের অনুসারীদের উপর বাতিলপন্থীদের প্রতাপ ও জোর-যুলুম, নিপীড়ন ও নিরযাতন ‘ফিতনা’ হিসাবে গণ্য। পবিত্র কুরআন তাই বলেছে। যদি শত্রুপক্ষে চতুরদিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হত, অতঃপর ফিতনা বা বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং মোটেও বিলম্ব করত না।
অনুরূপভাবে ‘ফাসাদ’ শব্দটিও পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্ন অরথে ব্যবহৃত হয়েছে আল-কুরআন ফিরাউনকে ‘ফাসাদ’ সৃষ্টিকারী হিসাবে আখ্যায়িত করেছে, কারণ সে তার প্রজাসাধারণের মাঝে শ্রেণী ও বণগত পারথক্য সৃষ্টি করত এবং স্বৈরাচারী শাসন চালাত, দুরবলদের অন্যায়ভাবে হত্যা করত এবং তাদের সম্পদ লুট করত। পবিত্র কুরআনের ভাষ্য হল ফিরাউন তার দেশে উদ্ধত হয়েছিল এবং সে দেশবাসীকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে তাদের একটি দলকে দরবল করে দিয়েছিল। সে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করত এবং নারীদেরকে জীবিত রাখত। নিশ্চয়ই সে ছিল ফাসাদ অনরথ সৃষ্টিকারী।
আদ,সামূদ, লূত, মাদায়েনবাসীসহ বিভিন্ন জাতিকে আল-কুরআন ফাসাদকারী হিসাবে গণ্য করেছে। কারণ তারা সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠভাবে জীবন যাপনের পরিবরতে বিকৃত পথে জীবনকে চালিত করেছিল। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন যারা দেশে সীমালংঘন করেছিল, অতঃপর সেখানে বিস্তর অশান্তি সৃষ্টি করেছিল।
পর-রাজ্য গ্রাস করা যা বিপরযয় আনয়ন করে তাকেও পবিত্র কুরআন ‘ফাসাদ’ বলে উল্লেখ করেছে। যেমন আল্লাহ্ বলেন রাজা-বাদশারা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে তখন তাকে ফাসাদে ভরে তোলে বিপরযস্ত করে দেয় এবং সেখানকার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবরগকে অপদস্থ করে । অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন আর সেই শহরে ছিল এমন নয় ব্যক্তি তারা প্রত্যেকেই ছিল গোত্র প্রধান যারা দেশময় ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়াত এবং সংশোধন করত না।
যে ধরনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রশাসনিক ক্ষমতাকে মহৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পরিবরতে যুলুম, অবিচার ও লুটতরাজের কাজে ব্যবহার করা হয় তাকে আল-কুরআন ‘ফাসাদ’ নামে অভিহিত করেছে। আল্লাহ তাআলার সুস্পষ্ট ঘোষণা আর যখন সে শাসকের আসনে বসে তখন সে পৃথিবীতে ফাসাদ অকল্যাণ সৃষ্টিতে করতে সচেষ্ট হয় এবং ফসল ও প্রাণীকুলকে ধ্বংস করতে প্রবৃত্ত হয়, অথচ আল্লাহ তা‘আলা ফাসাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা পছন্দ করেন না।
পৃথিবীর বাহ্যিক ও অন্যন্তরীন সংস্কার সাধনের পর তাতে অনর্থ ও বিপর্যয় সৃষ্টিকে আল্লাহ ত‘আলা ফাসাদ বরে উল্লেখ করেছেন। যেমন পবিত্র কুরআনের ভাষ্য পৃথিবীকে কুসংস্কারমুক্ত ও ঠিক করার পর তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না ।“সমতা থেকে বের হয়ে যাওয়াকেই ফাসাদ বলা হয়, তা সামান্য হোক কিংবা বেশী”। এখানে পৃথিবীর সংস্কারে দুটি অর্থ হতে পারে বাহ্যিক সংস্কার-অথাৎ পৃথিবীকে চাষাবাদ ও বৃক্ষ রোপনের উপযোগী করেছেন, তাতে মেঘের সাহায্যে পানিবর্ষণ করে মাটি থেকে ফুল-ফল উৎপন্ন করেছেন, এবং মানুষ ও অন্যান্য জীব-জন্তুর জন্য মাটি থেকে জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সৃষ্টি করেছেন পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ সংস্কার সাধনের পর তোমরা এতে গোনাহ ও অবাধ্যতার মাধমে গোলযোগ ও অনর্থ সৃষ্টি করো না। বস্তুুত প্রতিটি গুনাহ আল্লাহর অবাধ্যতা শুধুমাত্র অভ্যন্তরিন অনর্থ সৃষ্টি করো বরং তা বাহ্যিক বিপযর্য়ের কারনও হয়ে থাকে।৭
সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলাম
মানবজাতিকে তার সৃষ্টির অভীষ্ট লক্ষে পরিচালিত করার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার ইবাদাত করা অপরিহর্য করেছেন। আম্বিয়া (আঃ) আলাহিসসালামকে দিয়ে তার ইবাদাতের দিকে আহবান করেছেন। মানব সৃষ্ট সমস্যা সন্ত্রাস মোকাবিলায় লা ইলাহা ইল্লাহর দাওয়াত উপস্থাপন করেছেন। কুরআনুল কারিমের বহু জায়গায় মাদায়েন বাসীর নিকট প্রেরিত নবী শুয়াইব আঃ স্বজাতির মাঝে বিরাজমান সন্ত্রাসের মোকাবিলায় সর্বপ্রথম তাদের কে এক আল্লাহর ইবাদাতের দিকে ডেকেছেন। কারন আল্লাহ তাআলার আনুগত্যকারী ব্যক্তি কখোনই ফাসাদ তথা সন্ত্রাস করতে পারে না। ফিরআউনের সৃষ্ট সন্ত্রাসের মোকাবিলায় মুসা (আঃ) তাকে রাব্বুল আলামিনের ইবাদতের দিকেই আহবান করেছেন। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সমগ্র দাওয়াতি জিন্দেগীতে সর্বপ্রথম এই কাজটিই করেছেন।
শাস্তির বিধান :
যারা জমিনে আল্লাহর বিধান অমান্য করে বিশৃঙ্খলা করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান আল-কুরআনে রাখা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
যারা আল্লাহ তা’আলা ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টির অপচেষ্টা করে , তাদের শাস্তি হচ্ছে , তাদের হত্যা করতে হবে , কিংবা তাদের শূলবিদ্ধ করা হবে, অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত পা কেটে ফেলা হবে, কিংবা দেশ থেকে তাদের নির্বাসিত করা হবে। এই অপমানজনক শস্তি হচ্ছে তাদের দুনিয়ার ( জীবনের ) জন্য। পরকালে তাদের জন্য ভয়াবহ আজাব তো রয়েছেই।”
পারস্পরিক সংশোধনের বিধান
মুসলমানদের অভ্যন্তরে কোন বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে ঈমানী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের ভিত্বিতে ইসলাহ তথা মিমাংশা করার বিধান জারি করা হয়েছে। বরং যারা বাড়বাড়ি পরিত্যাগ করে আল্লাহর বিধানের প্রতি অনুগামী হয়ে সমাধান ও শন্তির পথে ফিরবে না তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার আদেশ দেয়া হয়েছে।
সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সঃ) এর শিক্ষা
অন্যায় ও অসত্যের প্রতি চরম ঘৃনা, ন্যায় ও সত্যেও জন্য আপোষহীন, ত্যাগী, ধৈর্যশীল, আমানাতদারী,বিশ্বস্ততা, ইনসাফ ইত্যাদি বিরল গুনের অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছিল রসুলমুহাম্মদ সা:- এর জীবনে অতি অল্প বয়সেই, যে কারনে সমাজে তিনি পরিচিত পান আল আমিন তথা বিশ্বাসীরুপে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে নবী মুহাম্মদ সা: সামাজিক শান্তিও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম ও অন্যায় প্রতিরোধের জন্য হিলফুলফুজুল নামক কল্যান সংস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবতারসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। এ সংস্থার শর্ত সমূহ ছিল নিম্নরুপ:-
আমরা দেশ থেকে অশান্তি দূর করব।
আমরা পথিকবৃন্দেও জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।
