Home আন্তর্জাতিক শিক্ষকসংকট-শ্রেণিকক্ষে ঠাসাঠাসি, প্রতিবাদে ফ্রান্সের রাজপথে হাজারো শিক্ষার্থী

শিক্ষকসংকট-শ্রেণিকক্ষে ঠাসাঠাসি, প্রতিবাদে ফ্রান্সের রাজপথে হাজারো শিক্ষার্থী

0

অনলাইন ডেস্ক।।

জীর্ণ স্কুল ভবন, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংকটের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করছেন উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা। প্যারিসের দরিদ্র শহরতলিতে শুরু হওয়া এ আন্দোলন রাজধানীসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। এক সপ্তাহের বিক্ষোভে ১ হাজার ২০০টির বেশি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় যুক্ত হয়েছে। পুলিশ ৫ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে।

প্যারিসের উত্তরের শহরতলি অবারভিলিয়ের লিসে ল্য কোরবুজিয়ে স্কুলের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মাইসা এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। ইংরেজির শিক্ষক হতে চাওয়া মাইসা বলেন, গত বছর ফরাসি ভাষার শিক্ষক ছাড়াই উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষা দিতে হয়েছিল।

মাইসার ভাষ্য, ‘এগুলো পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ নয়।’

শুধু মাইসা নয়, অবারভিলিয়ের ওই স্কুলের আরও শিক্ষার্থী ও তাদের সমর্থকেরা বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, দরিদ্র এলাকার স্কুলগুলোতেই শিক্ষার পরিবেশ সবচেয়ে খারাপ।

১৫ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী অ্যামেলিয়া হাতে একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেয়। তাতে লেখা ছিল, ‘আমাদের ঠিকানা যেন আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে।’ অ্যামেলিয়া জানায়, দেশের অন্য এলাকার শিক্ষার্থীদের মতো একই অধিকার পাওয়ার দাবিতে তারা রাস্তায় নেমেছে।

চলতি সপ্তাহে ফ্রান্সের ১ হাজার ২০০টির বেশি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে। এতে কয়েকজন বিক্ষোভকারী চোখে আঘাত, দাঁত ভেঙে যাওয়া ও মাথায় আঘাতসহ গুরুতর আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ পরিস্থিতিকে ‘অগ্রহণযোগ্য সহিংসতার পরিবেশ’ হিসেবে উল্লেখ করে শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

শিক্ষকসংকট ও শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী
সেইন-সাঁ-দনি বিভাগের শিক্ষা ইউনিয়ন সিজিটির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিভাগের দুই-তৃতীয়াংশ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নেয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা স্কুলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শিক্ষক, নার্স ও সমাজকর্মীর দীর্ঘস্থায়ী সংকটের অভিযোগ করেছেন।

লিসে ল্য কোরবুজিয়ে স্কুলের অভিভাবক প্রতিনিধি কারিমা কারা আলি বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই গণিত, মানবিক বিভাগ, ইংরেজি ও শরীরচর্চার ক্লাস বাতিল হয়েছে।

সেইন-সাঁ-দনি বিভাগের শিক্ষা ইউনিয়নের প্রতিনিধি লুইজ পাতেরনস্তর বলেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময় হারাচ্ছে। কিছু স্কুলে পান করার পানিও নেই। অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের তুলনায় তারা সমান সুযোগ পাচ্ছে না।

একটি ইউনিয়ন জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ওই বিভাগের দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলে শিক্ষক পদ খালি রয়েছে।

প্যারিসের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের পাঁতাঁ শহরের শিক্ষক দিলান রোশও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ, নার্স ও সমাজকর্মীর সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

শিক্ষা বাজেট নিয়েও ক্ষোভ
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়েই ফ্রান্স সরকার ২০২৭ সালের বাজেট প্রস্তাব করেছে। সেখানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হারে ১ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ইউরো করার কথা বলা হয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে শিক্ষকদের পেনশন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়।

শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে বলেছেন, শিক্ষা সরকারের অগ্রাধিকারেই রয়েছে। জনসংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

ফ্রান্সে শিক্ষা খাতে ব্যয় অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) দেশগুলোর মধ্যে মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। তবে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে গড় ব্যয় গত এক দশকে প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০২৪ সালে এ ব্যয় ছিল ১১ হাজার ৬৬০ ইউরো, যেখানে ২০১০ সালে ছিল ১১ হাজার ৯১০ ইউরো।

নব্বইয়ের দশকের পর বড় আন্দোলন
শিক্ষায় আরও অর্থ বরাদ্দের দাবিতে এর আগে এত বড় জাতীয় পর্যায়ের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে। তখন সরকার উচ্চমাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষা ‘ব্যাকালোরিয়া’ দেওয়ার সুযোগ ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছিল। কিন্তু সে অনুযায়ী স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত অতিরিক্ত সম্পদ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন পল ভালেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লেমঁস কারদোঁ-কাঁ।

সূত্র: রয়টার্স