Home খেলাধুলা ব্যালন ডি’অরের ইতিহাস, ভোট ও বিজয়ী নির্বাচনের নিয়ম

ব্যালন ডি’অরের ইতিহাস, ভোট ও বিজয়ী নির্বাচনের নিয়ম

5



স্পোর্টস ডেস্ক

হ্যারি কেইন, লামিনে ইয়ামাল, নাকি অন্য কেউ? বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর ঘিরে এমন প্রশ্নই এখন সমর্থকদের মনে। কে জিতবেন, তা নিয়ে আলোচনা থাকলেও বিজয়ী বেছে নেওয়ার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, দলের সাফল্য ও মাঠে তাদের আচরণ, সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই দেওয়া হয় এই পুরস্কার।

ফ্রান্স ফুটবল সাময়িকীর আয়োজনে এবারের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠান হবে লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে। এ অনুষ্ঠানটি ঐতিহ্যগতভাবেই প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ৭০তম আয়োজন লন্ডনে করার পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। ১৯৫৬ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথুসের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ব্ল্যাকপুল শহরে। তার প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই এবার লন্ডনে হচ্ছে অনুষ্ঠান। পুরুষ ও নারী ফুটবলের সেরা খেলোয়াড়দের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয় এই আয়োজনে।

ব্যালন ডি’অর কী?

ফরাসি ভাষায় ব্যালন ডি’অর অর্থ ‘সোনার বল’। বিশ্বের সেরা ফুটবলারকে স্বীকৃতি দিতে ১৯৫৬ সালে এই পুরস্কার চালু করে ফ্রান্স ফুটবল সাময়িকী। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে একবারই পুরস্কার দেওয়া হয়নি।

শুরুর দিকে ইউরোপের ফুটবলারদের মধ্যেই এই পুরস্কার সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৯৫ সালে ইউরোপের ক্লাবে খেলা অন্য মহাদেশের খেলোয়াড়দেরও বিবেচনায় নেওয়া শুরু হয়। ২০০৭ সাল থেকে বিশ্বের যেকোনো দেশের ফুটবলার এই পুরস্কারের জন্য যোগ্য বিবেচিত হচ্ছেন।

লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, জিনেদিন জিদানসহ ফুটবল ইতিহাসের বহু কিংবদন্তি জিতেছেন ব্যালন ডি’অর। রেকর্ড আটবার এই পুরস্কার জিতেছেন মেসি। রোনালদোর জয় পাঁচবার।

কীভাবে নির্বাচিত হন বিজয়ী?

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০টি দেশের ১০০ জন অভিজ্ঞ সাংবাদিক নিয়ে ব্যালন ডি’অরের জুরি বোর্ড গঠিত হয়। নারী বিভাগে ভোট দেন শীর্ষ ৫০ দেশের একজন করে সাংবাদিক। সেই বোর্ডের প্রতি সদস্য তাদের বিবেচনা অনুযায়ী সেরা ১০ জন ফুটবলারকে ক্রমানুসারে সাজিয়ে যথাক্রমে ১৫, ১২, ১০, ৮, ৭, ৫, ৪, ৩, ২ ও ১ পয়েন্ট দেন। সব ভোটের পয়েন্ট যোগ করে যিনি সর্বোচ্চ নম্বর পান, তিনিই জেতেন ব্যালন ডি’অর। দুই বা ততোধিক খেলোয়াড়ের পয়েন্ট সমান হলে প্রথম স্থানে কতবার ভোট পেয়েছেন, তা দেখা হয়। এরপরও সমতা থাকলে দ্বিতীয় স্থানের ভোটসহ পরবর্তী অবস্থানের হিসাব বিবেচনা করা হয়।

ভোটে কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়?

