Home আঞ্চলিক শেষ হলো বরিশাল-কুয়াকাটা রুটে ফেরির দিন

শেষ হলো বরিশাল-কুয়াকাটা রুটে ফেরির দিন

7

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট

পটুয়াখালীর লেবুখালী নদীর ওপর পায়রা সেতু খুলে দেওয়ার মাধ্যমে কয়েক দশক পরে ফেরি বন্ধ হয়ে চালু হলো বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। সেতু নির্মাণে সময় লেগেছে সাড়ে বছর। পায়রা সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এর ৮২% অর্থ বহন করেছে কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট এবং অ্যাপেক্স ফান্ড। ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই শুরু হওয়া হাজার ৪৭০ মিটার দীর্ঘ এবং ১৯.৭৬ মিটার প্রস্থের সেতুর দুই পারে প্রায় সাত কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক রয়েছে।

রোববার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে পটুয়াখালীর লেবুখালীতে পায়রা নদীর ওপর বহুল প্রতিশ্রুত সেতুর উদ্বোধন করেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে শেষ হয়েছে বরিশাল-কুয়াকাটা রুটের ফেরির দিন।

ইতিহাসের সাক্ষী হতে পায়রা সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ায় সময় লেবুখালি পয়েন্টে সমবেত হন সংবাদকর্মী, স্থানীয় জনতা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সরকারী কর্মকর্তারা। এই সেতু খুলে দেওয়ায় বরিশাল থেকে বাসে কুয়াকাটা যেতে এখন সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার বা মোটরসাইকেলে আরও দ্রুত যাওয়া যাবে এই অঞ্চলের পর্যটন স্পটগুলোতে।

শেষ ফেরিতে আল্লার দান পরিবহনের একটি বাসের যাত্রী শুক্কুর আলি জানান, শেষ ফেরির যাত্রী হতেই তিনি ঘুরতে গিয়েছেন। ওই বাসের আরেক যাত্রী নিপা রহমান জানান, তিনি পটুয়াখালী সদরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। কাজে যোগ দিতে প্রতিদিনই তাকে ফেরিতে চড়ে পায়রা নদী পাড়ি দিতে হতো। আজও ফেরিতে করে কাজে গিয়েছেন, ফিরবেন সেতু দিয়ে।

তিনি বলেন, ফেরিতে নানা দুর্ভোগ থাকলেও এই অভিজ্ঞতা স্মৃতি মিস করবো।

ফেরির আরেক বাসের যাত্রী জাকির হেসেন বলেন, ওষুধ কোম্পানির বিক্রিয় প্রতিনিধি হওয়ায় কাজের স্বার্থে বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে পটুয়াখালী শহর কুয়াকাটায় দিনে দুই থেকে তিনবার যাওয়া আসা করা লাগে। ফেরিতে ভোগান্তি অনেক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরির জন্য অপেক্ষার ভোগান্তি সেতু চালু হওয়ায় কম হবে। দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বেঁচে যাবে।

কথা হয় এক সময় ঘাটের দক্ষ ফেরী চালক জাকির হাওলাদারের সাথে। ঘাট ছাড়ার আগে গলাটা ধরে আসে ছলছল করে ওঠে জাকিরের চোখ। স্মৃতিকাতর হয়ে তিনি জানান, ১৮ বছর ধরে লেবুখালিতে ফেরি চালাচ্ছেন। পুরো যৌবনই তার এখানে কেটেছে। পায়রা সেতুতে গাড়ি চলাচল শুরু হওয়ায় রবিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে এই নৌপথে শেষবারের মতো ফেরি চালিয়েছেন তিনি। তার হাত ধরে শেষ হলো একটি অধ্যায়ের। এই পথে আর কখনও দেখা মিলবে না ফেরির।

নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি জানান, এক মিশ্র অনুভূতিতে ডুবে আছেন। একদিকে ফেরি বন্ধ হওয়ায় বিচ্ছেদের দহন যেমন তাকে পোড়াচ্ছে, তেমনি সহজেই গন্তব্যে পৌঁছানোর আনন্দেও উৎফুল্ল তিনি।

জাকির বলেন, আমাদের সরকারি চাকরি। কোনো আক্ষেপ নেই, বরং খুশি আমরা। কেননা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কষ্ট শেষ হচ্ছে পায়রা সেতুর মাধ্যমে। এর জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ।

