Home বিনোদন শ্রাবণ দিনে রুনা লায়লার সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা

শ্রাবণ দিনে রুনা লায়লার সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা

4


বিনোদন ডেস্ক
আষাঢ় বিদায় নিয়েছে। বাংলার আকাশজুড়ে এখন শ্রাবণের রাজত্ব। বর্ষার সবচেয়ে আবেগময় এই মাসে প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। কখনো টুপটাপ, কখনো ঝুম বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় নগর-গ্রাম। রোদের দেখা মেলে কমই, আকাশজুড়ে ভেসে বেড়ায় ধূসর মেঘের দল। বাতাসে ভেসে আসে ভেজা মাটির গন্ধ, গাছের পাতায় জমে থাকা জলের ফোঁটা যেন আরও উজ্জ্বল করে তোলে চারপাশকে। শ্রাবণ এমনই এক ঋতু, যা মানুষকে অজান্তেই স্মৃতির ভেতর টেনে নেয়। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা পুরোনো বাংলা গানের সুর যেন এমন দিনে আরও বেশি করে মন ছুঁয়ে যায়।
ঠিক এমনই এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে বাংলাদেশের সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রধান ঠিকানা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মহড়াকক্ষে দেখা মিলল উপমহাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি, আর ভেতরে একের পর এক কালজয়ী গানের সুরে মুখর হয়ে উঠছে মহড়ার মঞ্চ। দেশের প্রথিতযশা বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের সঙ্গে তিনি কণ্ঠে তুলছিলেন-‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাবো’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘মঞ্চে কোলাহল থামবে না’, ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে বলো কী হবে’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘বন্ধু তিনদিন বাড়িত গেলাম দেখা’, ‘তুমি যে গেছো ভুলে’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে’, ‘সাধের লাউ বানাইলো মোরে’, ‘দমাদম মস্ত কালান্দার’-এমন অসংখ্য কালজয়ী গান। এই রেওয়াজের কারণও বিশেষ। পরদিন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চেই ৬২ বছরের বর্ণাঢ্য সংগীতজীবনে প্রথমবারের মতো একক সংগীতসন্ধ্যায় গান গাইবেন তিনি। সেই আয়োজনকে নিখুঁত করতেই দুপুর একটা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত টানা চলল মহড়া। আমরা তখন রুনা লায়লার মাত্র কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে। একে একে শুনছিলাম প্রতিটি গান। এত কাছ থেকে, কোনো রেকর্ডিং নয়, কোনো স্টুডিও নয়-কিংবদন্তির কণ্ঠে সরাসরি রেওয়াজ শোনার সৌভাগ্য জীবনে হয়তো একবারই আসে। সেই মুহূর্তগুলো তাই শুধু শুনিনি, অনুভবও করেছি।

টানা প্রায় দশটি গান গাইলেন তিনি। বাইরে তখন ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, বাতাসে হালকা শীতল পরশ। সেই আবহে রুনা লায়লার কণ্ঠ যেন সময়ের দেয়াল ভেঙে ফিরিয়ে নিচ্ছিল কয়েক দশক আগের দিনে। মনে হচ্ছিল, সাদাকালো টেলিভিশনের পর্দায় ২৫ কিংবা ৩০ বছর বয়সী রুনা লায়লা যেন আবারও প্রাণভরে গেয়ে উঠেছেন। বয়স যেন তাঁর কণ্ঠকে স্পর্শই করতে পারেনি।
আগেই কথা ছিল, মহড়া শেষে কথা বলবেন তিনি। নির্ধারিত সময়েই শেষ হলো রেওয়াজ। ঠিক তখনই এগিয়ে এলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন। রুনা লায়লা নিজেই আমাদের কাছে ডাকলেন।
কাছে যেতেই মোহাম্মদ জাকির হোসেন বললেন, ‘রুনা লায়লা আপার মতো একজন কিংবদন্তি শিল্পীকে নিয়ে শিল্পকলায় এই আয়োজন করতে পারা আমাদের জন্য গর্বের। ইতোমধ্যেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। টিকিট বিক্রির অর্থ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে বন্যার্তদের সহায়তার জন্য দেওয়া হবে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয়, শিল্পকলার ইতিহাসে রুনা লায়লার এই কনসার্ট একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। তাঁকে পেয়ে শিল্পকলাও সমৃদ্ধ হলো।’ জাকির হোসেনের কথা শুনে মৃদু হেসে ওঠেন রুনা লায়লা। এরপর শিল্পকলা একাডেমির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘অবশেষে এখানে গান গাওয়ার সুযোগ হলো আমার। তবে শিল্পকলার মঞ্চে উঠতে আমার ৬২ বছর লেগে গেল!’ এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আলাপ। ক্যারিয়ারের নানা স্মৃতি, অর্জন-অপ্রাপ্তি, গান, শ্রোতা-কত বিষয়ই উঠে এলো কথায় কথায়।
একপর্যায়ে তিনি আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘এই ভেন্যুর ধারণক্ষমতা তো খুব বেশি নয়। ছয়-সাতশ মানুষের মতো। যদি আরও বড় হতো, তাহলে আরও অনেক মানুষ অনুষ্ঠানটি উপভোগ করতে পারতেন। খোলা মাঠে হলে হয়তো হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে শুনতে পারতেন। কিন্তু শিল্পকলা চেয়েছে এই আয়োজন তাদের নিজস্ব পরিসরেই হোক। এখানকার ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকুক এই সংগীতসন্ধ্যা। আমিও সেটাই চাই।’ তার কথার ফাঁকেই যেন ভেসে আসছিল আরেকটি আহ্বান-‘গান শুনতে এসো তোমরাও।’
এদিকে বাইরে তখনও ঝরছে শ্রাবণের বৃষ্টি। আর ভেতরে ঝরছিল রুনা লায়লার কণ্ঠ আর স্মৃতির গল্প। মাত্র আধঘণ্টার সেই আলাপে যেন আরও একবার নতুন করে চিনলাম এই কিংবদন্তিকে। বুঝতে পারলাম, শুধু অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়েছেন বলেই কেউ কিংবদন্তি হন না; বিনয়, নিষ্ঠা, শিল্পের প্রতি আজীবনের ভালোবাসা আর শ্রোতার প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন শিল্পীকে কিংবদন্তির আসনে বসায়।
কথা শেষ করে শিল্পকলা একাডেমি থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে তখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। আর আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই সুর-‘যখন থামবে কোলাহল…’। মনে হচ্ছিল, শ্রাবণের সেই বৃষ্টিভেজা দুপুরটাও যেন চিরদিনের জন্য সেই গানেই আটকে রইল।