Home জাতীয় ৫০ বছরে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে

৫০ বছরে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে

48

# আজ আন্তর্জাতিক বন দিবস

একটি দেশের সুস্থ, সুন্দর ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের জন্য ভারসাম্য অনুপাতে বনাঞ্চল আবশ্যক। এ জন্য ভূখ-ের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা অপরিহার্য বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদীরা। এর কম হলে সেটা শুধু মানুষের জন্যই নয়, অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ। দেশে বর্তমানে বনভূমির পরিমাণ মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। বর্তমানে দেশের বনভূমির আয়তন প্রায় ২৩ লাখ হেক্টর, যা মোট ভূখ-ের ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তারপরও এমন পরিসংখ্যানই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়-আমরা কতটা ঝুঁকিতে রয়েছি। বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বনভূমিকে ধ্বংস করার পরিণতিতেই এখন দেশের বায়ুর মান গত তিন বছরেই বেশি খারাপ হয়েছে। এটা দিন দিনই খারাপের দিকে যাচেছ। যে হারে উজাড় করা হচ্ছে দেশের বনভূমি-তা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে সেটা নেমে আসবে ৫ শতাংশে। দেখা গেছে- গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বনাঞ্চল ধ্বংস করা হয়েছে। একশ্রেণীর প্রভাবশালীর ভোগলিপ্সা ও বন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চরম দুর্নীতি, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনাই বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ। সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির হিসাব মতে- মাত্র এক লাখ ৬০ হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সারাদেশে দুই লাখ ৫৭ হাজার একর বনভূমি দখল করে আছে। দখল করা এই বনভূমি রয়েছে ২৮টি জেলায়। বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি কক্সবাজারে। এই জেলায় মোট দখল হওয়া জমির পরিমাণ ৫৯ হাজার ৪৭১ একর। দখলকৃত জমির এক লাখ ৩৮ হাজার একর সংরক্ষিত বন, ৮৮ হাজার ২২৫ ব্যক্তি ও সংস্থার দখলে ছিল। কিন্তু বার বার চেষ্টা করে উদ্ধার করাও যাচ্ছে না- দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া যাচ্ছে না। দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার ও সংরক্ষণ করার কার্যক্রম শুধু বক্তৃতা বিবৃতি ও সেমিনারেই সীমাবদ্ধ। দেশের বন ভূমির এক হতাশাজনক অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বন দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী- ২০১২ সাল থেকে বন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে প্রতি বছর ২১ মার্চ আন্তর্জাতিক বন দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বন পুনরদ্ধার, উত্তরণ ও কল্যাণের পথ-প্রতিপাদ্যে আজ রবিবার দিবসটি পালিত হবে। তবে আজকের কার্যক্রমও অতীতের মতোই গতানুগতিক আয়োজনেই পালিত হচ্ছে। জাতির সামনে নতুন সুখবর দেয়ার তেমন কিছুই নেই। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বন দখল ও ধ্বংস সরকারী ও বেসরকারী উভয় উদ্যোগেই ঘটেছে। পরিবেশের হুমকি জেনেও ১ লাখ ৬০ হাজার একর বনভূমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে দেয়া হয়েছে ৪৩ হাজার ৯৫ একর জমি। এ ছাড়া, অন্যান্য সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২১ একর বনভূমি । সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে দখলদারদের নামসহ তথ্য-উপাত্ত জমা দিয়েছে বন বিভাগ। কমিটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বনভূমি দখলকারীদের নাম প্রকাশ করতে বলেছে। যাতে করে জনগণ তাদের শনাক্ত করতে পারে এবং দখলদারদের তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়। এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সূূত্রে জানা যায়- দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কমিটি বনভূমি দখলকারীদের একটি সম্পূর্ণ এবং বিস্তারিত তালিকা পেয়েছে। এটি পাঁচ হাজার পৃষ্ঠার এক বিশাল নথি। দখলকৃত এসব বনভূমি দ্রুত উদ্ধারে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছে সংসদী কমিটি। জবাবে কমিটিকে বলা হয়-মন্ত্রণালয় দখলদারদের কাছ থেকে বনভূমি উদ্ধার করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যেই জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি দিয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে যেন ‘ভাল পরিমাণ’ বনভূমি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বন বিভাগের মতে, গত অক্টোবর থেকে শুরু করে তিন মাসে ইতোমধ্যে ৫৩৪ একর বনভূমি পুনরদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বনভূমি হস্তান্তরের সুপারিশ করার পাশাপাশি সংসদী কমিটি প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ ছাড়া কোন সরকারী বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে উন্নয়নের নামে বনভূমি বরাদ্দ দেয়া বন্ধ করতে বলেছে।

