আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
মধ্য এশিয়ার প্রতিরক্ষা বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পথে এগোচ্ছে ভারত। দেশটির তৈরি মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ‘আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কিনেছে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান।
এর মধ্য দিয়ে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহে রাশিয়ার ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকছে অঞ্চলটির দেশগুলো।
ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিং অক্টোবরের শুরুতে বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার রফতানিকে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আর্মেনিয়ার পর তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানেও এই ব্যবস্থা রফতানি করা হয়েছে। রাজেশ কুমার সিংয়ের ভাষ্য, আর্মেনিয়া ছিল আকাশের প্রথম বিদেশি ক্রেতা। দেশটি একাধিক ব্যাটারি কিনেছে। পরে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানেও এই ব্যবস্থা রফতানি করা হয়।
উৎপাদন এখন স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও অতিরিক্ত ক্রয়াদেশ রয়েছে। ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আরও ক্রয়াদেশ আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ভারতের প্রতিরক্ষা সচিবের এই বক্তব্যে এর আগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্যও সামনে এসেছে। ভারতীয় সাময়িকী বিডব্লিউ বিজনেসওয়ার্ল্ড জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার রফতানি গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
এএনআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও এই দুই দেশকে আকাশের ক্রেতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান এখনো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার সক্ষমতা
আকাশ ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা। শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় এটি ব্যবহার করা হয়। ব্যবস্থাটিতে ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি রাডার ও উৎক্ষেপণব্যবস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করে।
আকাশের রফতানি ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে ভারত নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশীয় অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির ক্রেতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তবে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান কতটি ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কিনেছে, কখন সেগুলো সরবরাহ করা হবে এবং চুক্তির আর্থিক মূল্য কত—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
আর্মেনিয়ার চুক্তিতে মিলতে পারে ধারণা
তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে ভারতের চুক্তির বিস্তারিত জানা না গেলেও আর্মেনিয়ার সঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
২০২২ সালে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভারত ডায়নামিকস লিমিটেডের (বিডিএল) সঙ্গে ৭২ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করে আর্মেনিয়া। চুক্তিতে কতটি আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ছিল, তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে এতে ১৫টি অশ্বিন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধকও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সরবরাহের সময়সূচি পিছিয়ে যাওয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে আর্মেনিয়া প্রথম আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যাটারি পায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ব্যাটারিতে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক ও একটি রাজেন্দ্র রাডার ছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দ্বিতীয় চালান সরবরাহের খবরও প্রকাশিত হয়।
আর্মেনিয়ার সঙ্গে চুক্তি ও সরবরাহের অভিজ্ঞতা থেকে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সম্ভাব্য ক্রয়াদেশ বাস্তবায়ন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে দেশ দুটি ঠিক কোন সংস্করণের ব্যবস্থা কিনেছে এবং কবে সেগুলো হাতে পাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তাজিকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সামরিক যোগাযোগ
তাজিকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সামরিক যোগাযোগ নতুন নয়। অক্সাস সোসাইটির ২০২৪ সালের অক্টোবরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সামরিক খাতে ভারতের সম্পৃক্ততার সূচনা ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে। সে সময় তাজিকিস্তানের আইনির বিমানঘাঁটি সংস্কারে ভূমিকা রেখেছিল ভারত।
তবে বিমানঘাঁটিটি সংস্কারের পর তাজিকিস্তান আবার রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেখানে ভারতের নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের পরিকল্পনা থেকেও দেশটি সরে আসে। এর পরিবর্তে দুশানবে মস্কোর সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করে, যার আওতায় রুশ বাহিনী ঘাঁটিটি ব্যবহারের সুযোগ পায়।
এ ছাড়া আফগানিস্তান সীমান্তের কাছে অবস্থিত ফারখোর বিমানঘাঁটিতে ভারতের প্রবেশাধিকার ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেখানে ভারতের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি ছিল না।
আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা রফতানির এই উদ্যোগ তাজিকিস্তানের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গেও সামরিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হতে পারে।
রাশিয়ার নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
মধ্য এশিয়ার দেশগুলো সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এ অঞ্চলের অধিকাংশ দেশের সামরিক বাহিনীর অস্ত্র, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির বড় অংশ এখনো সোভিয়েত আমলের নকশা অথবা রাশিয়াভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন, তুরস্ক, ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলোর তৈরি সামরিক সরঞ্জামও এ অঞ্চলের বাজারে প্রবেশ করছে। আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কেনার উদ্যোগকে এই বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তবে ভারত থেকে একটি নির্দিষ্ট ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কেনার ফলে মধ্য এশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যায় না। এর প্রভাব নির্ভর করবে চুক্তির আকার, সরবরাহের পরিমাণ এবং ভবিষ্যতে দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কতটা বিস্তৃত হয়, তার ওপর।
তারপরও এই উদ্যোগের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য শুধু রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না; বরং নতুন অংশীদার ও বিকল্প সরবরাহকারীর সন্ধান করছে।
নতুন অস্ত্রের সঙ্গে সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ
বিভিন্ন দেশের তৈরি সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হলেও কিছু জটিলতাও দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ বা আন্তঃকার্যক্ষমতা—অর্থাৎ ভিন্ন দেশ ও প্রযুক্তিতে তৈরি সামরিক ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারার সক্ষমতা।
রাশিয়া বা সোভিয়েত আমলের রাডার, যোগাযোগব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে ভারতীয় প্রযুক্তির সমন্বয় করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে কারিগরি ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশের সরবরাহ এবং বিদ্যমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সব মিলিয়ে, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানে ভারতের আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা রফতানির খবর দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহে বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টাকেও সামনে এনেছে। তবে চুক্তির পরিমাণ, সরবরাহের সময়সূচি ও প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের বিস্তারিত প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এর প্রকৃত সামরিক প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।











































