Home Lead সরকারের ছয় মাস, মানুষের প্রত্যাশার পাহাড়

সরকারের ছয় মাস, মানুষের প্রত্যাশার পাহাড়

13


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
বিপুল জনসমর্থন নিয়ে গঠন করা বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল। মানুষের আকাশসম প্রত্যাশা আর আকাঙ্ক্ষা সামনে রেখে ভালো সূচনা করেছিল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। কিন্তু এই ছয় মাসে মানুষের প্রত্যাশা কতোটা পূরণ হয়েছে? সরকারই বা তার প্রতিশ্রুতি কতোটা পূরণ করতে পেরেছে? সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে অম্লমধুর। সরকার গঠনের পর নানা ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী সূচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাত-দিন একাকার করে তিনি দৌড়াচ্ছেন। সাদামাটা জীবনযাপন আর চলাফেরায় তিনি মানুষের মন জয় করে চলেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর চিরাচরিত চরিত্রের ধারণা তিনি অনেকটা বদলে দিয়েছেন মানুষের কাছাকাছি থেকে। প্রধানমন্ত্রীর এই গতির সঙ্গে পেরে উঠছেন না তার রানিংমেটরা। মন্ত্রী উপদেষ্টাদের কেউ কেউ আছেন না নেই সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-দপ্তরে ঠিক আগের মতোই স্থবিরতা। খুব একটা বদলায়নি। শুধু রুটিন ওয়ার্ক হচ্ছে। কোনো কোনো মন্ত্রী-উপদেষ্টা দৌড়ঝাঁপ করছেন। মন্ত্রণালয়-বিভাগে গতি আনার চেষ্টা করছেন। পরিবর্তনও এসেছে। ছয় মাসের মাথায় অনেকে বলছেন, সরকারের বড় করে সাফল্য বা ব্যর্থতা খোঁজার সুযোগ খুব বেশি নেই। তবে এই ছয় মাসের কার্যক্রমে বোঝা যাচ্ছে সরকার সামনে কি করতে পারবে। এই সময়ে সরকারের নানা জনবান্ধব কর্মসূচি যেমন মানুষকে আশান্বিত করেছে তেমনি সিরিজ ক্রাইসিসে মানুষ আশাহত। দ্রুতই এসব সংকট কাটাতে না পারলে সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এমনটা আশঙ্কা করা হচ্ছে।


গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশ ছিল নানা সংকটে জর্জরিত। ছিল রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনীতিতে চাপ, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক অস্থিরতা।


ওদিকে পররাষ্ট্র বিষয়েও নতুন সরকারের সামনে কঠিন বাস্তবতা। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, সীমান্ত, বাণিজ্য, পানিবণ্টন এবং ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে কূটনৈতিক জটিলতা কাটাতে সরকার বহুমুখী পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর এখন আলোচনায় ভারত সফর। এই সফর ঘিরে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। আছে টানাপড়েনও।


এমন অবস্থায় রাজনীতিও খুব একটা স্বস্তিকর অবস্থায় নেই। ছয় মাস বয়সী একটি সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে সক্রিয় বিরোধী দল। এমনকি সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও তারা পালন করেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সরকারের বিষয়ে সরকারকে চাপে রাখতে একের পর এক কর্মসূচি দিয়ে আসছে জামায়াত-এনসিপি’র নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল। সামনে রাজনৈতিক এই চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ছয় মাসে জাতীয় সংসদের দু’টি অধিবেশন সমাপ্ত হয়েছে। এই দুই অধিবেশনে সংসদ কার্যক্রমেও অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগের মতো সরকারি ও বিরোধী দলের খিস্তিখেউর কমেছে।


জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে ‘জুলাইযোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন’ পাস হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধানকে সম্পৃক্ত করে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ও পাস হয়েছে।


সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছয় মাসে সরকার জনগণের আস্থা অর্জন, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা করেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল আসেনি। ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর মানুষের যে আকাশ সমান প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল সরকার তা পূরণে কাজ করে যাচ্ছে।


দায়িত্ব গ্রহণের ২১ দিনের মাথায় সরকার ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের কার্যক্রম শুরু করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সূচনা করেছিল। কৃষকদের ঋণ মওকুফ, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বরতদের ভাতা কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
আলোচিত শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করে দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিতের নজির তৈরি করেছে। নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির পর মাত্র এক মাসে ১০টি রায় ঘোষণা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী মোজাফফর হোসেনকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক ছিলেন। শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিকে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে গ্রেপ্তার এবং দেশে প্রত্যর্পণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে সরকার।


সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং সেইলক্ষ্যে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় দেশ জুড়ে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের বিশাল সামাজিক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। ঢাকাকে দূষণমুক্ত করতে প্রাথমিকভাবে ২৫০টি সর্বাধুনিক পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঢাকা শহরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও করতে বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় কার্গো রিলিজ ব্যবস্থা চালু এবং ঢাকার যানজট নিরসণের চারটি আন্তঃজেলা বাসটার্মিনাল মহানগরের বাইরে স্থানান্তর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলে সরকারের কার্যক্রম আরও দৃশ্যমান হবে এবং মানুষ সুফল পাবে।


ক্রীড়া ক্ষেত্রেও বেশকিছু জনবান্ধব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার, এর মধ্যে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে প্রাথমিক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্টার্ট-আপ ও আইডিয়া কম্পিটিশন শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করেছে।
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন করে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বর্তমান এনার্জি ক্রাইসিস বাদ দিলে সরকারকে আমি পঞ্চাশ দিতাম। পঞ্চাশ ভালো, আর পঞ্চাশ খারাপ। এখন এনার্জি ক্রাইসিস, আমি জানি না- এই মাসের মধ্যে যদি শেষ হয়ে যায়, এক সপ্তাহের মধ্যে হয়ে যাওয়া উচিত। তাহলে পঞ্চাশেই থাকবে। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব নীরবে এবং নিঃশব্দে শক্তিশালীভাবে চলছে এটি সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক। এসব বন্ধ করতে পারেনি। আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি কমাতে পারেনি।


সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ছয় মাসে বিএনপি সরকারের অধিকাংশ নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে। ছয় মাসের যে লক্ষ্য, সে লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সবগুলোই পূরণ হয়েছে। কোথাও হয়তো ১০০ শতাংশ না হলেও সেখানে ৯৫ শতাংশ, ৯০ শতাংশ আছে। কোথাও ১০০ শতাংশ হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে সময় লেগেছে। পরবর্তী ছয় মাসে সরকারের কর্মসূচি আরও জোরালো ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন হবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।