যশোর প্রতিনিধি
যশোরের নওয়াপাড়ায় ভৈরব নদে গোসলে নেমে নিখোঁজ ফাতেমা আক্তার বর্ণা (২৮) নামের গৃহবধূর সন্ধান মেলেনি। স্থানীয় নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও ডুবুরিরা অনেক খোঁজাখুঁজির পরও শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ দিকে ওই গৃহবধূর সন্ধানে স্বজনেরা ভৈরবপাড়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। নদীর তীরে স্বজনদের অপেক্ষা আর কান্না যেন থামছেই না। আর্তনাদ, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় একদিনের বেশি সময় কাটিয়েছেন তারা। শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে নওয়াপাড়ার সরদার মিলসংলগ্ন মালোপাড়া মহিলা ঘাটে এ ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ বর্ণা অভয়নগর উপজেলার মশরহাটি গ্রামের হাবিবুর রহমানের মেয়ে ও ঢাকার মিরপুরের রবিউল আলম খানের স্ত্রী। বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে ভাই বান্ধবী ও নিকট আত্মীয়দের সঙ্গে গোসলের একপর্যায়ে নদীতে লাফ দিয়ে নিখোঁজ হন বর্ণা।
এ বিষয়ে নওয়াপাড়া নৌপুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রনজিত কুমার বলেন, ‘ভৈরব নদের যে জায়গাটিতে বর্ণা লাফ দিয়েছে, জায়গাটি অনেক গভীর। ভাটা থাকলে অল্প পানি থাকে, আর জোয়ার থাকলে ২৫-৩০ ফুট গভীর। লাফ দেওয়ার সময় নদীতে স্রোত ও জোয়ার ছিলো।’ রনজিত কুমার আরও বলেন, ‘আমরা দ্বিতীয় দিনের মতো তল্লাশি করছি। সম্ভব্য জায়গায় থাকা কার্গো জাহাজগুলোও সরিয়েও তল্লাশি করছি। নদীর স্রোতমুখী দু পাশেই তল্লাশি চলছে। অন্তত ২ থেকে তিন কিলোমিটার তল্লাশি করেছি। তার পরেও হাল ছাড়ছি না। ধারণা করছি স্রোতে অনেক দূরে নিয়ে গেছে। নদীতে প্রবল স্রোতে উদ্ধার কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। উদ্ধার করতে তারা অপ্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছেন। উদ্ধার অভিযান কতক্ষণ পর্যন্ত চলবে, তা বলা যাচ্ছে না।’
শনিবার দুপুরে নওয়াপাড়ার সরদার মিলসংলগ্ন মালোপাড়া মহিলা ঘাটে দেখা যায়, বর্ণার পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড়। সবার চোখেমুখে উৎকণ্ঠার ছাপ। কেউ কেউ হাউমাউ করে ডুকরে কাঁদছেন। কেউ কেউ নীরবে কেঁদে রুমালে চোখ মুছছেন। শোক, দুঃখ ও কান্নায় ওই এলাকার আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠছে। স্থানীয়রা জানান, বর্ণার মা বেঁচে নেই। ছোটবেলা থেকেই মেধাবি ছিলেন বর্ণা। চার বছর আগে পারিবারিকভাবে ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রবিউল আলম খানের সঙ্গে বিয়ে হয়। স্বামীর চাকরির সুবাদে তারা মানিকগঞ্জে বসাবস করতেন। এই দম্পত্তির এখনও সন্তান হয়নি। চলতি মাসের ৯ তারিখে বর্ণা বাবার বাড়িতে আসেন। বাড়িতে এসে প্রতিদিনই নওয়াপাড়ার এই ঘাটে স্বজনদের সঙ্গে গোসলে আসতেন। কিন্তু শুক্রবার ঘটে এই দুর্ঘটনা। নদীর পাড়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিখোজ বর্ণার ছোটভাই মেহেদী হাসান মাহি বলেন, ‘শুক্রবার আপা (বর্ণা), তার এক বান্ধবি, ফুফু, আমাদের এক ভাড়াটিয়ার স্ত্রীসহ ৬ থেকে ৭ জন ঘাটে গোসলে আসি। তখন জোয়ার চলছিল। সবাই গোসলে মগ্ন। কেউ লাফ দিচ্ছে, কেউ বা সাঁতার কাটছিল। আপাও দুইবার গাছের গুঁড়ির ওপর থেকে লাফ দেয়। পরের বার লাফ দিয়ে সে আর পানির ওপরে ওঠেনি। সবাই যে যার মতো গোসলে মগ্ন থাকাতে বুঝতে পারেনি। একপর্যায়ে বর্ণা আপাকে না পাওয়ায় ডুব দিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করি।’
আহাজারি করতে করতে মেহেদী বলেন, ‘অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে না পেয়ে জেলে পাড়ার লোকদের খবর দিয়ে জাল টেনেও পাওয়া যায়নি। পরে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়। নদীর পাড়ে বর্ণার বাবা হাবিবুর রহমান বাকরুদ্ধ। মাঝে মধ্যে মেয়ের জন্য বিলাপ করছেন, আর বলছেন, ‘আমার সব শেষ। আমার জামাইরে কি জবাব দিবো। জীবিত বা মৃত, যেভাবেই হোক আমার মেয়েটারে একবার দেখতে চাই।’









































