অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা সিন্দাইনী ।।
বাংলাদেশে প্রথম বিদ্যুৎ চালু করেন গাজীপুর জেলার ভাওয়াল পরগণার রাজা। তিনি উনবিংশ শতাব্দির কোন এক সময়ে একটি জেনারেটর সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়। তাই তিনিই প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারি হিসেবে পরিচিত। আর ঢাকা শহরে ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর বৈদ্যুতিক বাতি প্রথম জ্বালানো হয়। ‘অক্টোভিয়া স্টিল কোম্পানি’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা শহরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ শুরু করেছিলো। এ কর্মসূচিতে অর্থায়নে এগিয়ে এসেছিলেন ঢাকার নবাব খাজা আহসানুল্লাহ। এ কোম্পানী বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারতো না। ফলে এ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান সড়কের অভিজাত শ্রেনির মানুষের বাড়ি–ঘরে। ১৯৩৩ সালে ঢাকা শহরের পরীবাগে একটি বেসরকারি কোম্পানী ‘ডেভকো’ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছিলো। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সাধারণ শহরবাসীর মধ্যে বানিজ্যিক ভিত্তিতে সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বিতরণ শুরু হয়েছিলো। আর খুলনা শহরে ১৯৩৪ সালের কয়েক বছর আগে প্রথম রেলওয়ে হাসপাতাল রোডে স্থাপিত ডায়োনামার মাধ্যমে সীমিত আকারে রেলওয়ে এলাকার মধ্যে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। এ বিদ্যুৎ চালু করেছিলো রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ বিদ্যুতের সুবিধা দেয়া হয়েছিলো রেল ও স্টিমার কর্মকর্তাদের অফিস ও বাসভবনে এবং বাংলোগুলোতে।
খুলনা শহরে বিদ্যুৎ চালুর আগে শহরের লোকজন কেরোসিন ও গ্যাসবাতি ব্যবহার করতেন। পৌরসভার সড়কগুলো আলোকিত করার জন্য উচু লোহার খামের মাথায় লোহার পাতের চৌকো কাঁচঘেরা টিনে তৈরি আচ্ছাদনের মধ্যে বড় কাঁচের কেরোসিন তেলের বাতি রাতে জ্বালিয়ে রাখা হতো। প্রতি সন্ধ্যায় রাস্তার বিভিন্ন খামের মাথায় বাতি জ্বালিয়ে দিতেন পৌরসভার কয়েকজন কর্মচারি। এ সব কর্মচারী লাইট পোস্টে ওঠার জন্য মই কাঁধে করে হাতে কেরোসিন টিন নিয়ে ঘুরে ঘুরে বাতি জ্বালিয়ে দিতেন। আবার ভোরে খামের বাতিগুলো তাঁরা এসে নিভিয়ে দিয়ে যেতেন। পূর্র্ণিমার রাতের আগের দিন ও পরের দেন সহ তিনদিন বাদে আর সব রাতে বাতি রাস্তায় জ্বালানো হতো। এ বাতিগুলো শহরের প্রধান প্রধান সড়কে জ্বালানো হতো বলে জানা যায়। বাকি রাস্তাগুলো রাতে অন্ধকার থাকতো। এরপর খুলনা শহরের প্রধান প্রধান সড়কের খামে বৈদ্যুতিক বাতি রাতে জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হলেও অন্যান্য রাস্তায় খামে কেরোসিনের বাতি জ্বালানো হয়েছিলো অনেক বছর ধরে।
খুলনা মহকুমা স্থাপন করা হয় ১৮৪২ সালে আর খুলনা জেলা করা হয় ১৮৮২ সালে। অপর দিকে খুলনা পৌরসভা স্থাপন করা হয় ১৮৮৪ সালে। এ পৌরসভার ২০তম চেয়ারম্যান ছিলেন মহেন্দ্র নাথ ঘোষ (১৯২৮-১৯৪৮)। বৃটিশ সরকার তাঁকে রায় বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেছিলো। তাঁর পৈতৃক নিবাস রূপসা নদীর ওপারে নওয়াপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম রাজেন্দ্র নাথ ঘোষ। তাঁর পিতা খুলনা শহরের পূর্বতন সারদা বাবু রোড