আমরা কোন যালিম ব্যক্তিকে মক্কায় আশ্রয় দেব না।
আমরা অভাব গ্রস্থদের সাহায্য করব।
আমরা নির্যাতিত ব্যক্তিকে সাহায্য করব।
রাসুলুল্লাহ(সা:)নবুওয়াতলাভেরপর সরাসরি আল্লাহ তা’আলারনির্দেশিত পথে সন্ত্রাসের বধ্যভ’মি পরিচিত বলে জাযীরাতুল –আরবকে শান্তির নিকেতনে পরিনত করেন এবং ইসলামী শিক্ষার আলোয় আলোকিত যুব সমাজ উপহার দেন।তার কতিপয় নমুনা নিম্নে প্রদত্ত হলো:
ঐতিহাসিক গীবনের মতে আইয়ামে জাহেলিয়্যাহ ১৭০০ যুদ্ধ- বিগ্রহ হয়। মহানবী সা” এর শানিত ইসলামী বিপ্লব সখল প্রকার সন্ত্রাস সংঘাতের মূলোৎপাটন করে।
তদানীন্তন সময়ে সন্ত্রাসের বাহক ছিল যুব সমাজ।রাসুলুল্লাহ সা: এর অ্যাধ্যাতিক শিক্ষা পেয়ে তারা চরিত্রবান শ্রেণীতে পরিনত হন। যুবকদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিত্যাগ করার জন্য সৎকাজের আলোয় উদ্ভাসিত করে তোলেন ।
শিরক, ফিসক ও কুফরীতে আচ্ছন্ন যুব সমাজকে তাওহিদ , রিসালাত ও আখিরাতের জ্ঞান দিয়ে সোনার মানুষে পরিনত করেন।
নানা কারনে অশান্ত –বিক্ষুদ্ধ যুব সমাজকে আত্মশুদ্ধির জ্ঞান দিয়ে শান্ত করে তোলেন ফলে সন্ত্রাসের আগুন অতি সহজেই নির্বাপিত হয়।
আত্মা তথা কলবের শান্তির অভাবেই যুব সমাজ সাধারনত বেপরোয়া হয়ে ওঠে।তারা নিমজ্জিত হয় সন্ত্রাসের অতল গর্ভে মহানবী সা: রুহানী শিক্ষার আলোকে তাদেরকে পতন থেকে উদ্ধার করেন।
যেহেতু সব যুব শক্তিই সাধারনত সন্ত্রাসের লাঠি হিসাবে ব্যবহার হয়, তাই মহানবী সা: যৌবনের ইবাদত বন্দেগীর উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি ঘোষনা করেন,কিয়ামতের ময়দানে কঠিন সময়ে মহান আল্লাহর আরশে আযীমের ছায়ায় সাত ব্যক্তির স্থান হবে।
ইসলামের দৃষ্টিতে চরম পন্থা
আল্লাহ তা’আলা দ্বীনের মধ্যে গোড়ামী ও বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন।
” হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কর না এবং আল্লাহ তা’আলার শানে সত্য বিষয় ছাড়া কোন কথা বলোনা।
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন:
বলুন , হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা নিজ ধর্মে অন্যায় বাড়াবাড়ি কর না এবং এতে ঐ সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে। তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।
আলোচ্য আয়াত দুটিতে যদিও আহলে কিতাবদের সম্বোধন করা হয়েছে তবু ব্যাপকভিত্তিক। এর মধ্যে সকল সম্প্রদায় অন্তভর্’ক্ত । সকলকে উক্ত কাজ করা থেকে হুশিয়ার করা হয়েছে। অর্থাৎ নাসারারা যেমন হযরত ঈসা (আঃ) ও ইহদীরা যেমন উযায়েরের ব্যাপাওে বাড়াবাড়ি করেছিল তারা যেন অনুরূপ না করে।
শেষ কথা:
আলোচনার প্রান্ত সীমায় বলতে চাই ইসলামে চরমপন্থা, উগ্রতা, জবরদস্তি, সন্ত্রাস ইত্যাদিও কোন আশ্রায় নেই, আল-কুরআন নির্দেশিত এবং রসুলুল্লাহ প্রদর্শিত পথে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতিকে দৃঢ় করতে হবে যার কেন বিকল্প নেই। আল্লাহর প্রতি অনুরাগ ও ভীতি মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত থাকলে মানুষ অপরাধ প্রবনতার হাত থেকে বেচে থাকতে পারবে । আল্লাহ আমাদের সকলকে তৌফিক দান করুন। আমিন
লেখক: মোঃ গোলজার হোসেন, প্রভাষক, কপিলমুনি জে এ ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা,পাইকগাছা। খুলনা। মোবাঃ 01710183530











































