Home আঞ্চলিক মাকে ১০০ টাকা দিয়ে সকালে ঘর ছেড়েছিল রাজু; কে জানত সেটাই শেষ...

মাকে ১০০ টাকা দিয়ে সকালে ঘর ছেড়েছিল রাজু; কে জানত সেটাই শেষ বিদায়!

55


স্টাফ রিপোর্টার।।


সকালের নাশতাটা পর্যন্ত মুখে তোলার সুযোগ হয়নি রাজুর। বন্ধুদের একটি মুঠোফোন কলে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় গর্ভধারিণী মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ১০০ টাকা। হয়তো ভেবেছিলেন কাজ সেরে দ্রুতই ফিরে এসে মায়ের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাবেন। কিন্তু সেই যাওয়া যে রাজু বিশ্বাস (২৬)-এর চিরদিনের শেষ বিদায় হবে, তা কে জানত!


খুলনার খানজাহান আলী থানার পথের বাজার পাড়িয়ারডাঙ্গা এলাকার নজরুল বিশ্বাসের কনিষ্ঠ পুত্র রাজু বিশ্বাস। এলাকাবাসীর কাছে তিনি একজন শান্ত ও পরিচিত মুখ। কোনোদিন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যার নাম ওঠেনি, সেই রাজুকেই গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল বাজার এলাকায় পরিকল্পিতভাবে এবং পরবর্তীতে ‘ছেলেধরা’ গুজবের আড়ালে পিটিয়ে ও নৃশংস নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।


ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই দিন বেলা ১১টার দিকে বন্ধুদের ফোন পেয়ে রায়েরমহল এলাকায় যান রাজু। স্থানীয় তথ্যমতে, মিম নামের তিন বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে ইজিবাইক গ্যারেজ থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় শিশুর দাদি ফাতেমার চিৎকারে রাজুকে ধরে ফেলে স্থানীয়রা। গুঞ্জন রয়েছে, শিশুকাল থেকে দাদির কাছে বেড়ে ওঠা মিমকে তার জন্মদাত্রী মা পাওয়ার জন্য লোক মারফত চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। হয়তো বন্ধুদের কথায় ভুল বুঝে রাজু শিশুটিকে আনতে গিয়ে চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে যান।


তবে ঘটনার আসল নির্মমতা শুরু হয় এর পর থেকে। রাজুকে ধরে ‘ছেলেধরা’ আখ্যা দিয়ে প্রথমে হালকা পিটুনি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে ফাতেমার ভাড়া করা গ্যারেজে নিয়ে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি, বিশেষ করে গৃহবধূ ফাতেমার ছেলে জিল্লুসহ কয়েকজন তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়।


সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। খবর পেয়ে আড়ংঘাটা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মুমূর্ষু রাজুকে উদ্ধার করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের তোলা ভিডিও ফুটেজে উদ্ধারের সময় রাজুকে অনেকটাই সুস্থ ও হেঁটে যেতে দেখা যায়। কিন্তু মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয়দের প্রশ্ন-এমন আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা একজনকে কেন সাথে সাথে হাসপাতালে না নিয়ে প্রথমে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো?


থানার অভ্যন্তরীণ সূত্র ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, থানায় নিয়ে যাওয়ার পর আড়ংঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হালিমুর রহমান ও এসআই মিলন রাজুর ওপর বেধড়ক মারধর চালান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এসআই মিলন রাজুর গলা পাড়িয়ে ধরেন এবং ওসি হালিমুর রহমান তার বুকের ওপর উঠে নির্যাতন চালান। একজন মুমূর্ষু মানুষকে চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে থানায় আটকে রেখে থানা হেফাজতে এভাবে নির্যাতন করা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। পরবর্তীতে রাজুর অবস্থা চরম সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে সন্ধ্যায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত্যু ঘোষনা করেন।


রাজুর অকাল মৃত্যুতে শোকের মাতম ছড়িয়ে পড়েছে তার পরিবার ও এলাকায়। নিহত রাজুর গর্ভধারিণী মা ও ভাইদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। প্রতিবেশীরা বলছেন, “রাজু অপরাধী হলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হতো, কিন্তু আইন হাতে তুলে নিয়ে এভাবে পিটিয়ে ও থানা হেফাজতে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হলো কেন?”


এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবার আড়ংঘাটা থানার ওসি মো. হালিমুর রহমান ও এসআই মিলনসহ ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।