চিতলমারী (বাগেরহাট) প্রতিনিধি।।
বয়স সত্তরের ঘর পেরিয়েছে। আপন বলতে কেউ নেই। একসময় ভিক্ষা করে চললেও বয়স ও অসুস্থতার ভারে এখন সেই সামর্থ্যও নেই। ২০ বছর আগে স্বামী রুস্তম শেখ মারা যাওয়ার পর থেকে পলিথিনে মোড়ানো একটি ছোট ঝুপড়িই তাঁর ঠিকানা। বৃষ্টি হলে ছাউনি ভেদ করে ঘরে পানি পড়ে, রোদে পলিথিনের ঘর হয়ে ওঠে অসহনীয় গরম। ঝড়-বাতাসে উড়ে যায় ঘরের ছাউনি। নিরাপদ ঠাঁই না থাকায় এভাবেই দিন কাটছে বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার ঘোলা গ্রামের সবুরা খাতুনের।
সরেজমিনে দেখা যায়, বড়বাড়িয়া ইউনিয়নের ঘোলা জিবিডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে ছোট একটি ঝুপড়িতে বসবাস করছেন সবুরা খাতুন। চারপাশে বেড়া হিসেবে টানানো হয়েছে ছেঁড়া কাপড় ও প্লাস্টিকের বস্তা। মাথার ওপর ছেঁড়া পলিথিনের ছাউনি। সামান্য বাতাসেই সেই ছাউনি উড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। চারপাশে জমে থাকে স্যাঁতসেঁতে কাদা।
ঝুপড়ির ভেতরে আসবাবপত্র বলতে একটি কলসি, কয়েকটি থালা-বাটি আর অল্প কিছু কাপড়চোপড়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা কিংবা কাজকর্ম করতে পারেন না সবুরা। উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় প্রতিবেশীদের সহায়তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করতে হয় তাঁকে।
ঘোলা গ্রামের বাসিন্দা সনিয়া বেগম বলেন, ‘সবুরা খাতুনের নিজের কোনো ভিটেমাটি নেই। আমার মা তাঁকে থাকার জন্য একটু আশ্রয় দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য নেই তাঁকে ঘর তৈরি করে দেওয়ার। তাঁরও আপনজন কেউ নেই, যাঁরা ওষুধ-পথ্য কিনে দেবেন। বিষয়টি একাধিকবার জনপ্রতিনিধিদের জানানো হলেও এখনো স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। তাঁর জন্য দ্রুত একটি নিরাপদ ঘর প্রয়োজন। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও তাঁর উপকারে এগিয়ে আসা উচিত।’
আজ মঙ্গলবার সবুরা খাতুনের সঙ্গে কথা হয়। কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, আপন বলতে তাঁর কেউ নেই। শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন আর ভিক্ষা করতে পারেন না। আগে কিছু টাকা বিধবা ভাতা পেতেন। গত কোরবানির ঈদের পর থেকে সেই টাকাও পাচ্ছেন না।
সবুরা খাতুনের কণ্ঠে অসহায়ত্ব, ‘এখন আর ভিক্ষা করতে পারি না। আপনজনও কেউ নেই। ঘরটাও ভেঙে যাচ্ছে। কীভাবে বেঁচে থাকব, জানি না।’
সবুরার এই ছোট্ট ঝুপড়িটি যেন তাঁর দীর্ঘ ২০ বছরের অসহায় জীবনের প্রতিচ্ছবি। মাথার ওপর শক্ত একটি ছাদ নেই, পাশে দাঁড়ানোর মতো স্বজন নেই, এমনকি নিয়মিত পাওয়ার কথা যে সামান্য বিধবা ভাতা, সেটিও এখন বন্ধ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর চাওয়া খুব বেশি নয়—একটি নিরাপদ ঘর আর দুবেলা বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
বড়বাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদ সরদার বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক। সবুরা খাতুনের ব্যাপারটি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হবে।’
চিতলমারী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শেখ বজলুর রশীদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিধবা ভাতাসহ সরকারি সব ধরনের ভাতা প্রদান বন্ধ রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার বলেন, ‘বিষয়টি আগে আমার জানা ছিল না। খবর পেয়ে আমি সবুরা খাতুনকে শুকনো খাবার—চাল, ডাল, আলু, লবণ ও তেল—দিয়েছি। তাঁর নিজস্ব কোনো জায়গা না থাকায় ঘরের বিষয়টি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।’
সবুরার মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ হবে কি না, সেটিই এখন প্রশ্ন। স্বজনহীন এই বৃদ্ধার জন্য একটি ঘর হয়তো কারও কাছে খুব বড় কিছু নয়; কিন্তু সেটিই তাঁর কাছে হতে পারে জীবনের শেষ আশ্রয়। সরকারি সহায়তা কিংবা সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের একটু সহযোগিতায় বদলে যেতে পারে পলিথিনের ঝুপড়িতে কাটানো তাঁর বাকি দিনগুলো।











































