Home আঞ্চলিক চিংড়িতে মন্দা, পাবদা-টেংরায় খুলনার নতুন স্বপ্ন

চিংড়িতে মন্দা, পাবদা-টেংরায় খুলনার নতুন স্বপ্ন

4

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

খুলনা অঞ্চলের চিংড়ি রপ্তানি বাণিজ্যে টানা তিন বছর ধরে কাঙ্ক্ষিত সুখবর নেই। এর মধ্যে পূজা উপলক্ষে ইলিশ রপ্তানির অনুমোদনও এখনো দেয়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে এরই মধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছে খুলনা ও আশপাশের অঞ্চলে উৎপাদিত পাবদা ও টেংরা মাছ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় এসব মাছের চাহিদা বাড়ায় সপ্তাহে তিন দিন সীমান্তপথে রপ্তানি হচ্ছে।

চিংড়ি চাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ না হওয়ায় কয়েক বছর ধরে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের অনেক চাষি কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ, মাগুর, তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস মাছ চাষে ঝুঁকেছিলেন। তুলনামূলক কম খরচে পাবদা ও টেংরা উৎপাদনে ভালো লাভ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় এখন এসব মাছের বাণিজ্যিক চাষে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন তারা। ইতোমধ্যে খুলনার পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া, সাতক্ষীরার কলারোয়া এবং যশোরের শার্শা, মনিরামপুর ও ঝিকরগাছায় গড়ে উঠেছে পাবদা ও টেংরার খামার।

রপ্তানিকারকেরাও এ খাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বাগেরহাটের মোংলা, রামপাল ও সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার জেলেদের কাছ থেকে টেংরা সংগ্রহে রপ্তানিকারকরা দাদন দিচ্ছেন। গত এক বছর ধরে যশোরের বেনাপোল, সিলেটের চাতলাপুর ও আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাবদা ও টেংরা ভারতে যাচ্ছে।

মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন খুলনার ব্যবস্থাপক মো. আকবর হোসেন বলেন, পাবদা ও টেংরা রপ্তানির মাধ্যমে দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এসব মাছের চাষ হওয়ায় স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের অনেক মানুষ লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে এসে মিঠাপানির মাছ চাষে যুক্ত হচ্ছেন। তিনি জানান, প্রতি সপ্তাহে গড়ে পাঁচ মেট্রিক টন পাবদা ও টেংরা রপ্তানি হচ্ছে। ভারতের তিনটি রাজ্যে এসব মাছের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।

যশোরের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জারিন এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. ফারুক হোসেন লিটু বলেন, ভারতে প্রতি কেজি পাবদা ও টেংরা প্রায় ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে এসব মাছের চাহিদা বেড়েছে। চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সপ্তাহে তিন দিন মাছ রপ্তানি করা হচ্ছে। খামার থেকে সংগ্রহের পর প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই এসব মাছ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বড় বড় আড়তে পৌঁছে যাচ্ছে। ময়মনসিংহ থেকেও এসব মাছ ভারতে রপ্তানি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বেনাপোলের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মাহাতাব অ্যান্ড সন্সের ব্যবস্থাপক আক্তারুজ্জামান জানান, আগামী সোমবার সাড়ে তিন মেট্রিক টন পাবদা ও টেংরা বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠানো হবে। আগামী বছর নাগাদ এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আরও বেশি মাছের খামার গড়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। পশ্চিমবঙ্গের বাজারে দক্ষিণাঞ্চলের রুই ও কাতলা মাছেরও ভালো চাহিদা রয়েছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে মোট ১ কোটি ৩৭ লাখ ৪২ হাজার ৬৯০ কেজি মাছ ভারতে রপ্তানি হয়েছে। এর রপ্তানি মূল্য ছিল ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৫ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে পাবদা মাছ। মোট রপ্তানি করা মাছের প্রায় ৮৮ শতাংশই ছিল পাবদা। সার্বিক মাছ রপ্তানিতে ইলিশের অংশ ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে রপ্তানি হয়েছিল ৮২ লাখ ৯২ হাজার ৫৫০ কেজি মাছ। ওই মাছের রপ্তানি মূল্য ছিল ২ কোটি ৫৪ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭৫ মার্কিন ডলার। সেবারও রপ্তানির বড় অংশজুড়ে ছিল পাবদা মাছ।

এদিকে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) বিদেশে মাছ রপ্তানির জন্য খুলনা অঞ্চলের ২০ জন রপ্তানিকারককে অনুমোদন দিয়েছে। গত বছরের ২৪ নভেম্বর বিএফডিসির সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে।

খুলনার মাছ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিংড়ি রপ্তানিতে দীর্ঘদিনের মন্দার মধ্যেও পাবদা ও টেংরার রপ্তানি দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ভারতের বাজারে চাহিদা ধরে রাখা গেলে আগামী দিনে এসব মাছের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও রপ্তানি আরও বাড়বে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে, অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চাষিদের জন্য তৈরি হবে নতুন আয়ের সুযোগ।