কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ||
সারা জীবন সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন, অনিয়ম ও সফলতার কথা লিখে গেছেন কলকাতায় হোটেলের আগুনে নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কুষ্টিয়ার অসহায় মানুষের গল্প। কিন্তু, দেবাশীষ দত্তের মৃত্যুর পর তার অসুস্থ মা-বাবা ও শিশুকন্যা কোথায় থাকবে সেই প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত তার স্ত্রী, দুই সন্তান ও মা-বাবাকে নিয়ে কুষ্টিয়ার শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। পরিবারের কোনো জমিজমা নেই বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। দেবাশীষ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
দেবাশীষের চাচী অর্চনা দত্ত জানান, এই পরিবারের কিছু নেই। এমনকি মাথা গোঁজার ঠাঁইও। সরকারকে অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে অনুরোধ করছি।
নিহত দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, দেবাশীষই ছিল আমার একমাত্র মূলধন। সংসার সেই চালাত। প্রতি মাসে আমার ও দেবাশীষের মায়ের ১০ হাজার টাকার ওষুধের প্রয়োজন হয়। আমরা দুজনই হার্টের রোগে ভুগছি। বাসা ভাড়া দিতে হয় ৭ হাজার টাকা। কীভাবে কি করব, মাথায় কিছু আসছে না।
তিনি আরো বলেন, দেবাশীষের ছয় বছরের শিশুকন্যাকে নিয়ে আমরা যাতে বেঁচে থাকতে পারি সরকার যেন সেই ব্যবস্থা করে দেয়।
ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাগল প্রায় দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, আমি কি করে সহ্য করব? আমরা একটা কলিজা ছিল; সে চলে গেল। আমার সাথে আর দেখা হলো না। আমার আর কেউ নাই। দেবাশীষ তোর মা-বাবাকে কে দেখবে?
দেবাশীষ দত্তের ক্যামেরাম্যান রুবেল বলেন, দাদা যে অবস্থায় চলে গেলেন। এখন তার পরিবার কীভাবে চলবে? তার সহকর্মী হিসেবে অনুরোধ, আপনারা যে যতটুক পারেন অসহায় এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ান।
দেবাশীষের সহকর্মী ও ষ্টার নিউজের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জহুরুল ইসলাম বলেন, দেবাশীষের জমিজমা কিংবা কোনো বাড়ি নেই। তার উপার্জনের টাকায় সংসার চলতো। সরকার, সাংবাদিক নেতা ও সাংবাদিক সংগঠনের কাছে আমার দাবি, পরিবারটি যেন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে সেই ব্যবস্থা যেন করা হয়।
কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু বলেন, প্রয়াত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের পরিবারের পাশে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। তাদের একটি ঠিকানা তৈরি করার জন্য আমরা সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং প্রশাসনের মাধ্যমে চেষ্টা করছি।
সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের শিশুকন্যা মহিমা কুষ্টিয়ার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কেজি শ্রেণির ছাত্রী। বাবা-মা ও ভাইকে হারিয়ে তার ভবিষ্যৎ যখন অনিশ্চয়তার মুখে, তখনই তার পাশে দাঁড়িয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।
এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক রাসেল বলেন, মহিমা দত্তের এইচএসসি পর্যন্ত স্কুলের বেতন, পরীক্ষার ফি, বই-খাতা, কলমসহ যাবতীয় খরচ এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ বহন করবে। শুরু থেকেই যেন বাবা-মায়ের অভাবে সে শিক্ষা থেকে পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি।
গত ৩ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে যান দেবাশীষ দত্ত। প্রথমে তারা বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা নেন। প্রায় ১৩ দিন পর সোমবার রাতে কলকাতায় ফেরেন। মঙ্গলবার আত্মীয়স্বজনের জন্য কেনাকাটা শেষে বুধবার তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টার দিকে কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব ষ্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া নয় বাংলাদেশির মধ্যে ছিলেন দেবাশীষ, তার স্ত্রী, শ্বশুর ও তিন বছর বয়সী ছেলে।











































