খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
কুষ্টিয়ায় সাঁতারু তৈরির প্রধানতম অবকাঠামো জেলা সুইমিংপুলটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অচল অবস্থায় পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাব, রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা এবং পানি ফিল্টারিং ব্যবস্থা নষ্ট থাকায় পুলটি এখন পুরোপুরি ব্যবহার অনুপযোগী। ফলে আসন্ন জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতাকে সামনে রেখে চরম বিপাকে পড়েছেন জেলার উদীয়মান সাঁতারুরা। আধুনিক এই সুইমিংপুলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে বাধ্য হয়েই তারা এখন অপরিষ্কার ও অনিরাপদ ডোবা, পুকুর কিংবা বিভিন্ন জলাশয়ে নিজেদের অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা যায়, ২০১৭ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বিপুল অর্থায়নে কুষ্টিয়া শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের এই সুইমিংপুলটি নির্মাণ করা হয়। সে সময় এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৮ কোটি ৭৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। নির্মাণের পরপর কিছুদিন এর কার্যক্রম সচল থাকলেও পরবর্তীতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দেয়। ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে পুলটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের অযত্ন আর সংস্কারের অভাবে সুইমিংপুলটির অবস্থা রীতিমতো বেহাল। পুলের চারপাশের বেশ কিছু গ্লাস ভেঙে পড়ে আছে। পানি পরিশোধন করার প্রধান মাধ্যম ফিল্টার প্ল্যান্টটি দীর্ঘদিন ধরেই অচল। নিয়মিত পানি পরিবর্তন ও পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পুলের আবদ্ধ পানি নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
আধুনিক এই অবকাঠামোটি ব্যবহার করতে না পারায় সাঁতারুদের প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সাঁতার সংশ্লিষ্টরা হতাশা প্রকাশ করে জানান, জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার আগে সাঁতারুদের নিয়মিত এবং মানসম্মত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক সুইমিংপুলে অনুশীলনের ন্যূনতম সুযোগ না থাকায় কুষ্টিয়ার সম্ভাবনাময় সাঁতারুরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যা প্রতিযোগিতায় তাদের ভালো ফলাফল করার সম্ভাবনাকে অনেকাংশেই কমিয়ে দিচ্ছে। একাধিক উদীয়মান সাঁতারু আক্ষেপ করে বলেন, সামনেই তাদের জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা, অথচ সুইমিংপুল বন্ধ থাকায় তারা নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিতে পারছেন না। প্রতিযোগিতার আগে অন্তত এক-দুই মাস পুলে অনুশীলনের সুযোগ পেলে নিজেদের প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হতো বলে জানান তারা। তাই দ্রুত সুইমিংপুলটি সংস্কার করে চালু করার জোর দাবি জানিয়েছেন এই ক্রীড়াবিদরা।
এদিকে, পুলের বিকল্প হিসেবে বাধ্য হয়ে স্থানীয় পুকুর ও ডোবায় অনুশীলন করতে গিয়ে নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন সাঁতারুরা। অপরিষ্কার পানিতে নিয়মিত সাঁতার কাটায় চুলকানি ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন অনেকেই। এর পাশাপাশি উন্মুক্ত এসব জলাশয়ে প্রশিক্ষণের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের নির্বাহী সদস্য এবং আমলা সুইমিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, কুষ্টিয়ার সাঁতারের ঐতিহ্য বেশ পুরোনো ও সমৃদ্ধ। এই জেলা থেকে অতীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক কৃতী সাঁতারু উঠে এসেছেন, যারা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। কিন্তু সুইমিংপুলটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় নতুন প্রজন্মের সাঁতারুরা নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত পুলটি সংস্কার করে চালু করা না হলে কুষ্টিয়ার সাঁতার অঙ্গন বড় ধরনের সংকটে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে কুষ্টিয়া জেলা ক্রীড়া অফিসার মো. তানভীর হোসেন আশ্বস্ত করে বলেন, সুইমিংপুলের বর্তমান সমস্যাগুলো সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছে। অতি দ্রুত এসব সমস্যা সমাধান করে পুলটি আবারও ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সরকারি অর্থে নির্মিত প্রায় ৯ কোটি টাকার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া অবকাঠামো দিনের পর দিন অচল পড়ে থাকাটা স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত হতাশাজনক। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ করে পানি ও ফিল্টারিং ব্যবস্থা সচল করার মাধ্যমে সুইমিংপুলটি সাঁতারুদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সাঁতারুরা যেমন নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন, তেমনি কুষ্টিয়ার সাঁতারের পুরোনো ঐতিহ্যও নতুন করে ফিরে আসার পথ তৈরি হবে।









































