আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
দিল্লির যন্তরমন্তরে চলমান ছাত্র আন্দোলন ও আমরণ অনশন নতুন মোড় নিয়েছে। লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর আন্দোলন স্তিমিত হবে বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা।
আন্দোলনের নেতৃত্বে নতুন মুখ সামনে এসেছে, অনশন কর্মসূচিও অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়ায় কেন্দ্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
নিট পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ২০ জুন যন্তরমন্তরে আন্দোলন শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি। পরে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ২৮ জুন থেকে আমরণ অনশনে বসেন সোনম ওয়াংচুক।
আন্দোলনকারীদের দাবি, পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দীর্ঘ ২১ দিনের অনশনের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় শনিবার (১৮ জুলাই) সকালে দিল্লি পুলিশ সোনম ওয়াংচুককে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যায়। পুলিশ জানায়, দিল্লি উচ্চ আদালতের নির্দেশ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে ওয়াংচুকের পরিবার এই ব্যাখ্যা মানতে রাজি নয়। তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি বলেন, আদালত নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল, হাসপাতালে ভর্তি করার নির্দেশ দেয়নি। হাসপাতালের পরীক্ষার ফল নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, স্বাধীন পরীক্ষাগারে আবারও রক্ত পরীক্ষা করানো হবে। তার দাবি, সোনমের অনশন এখনো ভাঙেনি। তিনি আগের মতোই শুধু লবণ ও পানি গ্রহণ করছেন।
সোনমকে হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমরণ অনশনে বসেছেন। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০ জুলাই পূর্বঘোষিত সংসদ অভিযান কর্মসূচিও যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় আন্দোলনকারীরা বলেছেন, একজনকে সরিয়ে দিলেই আন্দোলন থেমে যাবে না। শনিবার যন্তরমন্তরে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা যায়। বিভিন্ন স্লোগানের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদধ্বনিও শোনা যায়।
আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকার আলোচনার পথ এড়িয়ে যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। এদিকে সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে স্থানান্তরের ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জবাব আলোচনার মাধ্যমে দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে সোনমকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
তার অভিযোগ, বিরোধী মতকে সম্মান না করলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগে কংগ্রেসও সোনম ওয়াংচুকের পাশে দাঁড়ায়। বিরোধী নেতাদের বক্তব্য, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসাই সরকারের উচিত ছিল। তবে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এখনো শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা আন্দোলনের দাবিগুলো নিয়ে কোনো ইতিবাচক ঘোষণা আসেনি।
গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, যন্তরমন্তরে বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা ছাত্রছাত্রী ও তরুণদের উপস্থিতি এখনও অব্যাহত রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকেরা অনশন মঞ্চ পরিচালনা, চিকিৎসা সহায়তা এবং আন্দোলনের সার্বিক সমন্বয়ের কাজ করছেন। আগামী কয়েক দিনের কর্মসূচিতে আরও মানুষের অংশগ্রহণের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই আন্দোলন শুরুতে সীমিত পরিসরে থাকলেও সোনম ওয়াংচুকের অনশন এবং পরে তাকে হাসপাতালে স্থানান্তরের ঘটনায় বিষয়টি জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। বিরোধী দলগুলোর সমর্থন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের ফলে আন্দোলনের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
তবে কেন্দ্রের অবস্থান এখনো অপরিবর্তিত। সরকারের দাবি, আদালতের নির্দেশ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনেই সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।
এখন নজর আগামী কয়েক দিনের দিকে। সংসদ অভিযান, নতুন অনশন কর্মসূচি এবং বিরোধী দলগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক চাপ সরকার কীভাবে মোকাবিলা করে, সেদিকেও দৃষ্টি রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।









































