Home Lead পদ্মা সেতুর ৪ বছর: গ্যাস সংকটে থমকে আছে দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন

পদ্মা সেতুর ৪ বছর: গ্যাস সংকটে থমকে আছে দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন

16


স্টাফ রিপোর্টার।।
যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে স্বপ্নের পদ্মা বহুমুখী সেতু চালুর চার বছর পূর্ণ হয়েছে। সেতু চালুর পর রাজধানী ঢাকার সঙ্গে খুলনাঞ্চলসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের দূরত্ব ও সময় কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর ফলে কৃষি, মৎস্য, পর্যটন এবং মোংলা ও ভোমরা বন্দরনির্ভর বাণিজ্যে অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার হয়েছে। তবে অর্থনীতির অন্যান্য খাতে সুফল দৃশ্যমান হলেও, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত জোয়ার আসেনি। মেলেনি প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ, গড়ে ওঠেনি বড় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোও পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়নে যে মহাপরিকল্পনা ছিল, তার পূর্ণ প্রতিফলন এখনো অধরা।


পদ্মা সেতুর সবচেয়ে বড় সুফল ভোগ করছেন স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যজীবীরা। খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ডুমুরিয়া সদরের পূর্বপাশে গড়ে উঠেছে অঞ্চলের বৃহত্তম কাঁচাবাজার, যেখান থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ টন সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৮০ টন সবজিই এখন পদ্মা সেতু হয়ে মাত্র পৌনে ৪ ঘণ্টায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৌঁছে যাচ্ছে। ফেরিঘাটের ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট ও সবজি পচনের লোকসান থেকে মুক্তি পেয়ে লাভবান হচ্ছেন কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই।
একই গতি এসেছে মৎস্য খাতে। মোংলা বন্দরে নিয়মিত জাহাজ ও কনটেইনার না পাওয়ার সংকটের কারণে বর্তমানে খুলনা অঞ্চলের অন্তত ২০ ভাগ ফ্রোজেন চিংড়ি ও মাছ পদ্মা সেতু দিয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন ব্যবসায় সৃষ্টি হয়েছে নতুন উন্মাদনা, বহুগুণ বেড়েছে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন।


যোগাযোগের এই বিশাল সাফল্যের বিপরীতে হতাশার চিত্র দিচ্ছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। পরিসংখ্যান বলছে, পদ্মা সেতু চালুর পর খুলনা বিভাগে নতুন শিল্পের নিবন্ধন ও বিনিয়োগের গ্রাফ উল্টো নিম্নমুখী: ২০২১-২২ অর্থবছর: ৪৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের বিপরীতে বিনিয়োগ হয়েছিল ১ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছর: ১৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের বিপরীতে বিনিয়োগ কমে দাঁড়ায় ৭৫৭ কোটি টাকায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছর (জানুয়ারি পর্যন্ত): ১৩টি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বিনিয়োগ হয়েছে ১ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা।


অথচ সেতু চালুর আগের বছরগুলোতে বিনিয়োগের চিত্র আরও চাঙ্গা ছিল। যেমন—২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাত্র ২২টি শিল্প নিবন্ধনের বিপরীতে এই বিভাগে রেকর্ড ১১ হাজার ২২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ এসেছিল। বর্তমানে প্রতি মাসে মাত্র ২ থেকে ৩টি ছোট ও মাঝারি শিল্প (বিনিয়োগ ৫ থেকে ১০০ কোটি টাকা) নিবন্ধন নিচ্ছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। খুলনা-মোংলা ও খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে খালি জমিতে বড় বড় কলকারখানার বদলে এখন শুধুই কিছু প্রতিষ্ঠানের নামসর্বস্ব সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়।


বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি আশরাফ-উজ-জামান বলেন, “একসময় শিল্পনগরী হিসেবে খ্যাত খুলনার ঐতিহ্য ফেরাতে সবাই আশা করেছিল পদ্মা সেতু চালুর পর বিনিয়োগ বাড়বে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতিতে টিকে থাকার প্রধান উপাদান ‘গ্যাস সরবরাহ’ খুলনা অঞ্চলে এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। গ্যাস না থাকায় উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক জোনের অভাবের কারণে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো এখানে আসতে চাচ্ছে না।”


পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের সভাপতি কুদরত-ই-খুদা জানান, ক্রমাগত লোকসানের মুখে ২০২০ সালের জুলাই মাসে খুলনা অঞ্চলের ৯টিসহ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ করে সরকার গোল্ডেন হ্যান্ডশেক ঘোষণা করে। এতে খুলনার ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, ইস্টার্ন, আলিম, জেজেআই ও কার্পেটিং জুট মিলের প্রায় ৩০ হাজার স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিক একযোগে চাকরি হারান।


তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শ্রমিকরা আশা করেছিল পদ্মা সেতু চালু হলে পিপিপি বা বিদেশি বিনিয়োগে মিলগুলো প্রাণ ফিরে পাবে। ২০২১ সালে সরকার মিলগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও, ইজারা পাওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো উৎপাদনে যায়নি। মূলত ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের লোন নেওয়ার সুবিধা বজায় রাখতেই তারা নামমাত্র ও লোকদেখানো উৎপাদন চালু রেখেছে, যা কর্মসংস্থান বা শিল্পের উন্নয়নে কোনো কাজেই আসছে না।”


অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক সুফলকে শতভাগ কাজে লাগাতে হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে খুলনাঞ্চলে পাইপলাইনের মাধ্যমে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দেশের দীর্ঘতম এই সেতুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কেবল পণ্য পরিবহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে যাবে, দক্ষিণাঞ্চল আর কখনো তার হারানো ‘শিল্পনগরী’র গৌরব ফিরে পাবে না।