তথা বর্তমান আহসান আহমদ রোডে কারুকার্য খচিত করে একটি দ্বিতল পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। এ বাড়িতে বসবাস করতেন মহেন্দনাথ ঘোষ। বর্তমানেও বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে অনেক কালের স্বাক্ষী হয়ে। বাড়িটিতে এখন এমপিওভূক্ত খুলনা শিশু মাধমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। বাড়িটিতে এই বিদ্যালয়ের ক্লাস চালু করা হয়েছিলো ১৯৭৮ সাল থেকে। বিদ্যালয়টি এমপিওভূক্ত হয় ১৯৯৪ সালে। বিদ্যালয়টিতে সুযোগ্য শিক্ষক মন্ডলি দ্বারা সুনামের সাথে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। ১৯৩৪ সালে খুলনা শহরে ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎ বিতরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। এ উদ্যোগের অগ্রভাগে ছিলেন মহেন্দ্র নাথ ঘোষ। তাঁর বাসভবনে প্রথম ইলেকট্রিক সাপ্লাই এর অফিস করা হয়েছিলো। আর এ ভবনেই ডায়নামা স্থাপন করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
তারপর ১৯৩৫ সালে ‘খুলনা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানী’ নামে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডাইরেকটর ছিলেন পৌরসভার এক সময়ের চেয়ারম্যান সুলতান আহমদ এর ভাই মহিউদ্দিন আহমদ। ১৯৩৫ সালের ৩ মার্চ এর উদ্বোধন করা হয়েছিলো। এই কোম্পানী প্রথমে খুলনা শহরের সরকারী বাসভবনে, হাসপাতাল ও পৌরসভা দপ্তরে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছিলো। পরে শহরের রাস্তায় বেদ্যুতিক বাতির সংযোগ দেয়া হয়েছিলো। এক পর্যায়ে শহরের আবাসিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের সংযোগ দেয়া হয়েছিলো। খুলনা শহরে লোক সংখ্যা বৃদ্ধি ও নতুন নতুন অফিস স্থাপন এবং আবাসিক ভবন স্থাপন হলে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। তখন বড় আকারের পাওয়ায় স্টেশন স্থাপন করা হয় বর্তমানের পাওয়ার স্টেশন স্থাপন করা হয় বর্তমানের ‘পাওয়ার হউসের মোড়’ তথা দেবেন বাবু রোড ও যশোর রোডের সংযোগ স্থানে। তখন এ স্থানের নাম ছিলো ক্লে গার্ডেন। তার পাশে ছিলো ক্লে ট্যাংক। এক সময় তা ভরাট করে ফেলা হয়েছিলো। খুলনা জেলার প্রথম জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মি ডাবলু ক্লে। তাঁর নামানুসারে গার্ডেনের নামকরণ করা হয়েছিলো ক্লে গার্ডেন। আর ট্যাংকেরও নামকরন করা হয়েছিলো ক্লে ট্যাংক। অপরদিকে তাঁর নামে শহরে ক্লে রোড নির্মাণ করা হয়েছিলো। এরপর ১৯৫৭ সালে দেশের সব বেসরকারী পাওয়ার হাউজ ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন সরকার অধিগ্রহন করে। ১৯৫৯ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের যাত্রা শুরু হয়। খুলনা শহরে প্রথম পর্যায়ে বিদ্যুৎ চালু সংক্রান্ত অনেক কথা হয়তো আমার অজ্ঞাত বশতঃ বাদ পড়ে যেতে পারে। তাই আমার দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া কোন উপায় নেই। এ ব্যাপারে গবেষকরা এগিয়ে আসলে হয়তো আরো নতুন তথ্য ও উৎসের সন্ধান মিলতে পারে বলে মনে করি।
[লেখক: মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাঞ্চল, কবি, কথা–সাহিত্যিক, আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, গবেষক, গীতিকার ও নাট্যকার, বাংলাদেশ বেতার।]










