তিনি বলেন, এখন বগায় ফেরি চালাতে হবে। এখান থেকে সাত দিন পর বগা, বেকুটিয়াসহ বিভিন্ন রুটে চলে যাব। অনেক স্মৃতি এখানে। কষ্ট লাগছে, কিন্তু ভালোও লাগছে।

এই রুটের আরেক ফেরি চালক মাহাবুবুর রহমান বলেন, চারটি ফেরি এখানে নিয়মিত চলাচল করতো। আমি দুই বছর ধরে এখানে ফেরি চালাই। ফেরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খারাপ লাগলেও, পায়রা সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে নতুন মাত্রা সৃষ্টি হয়েছে এই অঞ্চলে। আমার নতুন কর্মস্থল এখন বেকুটিয়ায়।

লেবুখালির ফেরিগুলোতে চালক যাত্রীদের পছন্দের খাবার ছিলো চিড়া ভাজা। ফেরি চলাচল বন্ধের খবরে বিক্রেতা হকারদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। বাকেরগঞ্জের শাহজাহান শিকদার জানান, লেবুখালি ঘাট দুইবছর ধরে হাশেমের চিড়া ভাজা বিক্রি করতেন তিনি। তাতে ভালমতোই চলছিল সংসার।

তিনি বলেন, সেতু চালু হয়ে গেলো। এখন কি করবো বুঝতে পারছি না। ঢাকায় আত্মীয়স্বজন থাকে। তাদের সাথে কথা বলেছি। মাথায় কোনো কিছুই কাজ করে না। ঘরে তো সব না খেয়ে থাকবে।

২০ বছর ধরে সেখানে চিড়া বিক্রি করছেন আনোয়ার হাওলাদার। তিনি বলেন, আমার বাড়ি সুবিদখালী। হাশেমের চিড়া ভাজা ফেরিতে বেচি ২০ বছর ধরে। প্রতিদিন দুই হাজার টাকা বেচতে পারলে মালিক ৫০০ টাকা দেয়। ব্রিজ উদ্বোধন হয়েছে আজ। এরপর যে কি করবো বুঝতে পারছি না। ঘরে পোলাপান, বাবা-মা আছেন। কিভাবে কি করবো!

ফেরির যাত্রী ইব্রাহিম শেখ বলেন, লেবুখালি ফেরিতে উঠলেই হাশেমের চিড়া ভাজা কিনে খেতাম। মূলত এই চিড়া ভাজা লেবুখালি ফেরি কেন্দ্র করেই বিক্রি হতো। শুধু আমি নই অসংখ্য মানুষ হাশেমের এই চিড়া ভাজা মিস করবেন।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, সেতু হলে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা যেতে আর কোনো ফেরি থাকছে না। সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। বরিশাল বিভাগে এত বড় সৌন্দর্যমন্ডিত সেতু দ্বিতীয়টি নেই।

অন্যদিকে সেতুর আগে ফেরি পারাপারে যে মাশুল নির্ধারণ করা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি টোল নির্ধারণ করা হয়েছে সেতুতে। নিয়ে পরিবহন মালিকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তারা দাবি করছেন, হয় টোল কমানো হোক, না হলে বাড়ানো হোক বাসের ভাড়া।

এদিকে গত ১৮ মার্চ সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগের (টোল অধিশাখা) উপ-সচিব ফাহমিদা হক খান স্বাক্ষরিত এক গেজেটে সেতুটির টোল নির্ধারণ করা হয়। সেতুতে ট্রেইলার ৯৪০ টাকা, ভারী ট্রাক ৭৫০ টাকা, মিডিয়াম ট্রাক ৩৭৫ টাকা, বড় বাস ৩৪০ টাকা, মিনি ট্রাক ২৮০ টাকা, কৃষিকাজে ব্যবহৃত যান ২২৫ টাকা, মিনিবাস-কোস্টার ১৯০ টাকা, মাইক্রোবাস ১৫০ টাকা, ফোর হুইল যানবাহন ১৫০ টাকা, সেডান কার ৯৫ টাকা, তিন-চার চাকার যান ৪০ টাকা, মোটরসাইকেল ২০ টাকা, রিকশা, ভ্যান, সাইকেল, ঠেলাগাড়ি ১০ টাকা হারে টোল নির্ধারণ করা হয়েছে।

