Home Lead ফিরছে গ্রাম সরকার, প্রস্তুত নতুন আইনের খসড়া

ফিরছে গ্রাম সরকার, প্রস্তুত নতুন আইনের খসড়া

5


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্যোগে প্রায় ১৭ বছর পর আবারও ফিরে আসছে গ্রাম সরকারব্যবস্থা। গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত এবং তাদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনর্বহালের বিষয়ে প্রস্তাব ওঠে। সরকারপ্রধানও এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে রহিত হওয়া ২০০৩ সালের গ্রাম সরকার আইন পরিমার্জন করে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়। এতে আগের আইনের কাঠামো বহাল রাখা হয়েছে। তবে সদস্য নির্বাচন, প্রতিনিধিত্বের ধরন, সদস্যসংখ্যা ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।


খসড়া অনুযায়ী গ্রাম সরকারে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য থাকবেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য প্রধান এবং সংরক্ষিত আসনের সদস্য উপদেষ্টা হবেন। সদস্যদের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকবে। এ ক্ষেত্রে মোট ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
এই সরকারের অন্যতম কাজ হবে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মাদক ও জুয়া প্রতিরোধ, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, সমবায়, কুটিরশিল্প, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সহায়তা করা। পাশাপাশি স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায়ও সহায়তা করবে।


যেভাবে শুরু হয়েছিল গ্রাম সরকার: দেশে গ্রাম সরকারব্যবস্থার সূচনা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে তার সময়ে এ সরকার চালু করা হয়। ১৯৮০ সালের আইনের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে ব্যবস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন কর্মসূচির অন্যতম অংশ হিসেবে গ্রাম সরকার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী চালু করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন বিএনপি সংশ্লিষ্টরা। তবে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর গ্রাম সরকার ব্যবস্থা বেশিদিন টেকেনি। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে এটি বিলুপ্ত করা হয়। পরে গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় সরকার কাঠামো ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালে ‘স্থানীয় সরকার (গ্রাম পরিষদ) আইন’ করা হয়। এরপর ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে নতুন করে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০০৩’ করা হয়। আইনটি ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে প্রণীত হয়।

এ আইনে প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা এবং ১৩ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের বিধান ছিল। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য প্রধান এবং সংরক্ষিত সদস্য উপদেষ্টা হতেন। বাকি ১৩ জন সদস্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে মনোনীত হওয়ার কথা ছিল। দেশে গ্রাম সরকারব্যবস্থার সূচনা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে তার সময়ে এ সরকার চালু করা হয়। ১৯৮০ সালের আইনের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে ব্যবস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
যে কারণে বাদ হয়েছিল ব্যবস্থাটি: ২০০৩ সালের আইনটি প্রণয়নের পরপরই এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট বা ব্লাস্ট ২০০৩ সালে আইনটির ধারা ৪-কে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করে। মামলায় বিশেষ করে মনোনীত সদস্যদের নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ে।


২০০৫ সালের ২ আগস্ট হাইকোর্ট গ্রাম সরকার আইনকে অসাংবিধানিক ও অকার্যকর ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংবিধানের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, ২০০৩ সালের আইনে গ্রাম সরকারের অধিকাংশ সদস্য মনোনীত হওয়ার সুযোগ থাকায় তা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। রিটে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সদস্য মনোনয়নের ব্যবস্থাকেও স্থানীয় সরকারের ওপর আমলাতান্ত্রিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার লিভ টু আপিল করলেও তা খারিজ হয়ে যায়। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে গ্রাম সরকার (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এরপর ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘গ্রাম সরকার (রহিতকরণ) বিল’ পাস হয়। ফলে ২০০৩ সালের আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত হয়ে যায়।


তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সংসদে আইনটি বাতিলের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেছিলেন, গ্রাম সরকার স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর কোনো অবদান রাখতে পারেনি। এর তহবিল তছরুপ ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগও উঠেছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন।


