দাকোপ (খুলনা) প্রতিনিধি
এক পাশে সুন্দরবনের করমজল, অন্য পাশে জনবসতি। পূর্বে পশুর নদী, পশ্চিমে ঢাংমারী নদী। দুই নদীর মাঝখানে বিচ্ছিন্ন এক জনপদ রেখামারি। সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এই গ্রামটি এখন নদীভাঙনে অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। ইতিমধ্যে অনেক পরিবারের ভিটেমাটি ও চলাচলের রাস্তা নদীতে বিলীন হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুই নদীর মাঝ দিয়ে গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গেছে একটি সরু রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে বাঁশের চালার ঘরে বসবাস করছে প্রায় শতাধিক পরিবার। রাস্তার কয়েকটি অংশ ভেঙে যাওয়ায় পায়ে হেঁটে চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভ্যান বা মোটরসাইকেল নিয়ে এ রাস্তা দিয়ে চলাচলের সুযোগ নেই।
গ্রামের শেষ প্রান্তে রয়েছে ঢাংমারী ফরেস্ট অফিস। নদীভাঙনের কবলে পড়েছে অফিসটিরও কিছু অংশ। জোয়ারের পানি বাড়লে গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির উঠান তলিয়ে যায়। সব মিলিয়ে উন্নয়নবঞ্চিত এই জনপদের বাসিন্দাদের জীবন কাটছে নানা সংকটের মধ্যে।
স্থানীয়রা জানালেন, প্রায় এক শতাব্দী ধরে রেখামারিতে মানুষের বসবাস। সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন এখানকার অধিকাংশ মানুষ। দীর্ঘ সময় ধরে বসবাস করেও এই জনপদে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। নদীভাঙনে অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। চলাচলের রাস্তাটিও এখন ভাঙনের মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকার আসে, সরকার যায়; প্রতিবারই তারা নানা প্রতিশ্রুতি পান। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার তেমন পরিবর্তন হয়নি। জনপ্রতিনিধিরা এসে পরিস্থিতি দেখে গেলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। দুই পাশের নদীর ভাঙনে এখন সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
নদীর চরে বাঁশের চালার ঘরে বসবাস করেন মোমেনা বেগম (৬৫)। তিনি বললেন, ‘একসময় আমাদের ভিটেবাড়ি সবই ছিল। পশুর নদীর ভাঙনে সব হারিয়ে এখন রাস্তার পাশের চরে বাঁশের ঘরে থাকছি। কেউ আমাদের কথা ভাবে না। নদীতে পানি বাড়লে ঘরে পানি উঠে যায়। দুর্যোগ এলে মনে হয়, এই বুঝি ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’
মোমেনা বেগমের আক্ষেপ, ‘নদীভাঙনে এখন শেষ সম্বল রাস্তাটিও বিলীনের পথে। রাস্তা ভেঙে গেলে থাকার মতো আর কোনো জায়গা থাকবে না।’
স্থানীয় বৃদ্ধ খোকন মন্ডল বললেন, ‘আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই, কেউ খোঁজও নেয় না। অন্য এলাকায় উন্নয়ন হলেও আমাদের ভাগ্যে এখনো উন্নয়ন জোটেনি। এখানকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। নদীভাঙন ও জোয়ারের পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে কতদিন টিকে থাকতে পারব, জানি না।’
ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি রাস্তাঘাটের উন্নয়নের দাবি জানান খোকন মন্ডল।
সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জয় কুমার মন্ডল বললেন, রেখামারি গ্রামের নদীভাঙন পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েকবার রাস্তা নির্মাণ করা হলেও ভাঙনে তা বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত বাজেট দিয়ে এত বড় ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। বিষয়টি তিনি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। নদীর পাড়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও রাস্তা সংস্কারে জরুরি সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বোরহান উদ্দিন মিঠু বললেন, রেখামারি এলাকার বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানার পর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানুষের ভোগান্তি কমানো ও নদীভাঙন রোধে জেলা পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমানের দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হবে। নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।











































