Home জাতীয় ১২ মাসে ৭ কোটি মানুষকে ডেটা নেটওয়ার্কে আনার লক্ষ্য : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

১২ মাসে ৭ কোটি মানুষকে ডেটা নেটওয়ার্কে আনার লক্ষ্য : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

0

ঢাকা অফিস।।

আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে দেশের প্রায় ৭ কোটি মানুষকে ডেটা নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।

শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘স্পেকট্রাম ফর আ কানেক্টেড বাংলাদেশ : এনাবলিং ইন্টারনেট ফর অল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা জানান তিনি।

টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) এই বৈঠকের আয়োজন করে।

উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশে প্রায় ১৪ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই এখনো টুজি ফোন ব্যবহার করছে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে স্মার্টফোনে নিয়ে আসা অসম্ভব। তবে সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাদের ডেটা নেটওয়ার্কে যুক্ত করা সম্ভব।

এ জন্য কম দামের স্মার্টফোন তৈরির বিষয়ে দেশীয় নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। শুরুতে ৩ হাজার টাকার মধ্যে ফোন তৈরির কথা ভাবা হলেও নির্মাতারা জানিয়েছেন, ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে ফোন তৈরি করা সম্ভব।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজার পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে আসিফ আসাদ বলেন, ভারতের রিলায়েন্স প্রায় ৩৯ ডলারে একটি ফোন বিক্রি করছে। ওই ফোনে পুরোটা টাচস্ক্রিন না দিয়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ টাচস্ক্রিন ও এক-তৃতীয়াংশ কিপ্যাড ব্যবহার করা হয়েছে।

এতে ফোনের খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে। একই ধরনের মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশের নির্মাতারাও ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। কম দামের ফোন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কিস্তি বা ইএমআই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

এ উদ্যোগে মোবাইল অপারেটরদের যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নির্মাতাদের সঙ্গে কো-ব্র্যান্ডিং এবং ফোনের সঙ্গে ভয়েস ও ডেটা প্যাকেজ বান্ডেল করার প্রস্তাব দেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আমি চাই, ফোনটি সাশ্রয়ী হোক এবং এই মানুষগুলোকে ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে নিয়ে আসা হোক।

কম দামের স্মার্টফোন তৈরির প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর শূন্য কর দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানান তিনি।

টিআরএনবির সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সঞ্চালনায় বৈঠকে টেলিযোগাযোগ খাতের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা বলেন, স্পেকট্রামকে শুধু সরকারি রাজস্ব আহরণের উৎস হিসেবে দেখার পরিবর্তে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাশ্রয়ী মূল্যে অধিক স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি নতুন গতি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

বৈঠকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী বলেন, স্পেকট্রামের দাম কমিয়ে একসময় যদি বিনা মূল্যেও দেওয়া হয়, তখন মোবাইল অপারেটররা হয়তো স্পেকট্রাম ব্যবহারের জন্য সরকারকে প্রণোদনা দেওয়ার দাবি তুলবেন। তাই টেলিযোগাযোগ খাতকে শুধু গ্রাহক বা অপারেটরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। মানুষ, ব্যবসা ও সরকার- এই তিন পক্ষকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাই দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় দাম কমানোর প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে স্পেকট্রামের দাম বেশি এবং অপারেটরদের গড় আয় বা এআরপিইউ কম, এ দুটি বিষয় প্রায়ই তুলে ধরা হয়। তবে ১৮ কোটি মানুষের দেশে শুধু এআরপিইউ দিয়ে টেলিযোগাযোগ ব্যবসার বাস্তব চিত্র বোঝা কঠিন। এর পরিবর্তে মোট বা গ্রস রাজস্ব বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