২০২২ সালে ব্যালন ডি’অরের মূল্যায়নপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। আগে খেলোয়াড়ের পুরো ক্যারিয়ারের অর্জনও আলোচনায় আসত। নতুন নিয়মে মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়: ১. ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স: বিবেচ্য মৌসুমে খেলোয়াড়ের নৈপুণ্য, ধারাবাহিকতা ও অবদান। ২. দলীয় সাফল্য: ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে অর্জন এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভূমিকা। ৩. আচরণ ও ফেয়ার প্লে: মাঠে খেলোয়াড়ের আচরণ, খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতা ও নৈতিকতা।

একসময় ব্যালন ডি’অর ও ফিফার বর্ষসেরা পুরস্কার একীভূত হয়ে ‘ফিফা ব্যালন ডি’অর’ নামে দেওয়া হতো। ২০১৬ সালে দুই সংস্থার পথ আলাদা হয়ে যায়। এরপর ফ্রান্স ফুটবল আবার নিজস্ব ব্যালন ডি’অর দেয়, আর ফিফা চালু রাখে ‘দ্য বেস্ট’ পুরস্কার। ২০২৪ সাল থেকে উয়েফা ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে পুরস্কারের ভোট ও মূল দায়িত্ব ফ্রান্স ফুটবলের হাতেই রয়েছে।

ফুটবলারদের কাছে এত মর্যাদার কেন?

ব্যালন ডি’অরকে ফুটবলের অন্যতম বড় ব্যক্তিগত স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বজুড়ে এর পরিচিতি ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে এই পুরস্কার জেতা অনেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রে অস্কার যেমন বিশেষ মর্যাদা বহন করে, ফুটবলে ব্যালন ডি’অরকেও তেমন উচ্চতায় দেখা হয়।

কারা সবচেয়ে বেশি জিতেছেন?

পুরুষদের ব্যালন ডি’অরে সর্বোচ্চ আটবার বিজয়ী হয়েছেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। পাঁচবার জিতে দ্বিতীয় স্থানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি ও মার্কো ফন বাস্তেন তিনবার করে এই পুরস্কার জিতেছেন। ২০২৪ সালে পুরস্কারটি জেতেন স্পেনের মিডফিল্ডার রদ্রি। ২০২৫ সালের বিজয়ী ছিলেন ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে।

ব্যালন ডি’অরের বাইরে আরও যেসব পুরস্কার: মূল পুরস্কারের পাশাপাশি ফ্রান্স ফুটবল বিভিন্ন বিভাগেও স্বীকৃতি দেয়।

  • ব্যালন ডি’অর ফেমিনিন: নারী ফুটবলের সেরা খেলোয়াড়।
  • কোপা ট্রফি: অনূর্ধ্ব-২১ বয়সী সেরা ফুটবলার।
  • ইয়াসিন ট্রফি: সেরা গোলরক্ষক।
  • জার্ড মুলার ট্রফি: সেরা গোলদাতা বা স্ট্রাইকারের স্বীকৃতি।
  • সক্রেটিস অ্যাওয়ার্ড: মানবিক ও সামাজিক অবদানের স্বীকৃতি।
  • বর্ষসেরা ক্লাব: পুরুষ ও নারী ফুটবলের সেরা ক্লাব।
  • ইয়োহান ক্রুইফ ট্রফি: বর্ষসেরা পুরুষ ও নারী কোচের পুরস্কার।

এবারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় কারা?

প্রকাশিত তালিকায় হ্যারি কেইন, লামিনে ইয়ামাল, উসমান দেম্বেলে, কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসি, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, জুড বেলিংহাম, আর্লিং হলান্ড, রদ্রি, লাওতারো মার্তিনেজসহ ৩০ জন ফুটবলারের নাম রয়েছে।

ইএসপিএন সকারে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন ৩৩ বছর বয়সী হ্যারি কেইন। তাদের জরিপে তিন ভাগের দুই ভাগ ভোট পেয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখের এ ইংলিশ স্ট্রাইকার। ১৯ বছর বয়সী ইয়ামালের পক্ষে তাদের জরিপে ২৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। এরপর আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসি। ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকটি নাম হলো আর্লিং হালান্ড, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রি, জুড বেলিংহাম, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ভিতিনহা, পাউ কুবার্সি প্রমুখ। তবে শেষ বেলায় এসে লড়াইটা তিনজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সে তিনজন হলেন হ্যারি কেইন, লামিনে ইয়ামাল ও কিলিয়ান এমবাপ্পে।