২ কোটি ৬৮ লাখ ৯১ হাজার টাকার অর্থ বরাদ্দ # ৫০ ভাগ কাজ শেষ হলেও ৭১ ভাগ দেখিয়েছে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে
স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা ডুমুরিয়া উপজেলার তেলিখালী ও বিলডাকাতিয়ার নিমতলা খাল খননে সরকারী নিদের্শ মানছেনা স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। খালের পানি অপসারন না করে ভাসমান ভেক্যু দিয়ে পেড়ি মাটি তুলে ফেলেছে খালের পাড়েই। এই প্রকল্পে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৯১ হাজার ৮শ ৪৩ টাকা বরদ্দ দেয়া হলেও জলাবদ্ধতা নিরসন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যে করনে প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচী এ অঞ্চলে কোন সুফলই আসছেনা। ফলে আবারও পানিবন্দী হয়ে পড়বে ডুমুরিয়া উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ। এদিকে খাল পুনঃখননে প্রকল্পের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসারে বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

বিলডাকাতিয়ার নিমতলা খাল খননের কাজ ৫০ ভাগ শেষ হলেও কাগজ কলমে ৭১ ভাগ দেখিয়ে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে প্রকল্পের অগ্রগতির প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের কাজে না নিয়ে বরাদ্দকৃত ১ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৫শ টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উপজেলাবাসীর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী জনগুরুত্বপূর্ণ খালগুলো খনন, পুনঃখনন এবং খালপাড়ে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেয়া হয়। তারই অংশ হিসাবে অগ্রাধিকার ভিক্তিতে খুলনা ডুমুরিয়া উপজেলার ৩টি খাল অগ্রধিকার দিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। ত্রান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে ইজিপিপি অর্থাৎ অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচীর আওতায় ৩টি খালের মধ্যে ২টি খাল পুনঃখননের অনুমোদন দেয়া হয়।

ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষ্ণনগর নিমতলা হতে বিল ডাকাতিয়া হয়ে রংপুর সাড়াতলা দক্ষিণপাশর্^ আশি ফুট পর্যন্ত খাল পুনঃ খনন, যার দৈর্ঘ ৭ কিলো মিটার। খালটির পুনঃখননে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৩০ লাখ ১১ হাজার ৮৪৩ টাকা। এর মধ্যে শ্রমিকদের বিভিন্ন কাজে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৩৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে খাল পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ ৯০ লাখ ৭১ হাজার ৮৪৩ টাকা। সাহস ডোলডাঙ্গা খাল হতে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানে হয়ে তেলিখালী গেট অভিমুখে ভদ্রা নদী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কিলো মিটার খাল পুনঃ খনন। এ কাজের অর্থিক বাজেট ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮৮ টাকা। যার মধ্যে শ্রমিকদের কাজের জন্য বরাদ্দ ৬৩ লাখ ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং আধুনকি যন্ত্রের সাহায্যে খাল পুনঃখননরে জন্য বরাদ্দ ৬৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮৮ টাকা।

সরোজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ডোলডাঙ্গা খাল হতে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানে হয়ে তেলিখালী গেট অভিমুখে ভদ্রা নদী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কিলো মিটার খাল গত ২৪ এপ্রিল থেকে পুনঃ খননের কাজ শুরু করেন উপজেলা প্রশাসন। ৩০ জুন প্রকল্পের সকল কাজ শেষ করা হয়। কৃষ্ণনগর নিমতলা হতে বিল ডাকাতিয়া হয়ে রংপুর সাড়াতলা দক্ষিণপাশর্^ আশি ফুট পর্যন্ত ৭ কিলো মিটার খাল গত ১৩ মে পুনঃখননের কাজ শুরু হয়। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ওই খালের ৭১ ভাগ কাজ শেষ করে ৩০ জুন। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতির প্রতিবেদন দুই দফা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দাখিল করেন ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার।
২৩ জুন দাখিলকৃত প্রথম দফা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় , উপজেলার কৃষ্ণনগর নিমতলা হতে বিল ডাকাতিয়া হয়ে রংপুর সাড়াতলা দক্ষিণপাশর্^ আশি ফুট পর্যন্ত খাল পুনঃ খননের কাজের কর্মসূচীভূক্ত ৭ কিলো মিটার। ১৩ জুন কাজটি শুরু হয়ে এ পর্যন্ত খনন করা হয়েছে ৫০ শতাংশ। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ৩০ দাখিলকৃত ২য় দফায় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় , খনন কাজে ৫০ শতাংশর স্থলে ৭১ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। মাত্র ৫ দিনে কিভাবে খাল খননের কাজ ২১ শতাংশ হয়েছে , সেটা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি খাল খনন কাজ পরর্দিশনে এসে ছিলেন ত্রান মন্ত্রণালযরে যুগ্ম সচবি মিনাক্ষী ব্রম্ম। তিনি প্রকল্প কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে নকশাঁ অনুযায়ি ও পানি অপসারন করে খাল খননরে নির্দেশনা দেন । দুটি খালের পাড়ে পহেলা জুলাই থেকে বৃক্ষরোপন কার্যক্রম শুরু করার কথা থাকলেও এখনো পর্যন্ত শুরু করতে পারেনি উপজেলা প্রশাসন ।

এদিকে স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, খালের কোথাও ৫ ফুট কোথাও ৭ ফুট আবার কোথাও ১০ ফুটের মত পানি রয়েছে। সেই পানরি মধ্যে ভাসমান ভেক্যু দিয়ে পেড়ি মাটি তুলে ফেলা হচ্ছে খালের পাড়ে। কোন শ্রমিকেরই দেখা মেলেনি সেখানে। প্রকল্প শুরুর আগে থেকে অনেকের কাছ থেকে কাজ দেয়া কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প শুরুর পর তাদের কাউকেই কাজে নিয়োগ দেয়া হয়নি। ফলে যাদের নামে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করা হচ্ছে বা হয়েছে, বাস্তবে ওইসব ব্যক্তির স্বাক্ষরের সঙ্গে মাস্টার রোলের স্বাক্ষর বা টিপসইয়ের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের উদ্দেশ্যে শ্রমিকের এসব ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও মাস্টার রোল তৈরি করা হচ্ছে ।

খুলনা জেলা ত্রান ও পূর্ণবাসন কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল করিম জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশ অনুযায়ি খুলনা ডুমুরিয়া উপজেলায় ২টি খাল খনন সূচী শুরু হয়ে জুন মাসে শেষ হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর থেকে প্রকল্পের কাজের প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দাখিল করা হয়েছে। তিনি বলেন একটি প্রকল্পের শতভাগ ও আর একটি প্রকল্পের ৭১ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বাকী ২৯ শতাংশ খননের কাজ আগামী অর্থবছরে সম্পন্ন করার জন্য জেলা প্রশাসনের দপ্তর থেকে মন্ত্রনালয়ে পত্র প্রেরন করা হবে।
ডুমুরিয়া উপজলো প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা উপ-সহকারি প্রকৌশলী মোঃ রবিউল ইসলাম জানান, যান্ত্রিক ও শ্রমিকদের মাধ্যমেই খাল পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। সাহস ডোলডাঙ্গা খাল হতে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানে হয়ে তেলিখালী গেট অভিমুখে ভদ্রা নদী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কিলো মিটার খাল পুনঃখননে যন্ত্রের মাধ্যমে কাজের অর্ধেক বিল ২৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া শ্রমিকদের কাজের পাওনার অর্ধেক ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে । তবে কৃষ্ণনগর নিমতলা হতে বিল ডাকাতিয়া হয়ে রংপুর সাড়াতলা দক্ষিণপাশর্^ আশি ফুট পর্যন্ত ৭ কিলো মিটার এর মধ্যে ৫ কিলো মিটার খাল পুনঃখননে শ্রমিকদের কাজের পাওনার কোন অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।

শুধু মাত্র যন্ত্রের মাধ্যমে কাজের আংশিক ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। উপজলো প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আরো জানান, খাল খননোর দুই পাড়ে বৃক্ষ রোপনের জন্য ১০ হাজার ২শ ৫০টি গাছ ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় ক্রয় করা হয়েছে। বৃষ্টির কারনে এই মুহুর্তে গাছ লাগানো সম্ভব হচ্ছেনা। আবহওয়া স্বাভাবিক হলে ওই গাছ গুলো রোপন করা হবে। শ্রমিকদের কাজের টাকা বা কাজ না করিয়ে কোন অর্থ আত্মসাতের কারো কোন সুযোগ নেই বলেও জানান উপজলো প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা উপ-সহকারি প্রকৌশলী মোঃ রবিউল ইসলাম।

এ ব্যাপারে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, প্রকল্পের শর্ত মেনে খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। প্রকল্প দুইটির মধ্যে একটি শতভাগ ও অন্যটি ৭১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বৃষ্টির পানির লেবেল বেড়ে যাওয়ায় কৃষ্ণনগর নিমতলা হতে বিল ডাকাতিয়া হয়ে রংপুর সাড়াতলা দক্ষিণপাশর্^ আশি ফুট পর্যন্ত খাল খননের কাজ সম্পন্ন করা যায়নি। তাছাড়া জুন মাস প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছে । যে কারনে আগামী অর্থ বছরে খাল পুনঃ খনের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রনালয়ে পত্র প্রেরন করা হবে। তিনি আরো বলেন, এই খাল দুটির কোথাও কোথাও ২/৩ , আবার কোথাও কোথাও ৩/৪ ফুট গভীরতায় খনন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমি দফায় দফায় পরিদর্শনে গিয়েছি। এ কাজে অনিয়মের কোন সুযোগ নেই।











