তিনি আরো বলেন, মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সেবার মান ও দাম নিয়ে অভিযোগ করে আসছে। কলড্রপ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে গত দুই বছরে দেশে কলড্রপের হার এক শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্বমান অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ গ্রাহকের জন্য ২ থেকে ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ প্রয়োজন হলেও দেশে এ হার মাত্র ২ দশমিক ২৯ মেগাহার্টজ। ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দেশে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ৪৬০ থেকে ৪৬২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহৃত হচ্ছে। আগামী বছর আরো ৪০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া আগামী নভেম্বরের বড় পরিসরের স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশীদারিমূলক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উত্থাপন করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এমডি মুনির হাসান। তিনি বলেন, স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণে আরো স্বচ্ছ, বিশ্লেষণভিত্তিক ও জনসম্মুখে প্রকাশযোগ্য কাঠামো প্রয়োজন। শুধু একটি পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে নেটওয়ার্ক অর্থনীতি, ব্যবসায়িক মূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজার, এই তিনটি বিষয় সমন্বয় করে মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। ২০২৬ সালের ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের নিলামে মাত্র একজন দরদাতা অংশ নিলে শেষ পর্যন্ত রিজার্ভ প্রাইসেই স্পেকট্রাম বিক্রি হয়। প্রতিযোগিতা না থাকলে প্রকৃত বাজারমূল্য জানা কঠিন।

স্পেকট্রামের মূল্যায়নে ওডিবি, ডিসিএফ ও বেঞ্চমার্কিং- এই তিন পদ্ধতির সমন্বয়ের প্রস্তাব দেন মুনির হাসান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের পাশাপাশি দেশের নেটওয়ার্ক অর্থনীতি, অপারেটরদের আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারের নীতিগত লক্ষ্য বিবেচনায় নিতে হবে। অতিরিক্ত দামে স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা হলে অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে বিনিয়োগের পরিবর্তে বড় অঙ্কের অর্থ স্পেকট্রাম ফি পরিশোধে ব্যয় হতে পারে। এতে সেবার মান ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ২০০৮ সালে স্পেকট্রাম বরাদ্দের সময় থেকে মূলত রাজস্ব আহরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই সীমিত স্পেকট্রাম, অপর্যাপ্ত ফাইবার অবকাঠামো, টাওয়ার সাইটে সীমিত প্রবেশাধিকার ও উচ্চ স্পেকট্রাম মূল্যের মতো কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে টেলিযোগাযোগ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি। সাশ্রয়ী মূল্যে বেশি স্পেকট্রাম এবং দ্রুত বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলে নেটওয়ার্কের মান উন্নত হবে, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে এবং নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।

এমটব প্রেসিডেন্ট ও রবি আজিয়াটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও জিয়াদ সাতারা বলেন, স্পেকট্রামের প্রকৃত মূল্য শুধু সরকারের রাজস্ব আয়ের ভিত্তিতে পরিমাপ করা উচিত নয়। উন্নত সংযোগ, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির ভিত্তিতেও এর মূল্যায়ন করতে হবে। স্পেকট্রামের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করা হলে অপারেটরদের বড় অঙ্কের মূলধন নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের পরিবর্তে স্পেকট্রাম ফি পরিশোধে ব্যয় করতে হবে। এতে সেবার মান ও গ্রাহকদের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলালিংকের সিইও ইয়োহান বুসে বলেন, গত ১০ বছরে দেশের টেলিকম খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়েনি, অথচ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাশ্রয়ী স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা হলে সেবার মান বাড়বে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান বলেন, স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়টি বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। গত পাঁচ বছরে জাতীয় রাজস্ব কোষাগারে টেলিকম খাতের অবদান বাড়লেও বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন কমেছে। তাই স্পেকট্রাম নবায়নের অর্থনৈতিক কাঠামো অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বিনিয়োগ এবং গ্রাহকদের মানসম্পন্ন সেবা দেওয়ার সক্ষমতা রাখছে কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি।

আলোচনায় আরো অংশ নেন এমটব মহাসচিব লে. কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার, বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার তাইমুর রহমান, গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ, রবি আজিয়াটার চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম, এফআইসিসিআই এক্সিজিউটিভ ডিরেক্টির টিআইএম নূরুল কবীর ও টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইন।