বিশেষ প্রতিনিধি:
নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নতুন বছরে নতুনভাবেই এগোচ্ছে বিএনপি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মার্চ মাসজুড়ে ইতিবাচক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে দলটি। এর মধ্যে কয়েকটি কর্মসূচিতেও দলটির নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফ‚র্ত অংশগ্রহণ দেখা গেছে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, পুরনো ভুলে কিংবা কোনো ফাঁদে পা দেবে না দল। এবার কর্মসূচি হবে অনেকটা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট। জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে। এখন থেকে সরকারের কোনো ইস্যু তুলে দেবেন না তারা। দলের নিজস্ব দাবি বা ইস্যুতে আগামীতে আরও গতিশীল কর্মসূচি দেওয়া হবে।
দলের একাধিক সিনিয়র নেতারা বলছেন, উটকো সংঘাত এড়িয়ে চলবে বিএনপি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে চ‚ড়ান্ত লক্ষ ধরে এখনই শক্তি ক্ষয় করবে না। তৃণমূলের নেতাকর্মীদেরও অভিন্ন বার্তা দেওয়া হচ্ছে হাইকমান্ড থেকে। দলকে প্রতিটি ইউনিটে চাঙ্গা করতে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় নেতারাও কাজ করছেন। করোনার ব্যাহত যোগাযোগকে দেশব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে ফের চাঙ্গা করা হবে। এরই লক্ষ্যে গত বছরের শেষ দিকে ভিন্ন ভিন্ন কমিটি করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের কথা জানায় বিএনপি। তখন থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এ নিয়ে গত বুধবার ১৯ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। যার মধ্যে ৭ মার্চ আলোচনা সভাও রয়েছে। এর আগে বিএনপিকে ৭ মার্চে তেমন কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি। ওইদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।-সময়ের আলো
এ ছাড়াও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে আগামী ৩০ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়নে পুলিশ প্রধান ড. বেনজীর আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে বিএনপির প্রতিনিধিদল। পুলিশের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে আশ^াস পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
দলের স্বাধীনতা সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন জাতীয় কমিটির আহŸায়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বিএনপি বছরজুড়ে নানা কর্মসূচি পালন করবে। প্রতি মাস শেষ হওয়ার আগে পরের মাসের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার মার্চ মাসের কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো। পহেলা মার্চ সুবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচির উদ্বোধন হবে।
২ মার্চ ছাত্র সমাজ কর্তৃক স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন শীর্ষক আলোচনা সভা, ৩ মার্চ ছাত্র সমাজ কর্তৃক স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ শীর্ষক আলোচনা সভা, ৭ মার্চ আলোচনা সভা, ৮ মার্চ বিশ^ নারী দিবস পালন, ৯ মার্চ সেমিনার, ১০ মার্চ রচনা প্রতিযোগিতা, ১৩ মার্চ বছরব্যাপী রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধন, ১৫ মার্চ চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ২০ মার্চ আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ক সেমিনার, ২২ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ, জেড ফোর্স এবং বীর উত্তম জিয়াউর রহমান শীর্ষক সেমিনার, ২৩ মার্চ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মেলা, ২৪ মার্চ নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে স্বৈরাচারী এরশাদের জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল শীর্ষক সেমিনার, ২৫ মার্চ কাল রাত্রি শীর্ষক আলোচনা সভা, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, জিয়াউর রহমানের কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ, রক্তদান কর্মসূচি, সারা দেশে শোভাযাত্রা, ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে ও বগুড়ায় বাগবাড়ি গমন এবং দুই জায়গায় আলোচনা সভা, ২৮ মার্চ মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা, ৩০ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সুবর্ণজয়ন্তী মহাসমাবেশ এবং ৩১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের বইমেলা ও চিত্রাঙ্কন প্রদর্শনীর উদ্বোধন।
এসব কর্মসূচি পালন করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আমাদের এসব অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠুভাবে যাতে করতে পারি তার জন্য সহযোগিতা চেয়েছে দল। বুধবার পুলিশ প্রধানের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে বিএনপির প্রতিনিধিদলের প্রধান আবদুস সালাম বলেছেন, উনি ‘কাইন্ড এনাফ’। উনি বলেছেন, তাদের দিক থেকে কোনো অসুবিধা নেই। সারা দেশে জানিয়ে দেবেন, যাতে প্রোগ্রামগুলো ঠিকমতো করতে পারি। এর আগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনে পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ করে আসছিলেন বিএনপির নেতারা। তবে এ সুর শোনা যায়নি এ যাত্রায়।
তিনি বলেন, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের দল, মুক্তিযোদ্ধার দল। কাজেই এই বিষয়টাকে উপস্থাপন করার জন্যই আমরা কর্মসূচি নিয়েছি। সারা দেশব্যাপী কর্মসূচি যাতে করতে পারি, যাতে নির্বিঘেœ করা যায়, এ ব্যাপারে আইজিপির সহযোগিতা চেয়েছি। আইজিপি আশ^স্ত করার পাশাপাশি কিছু পরামর্শও দিয়েছেন বলে জানান বিএনপি নেতা সালাম। ২৬ ফেব্রæয়ারি নয়াপল্টন থেকে শোভাযাত্রা এবং ৩০ ফেব্রæয়ারি সমাবেশ করার জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চেয়েছে বিএনপি।
এর আগে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির প্রথম বিভাগীয় সমাবেশ বরিশালে বড় কোনো বাধা ছাড়াই সফলভাবে সমাবেশ করেছে বিএনপি। পুলিশের কড়াকড়ি অবস্থান থাকলেও অপ্রীতিকর বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। কাল খুলনার সমাবেশেও পুলিশের অনুমতি পেয়েছে বলে জানা গেছে। সামনে রয়েছে চট্টগ্রামে সমাবেশ। সেখানেও বড় জমায়েত করতে চায় বিএনপি।
সম্প্রতি প্রেসক্লাবে এক কর্মসূচিতে লাঠিপেটা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন জখম হয়। এর রেশ ধরে হামলা মামলা ও ধরপাকড়ও হয়েছে বেশ। গেল দুই সপ্তাহ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বীর উত্তম খেতাব বাতিলের উদ্যোগের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করে বিএনপি।
দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, মার্চের ১, ২, ৩ ও ৭ মার্চের সব দিনগুলো অবজারভ করবেন তারা। এই দিনগুলোতে কার কতটুকু অবদান ছিল, সেগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরবে বিএনপি। কাউকে খাটো করে বড় হতে চান না। যার যতটুকু অবদান, সে অবদানটুকুই জনগণ বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে সামনে তুলে ধরবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করব। বিএনপি বরাবরই ইতিবাচক কর্মসূচি দিয়েছে। সুবর্ণজয়ন্তীতে বছরব্যাপী নানা আয়োজন রয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে আমরা সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে চাই। তারা এটা কীভাবে নেবে, তারাই ব্যক্ত করবে। তিনি বলেন, আমরা আশা করি সরকার আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দেবে না। পুলিশের সহযোগিতা পাব।
বিএনপির এসব কর্মসূচিকে ইতিবাচক উল্লেখ করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, এখন দেখার বিষয় তারা এসব ঘরে বসে করে না মাঠে গিয়ে করে। মাঠে করলে তো নিশ্চয়ই সাধুবাদ পাবে। এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, বিএনপি অনেক বড় বড় সুযোগ হাতছাড়া করেছে। ইস্যু মিস করার দল। ছাত্রাবাস খুলে দেওয়ার দাবিতে ছাত্ররা আন্দোলন করছে, বিএনপির উচিত ছিল তাদের সঙ্গে থাকা। সহমত জানানো। জনগণ চায় বিএনপি তাদের কাছে যাক। কিন্তু তারাই তো যায় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান বলেন, বিএনপির কর্মসূচি আর পুলিশের সহযোগিতামূলক বাক্য শুনে মনে হচ্ছেÑ সরকার চায় বিএনপি মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসুক। আসলে যে যাই বলুক না কেন, শক্ত বিরোধী দল ছাড়া সরকারও শক্তিশালী হতে পারে না।











