জানা গেছে- গত পঞ্চাশ বছরে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি বেদখল হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এখানে বেদখল হয়ে পড়া জমির পরিমাণ ১৩ হাজার একরের বেশি। তবে বাস্তবে এ জমির পরিমাণ আরও বেশি। এমনকি কতজন দখলদার এসব জমি দখল করে নিয়েছেন, তারও সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই বন বিভাগের কাছে। অবশ্য বন বিভাগের মতে- চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ১ লাখ ৪০ হাজার একরের মধ্যে জবরদখল হওয়া জমির পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার ১৩০ একর। এর মধ্যে মিরসরাইয়ে ৩ হাজার ৩২ একর, সীতাকু-ে ৩৫০, ফটিকছড়িতে ৮ হাজার ২৯৫, হাটহাজারীতে ৩৯৩, রাউজানে ৬৪৭ ও রাংগুনিয়ায় ৪১৪ একর জমি বেদখল হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সবচেয়ে বেশি জমি বেদখল হয়েছে ফটিকছড়ি উপজেলার সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনাঞ্চলের। উত্তর বন বিভাগের ১৯টি রেঞ্জের ৩৫টি বিটের কর্মকর্তার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ হাজার একর বনভূমি দখলে রেখেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। বিভিন্ন সময়ে এসব জমি উদ্ধার করা হলেও কয়েক দিন পরেই তা আবারও দখল করে নেন দখলকারীরা। বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানোও হয়েছে। বর্তমানে প্রভাবশালীরা প্রায় ১৩ হাজার একর বনভূমি জবরদখল করে তথ্য উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংগ্রাহকের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ পরিমাণ ২০ হাজার একর ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের বনাঞ্চলকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছে বন বিভাগ উত্তর, দক্ষিণ ও উপকূলীয় বনাঞ্চল। এর মধ্যে উত্তর বন বিভাগের আওতায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিমাণই বেশি। মূলত মিরসরাই, সীতাকু-, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ। এ বনাঞ্চলে ১৯টি রেঞ্জের ৩৫টি বিটে সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৩৭ একর। কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামে বনের জবরদখল হওয়া জমির একটি তালিকা করা হলেও তা পূর্ণাঙ্গ ছিল না। সেজন্য নতুন করে জবরদখলকারীদের তালিকা করতে কাজ করছে বন বিভাগ। এ তালিকা তৈরি সম্পন্ন হলে শুধু চট্টগ্রাম উত্তর নয়, গোটা চট্টগ্রামেরই দখলদারের তালিকা এবং বেদখল জমির সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে।

এদিকে এবার আন্তর্জাতিক বন দিবস উপলক্ষে বন অধিদফতরে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ আমীর হোসাইন চৌধুরী। প্রধান অতিথি থাকবেন-পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মোঃ শাহাব উদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন- পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমদ শামীম আল রাজী। এ সম্পর্কে বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন- আজকে দেশের বন বিভাগের চিত্র হতাশা ও উদ্বেগজনক থাকলেও অতীত ছিল অনেক গৌরবের। দেশ স্বাধীনের পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব বিষয়ে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টিতে সর্বপ্রথম কাজ শুরু করেছিলেন। যেমন দেশজুড়ে বৃক্ষ রোপণ, উপকূল সংরক্ষণে বনায়ন-পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, হাওর-বাঁওড়, নদ-নদী ও অন্যান্য জলাভূমি সংরক্ষণ, ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম প্রতিষ্ঠাসহ প্রকৃতি ও মানুষের কল্যাণে নানাবিধ প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। মূলত তাঁর এমন উদ্যোগ স্মরণীয় করে রাখতে মুজিববর্ষ উপলক্ষে বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনগণের মাঝে বিনামূল্যে ১ কোটি চারা বিতরণ করা হয়েছে। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বর্তমানে বাংলাদেশের বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দেশের মোট আয়তনের ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যা ২০২৫ সালের মধ্যে ২৪ শতাংশের বেশি উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়ে ইতোমধ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। চলতি বছর থেকে নতুন করে আরও কিছু নতুন পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

– বিশেষ প্রতিনিধি