নতুন আইনের খসড়ায় যা আছে: নতুন খসড়ায় প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। একজন গ্রাম সরকার প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য নিয়ে এটি গঠিত হবে। অর্থাৎ ২০০৩ সালের আইনের তুলনায় সদস্যসংখ্যা ১৩ থেকে বাড়িয়ে ১৫ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গ্রাম সরকার প্রধান এবং সংরক্ষিত সদস্য উপদেষ্টা হবেন। সংরক্ষিত আসনের সদস্য তার আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকাধীন সব গ্রাম সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সদস্যদের ক্ষেত্রে নতুন খসড়ায় দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবক, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দুজন সদস্যের মধ্যে একজন পুরুষ ও একজন নারী, দুজন কৃষক, একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার, একজন সমবায় সমিতির সদস্য, একজন পল্লি চিকিৎসক, একজন শিক্ষক, একজন ব্যবসায়ী, একজন পেশাজীবী, একজন শ্রমিক, একজন যুব প্রতিনিধি এবং একজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।


স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, এখানে ২০০৩ সালের আইনের তুলনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতিতে। আগের আইনে ১৩ সদস্যের বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধিকে মনোনয়নের বিধান ছিল। নতুন খসড়ায় ওয়ার্ডের ভোটারদের কমপক্ষে ১০ শতাংশের উপস্থিতিতে পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে হ্যাঁ/না ভোটের মাধ্যমে সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০০৩ সালের আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের আপত্তির কেন্দ্রেও সদস্য মনোনয়নের বিষয়টি ছিল।


খসড়ায় গ্রাম সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর রাখা হয়েছে। আছে গ্রাম সরকার প্রধান, উপদেষ্টা ও সদস্যদের শপথ গ্রহণের বিধান। সদস্যের অযোগ্যতা, পদত্যাগ, অপসারণ ও শূন্য পদ পূরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। গ্রাম সরকার প্রধানের পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে উপদেষ্টা এবং তার অনুপস্থিতিতে প্যানেলভুক্ত সদস্যদের মধ্য থেকে একজন অস্থায়ী গ্রাম সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথম সভায় তিন সদস্যের একটি প্যানেল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে এবং প্যানেলে অন্তত একজন নারী সদস্য থাকতে হবে।



গ্রাম সরকারের কাজ কী হবে: গ্রামের রাস্তা-ঘাট ও কালভার্ট উন্নয়নের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা প্রণয়ন, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয় পর্যালোচনা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব থাকবে গ্রাম সরকারের।

এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার কর্মসূচিতে সহযোগিতা করবে। কৃষি উপকরণের সংকট সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং গ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্যোগও থাকবে।
সেই সঙ্গে নতুন খসড়ায় সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়েকটি নতুন দায়িত্ব যুক্ত করা হয়েছে। সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড বিতরণ এবং তথ্য সংগ্রহে সহায়তা, ভিজিএফ ও ভিজিডি কার্যক্রমে সহযোগিতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সহায়তা এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গ্রাম সরকার প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার সভা করবে। আর প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার সাধারণ সভা হবে, যেখানে ওয়ার্ডের ভোটারদের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি থাকতে হবে। প্রতিটি দায়িত্বের জন্য কমিটি এবং প্রয়োজন হলে সাব-কমিটি গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে।


গ্রাম সরকারের জন্য আলাদা তহবিল থাকবে। ইউনিয়ন পরিষদ এবং অন্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থ ওই তহবিলে জমা হবে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান বা নারী ভাইস চেয়ারম্যান, পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম সরকারের কাজ পরিদর্শন করতে পারবেন। জেলা প্রশাসক তদন্তের পর প্রয়োজন মনে করলে গ্রাম সরকার বাতিলও করতে পারবেন। তবে তার আগে গ্রাম সরকারকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে।


গ্রাম সরকার চালুর বিষয়ে নতুন আইনের খসড়া নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব (ইউনিয়ন পরিষদ অধিশাখা) মিনারা নাজমীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘খসড়া করা হয়েছে। এখন এ বিষয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব সিদ্ধান্ত দেবেন।’