ডুমুরিয়া প্রতিনিধি।।
বেকার নবদ্বীপ মল্লিকের কাঁধে তখন সংসার চালানোর ভার। কী করে এই ভার বইবেন, সেই চিন্তায় দিন কাটছে। এর মধ্যে এক সুযোগে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় চুই ঝালের চাষ ও চারা তৈরির ওপর প্রশিক্ষণ নেন তিনি। এর পর নিজ বাড়ির আঙিনায় ১৫ শতাংশ জমির ওপর মসলাজাতীয় এই ফসল চাষ ও চারা তৈরির কাজে লেগে পড়েন। ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু। এখন তিনি সফল চুই চাষি। জমি, পাকা ঘর, টিভি, ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, গরুর খামার সব করেছেন।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার নবদ্বীপ মল্লিকের মতো অনেকে চুইঝাল চাষ করে ভাগ্য ফিরিয়েছেন।
ডুমুরিয়ার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রকাশ চন্দ্র রায় বলেন, চুই উচ্চ মূল্যের লাভজনক ফসল। দোআঁশ মাটিতে ও বিভিন্ন গাছে এর উৎপাদন ভালো হয়। উপজেলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এর আবাদ হচ্ছে।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম জানান, ডুমুরিয়ায় এখন দেড় শতাধিক চুই চাষি রয়েছেন। নিয়মিত চাষিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। চুই চাষে খরচ কম আর লাভ বেশি বলে দিন দিন চুই চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় চুই মূলত মসলা হিসেবে বহুল পরিচিত। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট এলাকায় চুই দিয়ে রান্না মাংস জনপ্রিয় খাবার। অনেকেই আবার সাধারণ তরকারিতে এটি ব্যবহার করেন। যুগ যুগ ধরে রসনায় স্বাদ বাড়ানোর জন্য চুইঝাল ব্যবহারের প্রচলন আছে। চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে খুলনার বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় চুই ঝালের নার্সারি।
ডুমুরিয়ার আটলিয়া ইউনিয়নের বরাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা নবদ্বীপ জানান, ২০১৬ সালে কৃষি অফিস থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ২০০ চুই ঝালের চারা সংগ্রহ করেন। বর্তমানে তাঁর নার্সারিতে প্রতি মাসে গড় খরচ ৪০ হাজার টাকা। লাভ করছেন ৮০ হাজার টাকা।
কৃষি অফিস সূত্র জানায়, খুলনার ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, রূপসা, দাকোপ, পাইকগাছা, কয়রা, তেরখাদা, দিঘলিয়া, মেট্রো দেলৈদপুর ও মেট্রো লবণচরা এলাকায় চুই চাষ হচ্ছে। জেলার ৭৮ দশমিক ৭১ হেক্টর জমিতে ১৪ হাজার ৮৬২ জন চাষি চুই আবাদে যুক্ত। খুলনায় বছরে ৩০৮ টন চুই উৎপাদন হচ্ছে। ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে গড়ে বছরে প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা চুই বিক্রি করছেন কৃষকরা। ডুমুরিয়ায় ২৭ হেক্টর জমিতে চুই আবাদ করছেন ১৬৬ কৃষক। উৎপাদন হচ্ছে গড়ে ১০৮ টন। এ থেকে কৃষকরা বছরে আয় করছেন ছয় কোটি চার লাখের বেশি টাকা।
চুইয়ের উপকারিতা
কৃষিবিদরা বলছেন, চুইঝালের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম piper chaba। এটি পিপারেসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। পান ও চুইঝাল একই পরিবারের সহোদর। চুইঝাল সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে– ঝাড় চুই এবং গেছো চুই। লতাজাতীয় এই গাছের কাণ্ড ধূসর এবং পাতা পান পাতার মতো সবুজ রঙের। এর কাণ্ড মসলা হিসেবে ব্যবহার হয়।
চুই ঝালের গাছ দেখতে অনেকটা পানের লতার মতো। এর পাতায় ঝাল নেই। শিকড়, কাণ্ড বা লতা কেটে টুকরো টুকরো করে রান্নায় ব্যবহার করা হয়। দেড় থেকে দুই ইঞ্চি টুকরা করে কেটে সেটা মাঝখান দিয়ে ফালি করে খাবার রান্নার একটি নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবহার করতে হয়। রান্নার পর কিছুটা গলে যাওয়া চুইয়ের টুকরা চুষে অথবা চিবিয়ে খাওয়া হয়।
চুই ক্ষুধামন্দা দূর করে এবং খাবার দ্রুত হজমে সহায়তা করে। এটি গ্যাস্ট্রিক, কোষ্ঠকাঠিন্য ও অন্ত্রের প্রদাহ নিরাময়ে দারুণ উপকারী। শারীরিক দুর্বলতা কাটানো এবং বাত বা শরীরের যে কোনো গিটের ব্যথা দূর করতে সাহায্য করে। সর্দি-কাশি, কফ, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে চুই ঝাল ও আদা একসঙ্গে মিশে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং বিভিন্ন ধরনের ফাইটোকেমিক্যাল রয়েছে
চুইয়ের আবাদ যেভাবে
চুই চাষের জন্য খুব বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। যে কোনো পরিত্যক্ত জায়গায়, বাড়ির অঙিনায় বা বাগান ঝোপঝাড়ের ভেতর চারা রোপণ করলেই গাছ হয়। এর রোগবালাই নেই বললেই চলে। দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে।
ডুমুরিয়ার কৃষকরা জানান, চুইয়ের কাটিং যে কোনো হালকা উঁচু জায়গায় বা গাছের গোড়ায় রোপণ করা যায়। উঁচু জায়গায় চুই গাছ ভালো হয়। নিচু জায়গায় রোপণ করলে গোড়ায় পানি জমে। এতে গাছ পচে যায়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ও আশ্বিন-কার্তিক মাস চুইঝালের লতা লাগানোর উপযুক্ত সময়।
চুই গাছে ফুল-ফল দুটোই হয়। চুইয়ের পুরুষ-স্ত্রী ফুল আলাদা লতায় জন্ম নেয়। প্রাকৃতিকভাবেই সম্পন্ন হয় পরাগায়ন। চুইয়ের বীজ থেকে চারাও হয়। একটি গাছের পুরো অংশ এক থেকে দেড় মণ পর্যন্ত হয়ে থাকে।
নবদ্বীপ জানান, খুলনা জেলার পাশাপাশি যশোর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরায় এর ব্যাপক চাষ দেখা যায়। মাটির গুণাগুণের কারণে ডুমুরিয়ায় চাষ ভালো হচ্ছে। স্বল্প খরচ আর বেশি লাভ বলে স্থানীয় কৃষকরা এই ফসল চাষে দিন দিন আগ্রহী হচ্ছেন। কিছু সার, মাটি, শ্রমিকসহ একেকটি কাটিং (কলম) তৈরিতে খরচ ছয় টাকা। মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে প্রতিটি কাটিং বিক্রি করা হয় ৫০ টাকায়।
স্থানীয় চাষিদের ভাষ্য, খুব কম সময়ের মধ্যে চুই গাছ অন্য গাছের সঙ্গে সহজে জড়িয়ে পুরো গাছজুড়ে লতিয়ে যায়। চুই গাছ রোপণের দুই থেকে চার বছরের মধ্যে এর অকৃতি বিশাল হয়; যা থেকে কয়েক লাখ টাকা বিক্রি সম্ভব।
চুইয়ের বাজার
চুই শিকড় থেকে কাণ্ড পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি করা যায়। বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি চুই ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাড়ি থেকে ফড়িয়ারা নগদ টাকায় কিনে নিয়ে যায়।
নবদ্বীপ মল্লিক বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে কৃষকরা তাঁর বাড়ি থেকে চুইয়ের চারা (কাটিং কলম) কিনে নিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে শতাধিক চুই ঝালের কলম তাঁর বাড়ি থেকে কিনে নিয়ে গেছে। ভারতে আরও অর্ডার রয়েছে। এলাকার চিংড়ি চাষিরা এখন তাদের ঘেরের বেড়িবাঁধ, ফসলি জমিতে ও বাড়ির আঙিনার আশপাশে চুই চাষ করছেন।
চাষি রহিম সরদার জানান, বাড়ির আঙিনায় ঝাড় ও জাম গাছের সঙ্গে গেছো চুই চাষ করেছেন তিনি। নিজের চাহিদা মিটিয়ে ভালো লাভবান হচ্ছেন। খরচ বাদে একটি গাছে দুই থেকে তিন বছর পর ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে আয় সম্ভব।
আরেক চাষি নিউটন মণ্ডল জানান, উপজেলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কমবেশি চুই চাষ হচ্ছে। বাণিজ্যিক ভিক্তিতে চুই চাষ করে লাভবান হচ্ছেন তারা। ডুমুরিয়া সদরে ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ বলেন, বাসাবাড়ি, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ১২ মাসই বাজারে চুইয়ের চাহিদা ব্যাপক।











