অথচ লেবুখালী নদী পারাপারে ফেরিভাড়া ছিলো মোটরসাইকেল টাকা, প্রাইভেট কার ৪০ টাকা, যাত্রীবাহী বাস ৫০ টাকা, বড় ট্রাক ২৫০ টাকা আদায় করা হতো। ফেরি পারাপারে যাত্রীবাহী বাসের ভাড়ার তুলনায় সেতুর টোল নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় গুণ বেশি। এত বেশি টোল কেন নির্ধারণ করা হয়েছে, তার সঠিক কোনো কারণ জানা নেই কারও।

বরিশাল-পটুয়াখালী সড়কে যাত্রীবাহী বাসচালক আলমগির হোসেন বলেন, পটুয়াখালী থেকে বরিশাল মাত্র ৪০ কিলোমিটার, পথে টোল আছে তিনটি। পটুয়াখালী সেতুতে দিতে হয় ৫০ টাকা, পায়রা সেতুতে ৩৪০ টাকা আর দপদপিয়া সেতুতে ৫০ টাকা। দেশের অন্য কোনো সেতুতে এত বেশি টোল আছে কি না আমি জানি না। আমি মনে করি, ফেরিভাড়া দ্বিগুণ যদি করে, তাহলেও মোটামুটি চলে।

পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, এতে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশের নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। তিনি বলেন, দুই সেতু চালু হলে ঢাকা থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টায় কুয়াকাটায় আসা যাবে। তখন অনেকেই সকালে রওনা হয়ে কুয়াকাটা এসে বিকেলে আবার ঢাকায় ফিরে যেতে পারবেন। ফলে কক্সবাজারের চেয়ে কুয়াকাটা হবে তখন হটস্পট।

পায়রা সেতু প্রকল্পের সপ্তম পরিচালক আবদুল হালিম জানান, ২০১২ সালের মে মাসে বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে পটুয়াখালীর লেবুখালী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের প্রকল্পে অনুমোদন দেয় সরকার। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মিত প্রকল্পটি ৪১৩ দশমিক ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত সাড়ে বছরে প্রকল্পের ব্যয় তিনবার সংশোধন করে দুইবার সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে ছয়বার। যার ফলে এখন প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে হয়েছে হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা, যা আনুমানিক ব্যয়ের প্রায় সাড়ে তিন গুণের বেশি।

প্রকল্প পরিচালক আব্দুল হালিমের মতে, প্রাথমিকভাবে একটি ধারণাগত নকশার ভিত্তিতে প্রকল্প ব্যয় অনুমান করা হয়েছিল। পরে পরিবর্তিত নকশা অনুসারে প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় চূড়ান্ত করা হয়। এরপর পাইলিংয়ের নকশা পরিবর্তন এবং ১৩০ মিটার লম্বা পাইল খাড়া করতে হয়, তখনও ব্যয় বেড়ে যায়।

আব্দুস সেবাহান নামের ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক বলেন, আগে ফেরিতে দিতে হতো টাকা, কিন্তু এই ব্রিজে উঠলেই এখন দিতে হবে ২০ টাকা। ১০০ টাকা ইনকাম করতে অনেক সময় লাগে। যাত্রীও পাওয়া যায় না। তার মধ্যে যদি আসা-যাওয়ায় ২০ করে ৪০ টাকা দিতে হয়, তাহলে তো মোটরসাইকেল নিয়া এদিকে (বরিশালের দিকে) আর আসা যাবে না।

ব্যাপারে জানতে চাইলে পটুয়াখালী বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির রিয়াজ উদ্দিন মৃধা পূর্বপশ্চিমকে বলেন, টোল পুন-নির্ধারণ করা না হলে বরিশাল থেকে পটুয়াখালী রুটের পরিবহন ব্যবসা বন্ধ হবার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ লোকসান দিয়ে কেউ গাড়ি চালাবে না। তিনি বাসের সরকার নির্ধারিত ভাড়া বাড়ানো অথবা টোল কমানোর আহ্বান জানান।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যে কোনো সেতুর টোল নির্ধারণের আগে বাস মালিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা উচিত।

ব্যাপারে সড়ক জনপথ বরিশাল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ মাহমুদ সুমন বলেন, ফেরি সেতুর টোলের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। সড়ক পরিবহন বিভাগ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে টোল নির্ধারিত হয়ে থাকে। এতে আমাদের কোনো হাত নেই।

একই কথা জানান পায়রা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবদুল হালিম। তার মতে, এটি দেখভাল করছে সড়ক পরিবহন সেতু মন্ত্রণালয়। এখানে তাদের কিছু করার নেই। সরকারের সিদ্ধান্তে মন্ত্রণালয় এটি বাস্তবায়ন করছে।