Home আঞ্চলিক খুলনায় বিধিনিষেধে আনাগোনা বেড়েছে, হাসপাতালে রোগীর চাপ

খুলনায় বিধিনিষেধে আনাগোনা বেড়েছে, হাসপাতালে রোগীর চাপ

10

স্টাফ রিপোর্টার

খুলনায় বেড়েই চলছে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা। করোনার বিস্তার ঠেকাতে খুলনা নগরের তিনটি থানা এলাকা রূপসা উপজেলায় জেলা প্রশাসনের আরোপিত বিধিনিষেধের দ্বিতীয় দিন আজ শনিবার সকাল থেকেই বেশির ভাগ দোকানপাট-বিপণিবিতান বন্ধ রয়েছে। তবে প্রথম দিনের চেয়ে সড়কে যানবাহন এবং মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। কাঁচাবাজারে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতাও আগের মতোই কম।

করোনার বিস্তার ঠেকাতে থেকে ১০ জুন পর্যন্ত খুলনা সদর, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর এলাকা রূপসা উপজেলায় এই বিধিনিষেধ চলছে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরের মিস্ত্রীপাড়া বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, বাজারের প্রবেশমুখে হ্যান্ডমাইক নিয়ে বাজার কমিটির নিয়োজিত একজন কর্মী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছেন। সোহরাব হোসেন নামের ওই কর্মী বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। মাস্ক ছাড়া বাজারে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছি না। সাবান–পানি দিয়ে হাত ধোয়ার কথা বলছি। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলছি। তবে হাত কেউ ধুতে চান না।’

বাজারে ঢুকে দেখা গেল, ক্রেতাদের একে অপরের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা। বেশির ভাগ দোকানির মুখে মাস্ক নেই। ফল, মাছ মাংসের বাজারে অবস্থা বেশি খারাপ। বাজারে ঢুকে দেখা গেল, ক্রেতাদের একে অপরের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা। বেশির ভাগ দোকানির মুখে মাস্ক নেই। ফল, মাছ মাংসের বাজারে অবস্থা বেশি খারাপ। সেখানকার ব্যবসায়ী আবদুল মাহিন শেখ বলেন, ‘মাস্ক কিন্তু বেশির ভাগ লোক পরেছেন। তবে গলায় বা থুতনিতে বেশি। গরমের কারণে আমিও একই কাজ করেছি।’

নগর ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান সড়কগুলোতে বিধিনিষেধের কার্যকারিতা আছে। তবে পাড়ামহল্লায় এবং বিভিন্ন মোড়ে ওষুধ মুদিদোকানের বাইরেও বিভিন্ন দোকান খোলা রাখতে দেখা গেছে। নগরের পূর্ব বানিয়াখামার, দোলখোলা, সিমেট্রি রোড এলাকায় আসবাবপত্রের দোকান, বিউটি পারলারসহ অনেক প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল। বড় বাজার, কালীবাড়ি রোডের আড়তগুলোতে মালামাল ওঠানামা চলছিল স্বাভাবিক দিনের মতোই।

শান্তিধাম মোড়ে এক ইজিবাইকে পাঁচজন যাত্রী ছিলেন। চালকের মুখে মাস্ক থাকলেও যাত্রীদের মুখের মাস্ক নামানো ছিল। তাঁরাও গরমের দোহাই দিয়ে বলেন, সবাই একই পরিবারের সদস্য। গরমে-ঘামে মাস্ক ভিজে যাচ্ছে। তাই আশপাশে লোকজন কম থাকলে মাস্ক নামিয়ে রাখছেন।

বেলা ১টা পর্যন্ত শহরের টুটপাড়া, রূপসা, পিটিআই মোড়, রয়েল মোড়, সাত রাস্তা মোড়, ময়লাপোতা মোড়, পাওয়ার হাউজ মোড়, ডাকবাংলা মোড়, নিউমার্কেট, খালিশপুর এলাকায় বিভিন্ন জরুরি পণ্য ছাড়া দোকান বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। তবে ডাকবাংলা মোড় এলাকার বিভিন্ন ফুটপাতে পণ্য বিক্রি হয়েছে। মৌসুমি ফলের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় ছিল। সকাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু মোড়ে পুলিশের উপস্থিতি দেখা গেছে।

করোনার সংক্রমণ শনাক্তের হার বেড়েছে: সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনায় করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা করোনা শনাক্তের হার বাড়ছে। খুলনায় কোভিড রোগীর সংখ্যা এখন ১০ হাজার ৫৯৬ জন। এর মধ্যে শহরেরই হাজার ৬৩১ জন। মারা গেছেন ১৭৯ জন, যার মধ্যে নগরের ১৪১ জন। গত সাত দিনে (৩০ মে-জুন) হাজার ৯৩৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৪৭৫ জন করোনা ‘পজিটিভ’ হয়েছেন। পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার প্রায় ২৫ শতাংশ। এর আগের সাত দিনে (২৩ মে-২৯ মে) হাজার ৩৯৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৮৪ জন করোনা ‘পজিটিভ’ হয়েছিলেন। শনাক্তের হার ছিল ২০ শতাংশ।

করোনা হাসপাতাল ১০০ শয্যার হলেও তার চেয়ে রোগী বেশি ভর্তি থাকছে। আমরা তাঁদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি। রোগীর চাপ যদি আরও বাড়ে তাহলে আমাদের করোনা ইউনিট-চালু করার জন্য প্রস্তুতি আছে।

করোনা হাসপাতালে রোগীর চাপ: খুলনায় করোনা হাসপাতালে ১৫ দিন ধরে রোগী ভর্তির সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। ১০০ শয্যার করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে টানা চার দিন শয্যার সংখ্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি আছেন। চলতি মাসের প্রথম দিন গড়ে প্রতিদিন হাসপাতালে ১০৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। আর গত ২৭ মে থেকে জুন এই ১০ দিনে গড়ে প্রতিদিন ৯৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি থেকেছেন। এর আগের ১০ দিনে ১৭ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত গড়ে প্রতিদিন ৭০ জন রোগী ভর্তি থাকতেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ৯৬ জন করোনা রোগী চিকিৎসাধীন। এর বাইরে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৭ জন এবং ভারত থেকে আসা জন ভর্তি ছিলেন। সব মিলিয়ে হাসপাতালে ১১৩ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে ১০ জন আইসিইউতে এবং আটজন এইচডিইউতে রয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে ৭০ জনের মাঝারি ধরনের উপসর্গ রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ৩৪ জন।

হাসপাতালের ফোকাল পারসন সুহাস রঞ্জন হালদার বলেন, ‘করোনা হাসপাতাল ১০০ শয্যার হলেও তার চেয়ে রোগী বেশি ভর্তি থাকছে। আমরা তাঁদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি। রোগীর চাপ যদি আরও বাড়ে তাহলে আমাদের করোনা ইউনিট-চালু করার জন্য প্রস্তুতি আছে। জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ জনবল চেয়ে পাঠানো হয়েছে।’ তিনি জানান, হাসপাতালে তরল অক্সিজেনের মজুত দ্বিগুণ করা হয়েছে। করোনা হাসপাতালের পুরোটাই কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থায় চলছে। হাসপাতালে ২৪টা হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা আছে। আইসিইউ শয্যা আগে ১০টা ছিল। ৩০ মে থেকে শয্যা ২০টা করা হয়েছে। এর সঙ্গে ১০ শয্যার এইচডিইউ চালু করা হয়েছে।

সেবায় খুশি: খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসংলগ্ন আইসিইউ ভবনটি ১০০ শয্যার করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দুপুর ১২টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ১০০ শয্যা বিশিষ্ট করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে প্রবেশের মূল ফটকের গায়ে লেখা, ‘বিছানা খালি নাই’সেবা পাওয়া পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা রাখার নিয়মকানুন মাইকে প্রচার করা হচ্ছে। হাসপাতালের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়ানো। হাসপাতালের সামনে দিয়ে চলা অনেকের মুখেই মাস্ক ছিল না। রোগীর স্বজনেরা বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন।

মাস্ক পরে দর্শনার্থীর কার্ড গলায় ঝুলিয়ে হাসপাতালে ঢুকছিলেন স্কুলশিক্ষক জাহিদুল আলম। তাঁর ছেলে শরিফুল আলম কোভিডে সংক্রমিত হয়ে ১২-১৩ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। জাহিদুল বলেন, হাসপাতালের সেবা অনেক ভালো। অক্সিজেন, ওষুধ সব পাওয়া যাচ্ছে। বাড়তি কিছু খাবার বাড়ি থেকে আনতে হচ্ছে।

ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামের রবিউল ইসলামের বাবা ওসমান সরদার চার দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রবিউল বলেন, ‘বাবার অক্সিজেন দেওয়া লাগছে। তবে এখানে ভালো সেবা পাওয়া যাচ্ছে। নিয়মকানুনও ভালো। সেবায় আমরা খুশি।’