খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
কঙ্বাজারে গত ২৪ ঘণ্টার রেকর্ড ভাঙা ভারী বর্ষণে পৃথক চারটি স্থানে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নারী-শিশুসহ আটজন এবং কঙ্বাজার সদরের একজনসহ মোট ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনার পর থেকে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকিতে বসবাসকারী লাখো মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
টানা অতিভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের পাশাপাশি পুরো জেলা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিম্নাঞ্চল-সমতল প্লাবিত হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। রোববার দুপুর ১২টা থেকে সোমবার (৬ জুলাই) দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কঙ্বাজারে ২৬৭ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে এবং এই ভারী বর্ষণ আরও দুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক ৩ পাহাড়ধস, প্রাণহানি ৮: সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রশাসনের তথ্যমতে, সোমবার দিনগত রাত ও ভোরের পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটজন মারা গেছেন।
১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্প: উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে পাহাড়ধসে কামাল হোসাইনের বসতঘর মাটিচাপা পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানসহ তিনজনকে মৃত এবং দুজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন।
৭ নম্বর কুতুপালং ক্যাম্প: রাত আনুমানিক ২টার দিকে রাজাপালং ইউনিয়নের এই ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটিচাপায় একরাম (৭) নামের এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়।
১১ নম্বর বালুখালী ক্যাম্প: রাত ৩টার দিকে এই ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে পাহাড়ধসে আরও চারজন নারী ও শিশুর মৃত্যু হয় এবং একজন আহত হন।
কঙ্বাজার সদরে নিহত ১: অন্যদিকে, সোমবার ভোরে কঙ্বাজার সদর পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে একই পরিবারের তিনজন মাটির নিচে চাপা পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই আলী আকবর নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়।
উচ্চ ঝুঁকিতে ৩৩টি ক্যাম্প ও স্থানীয় সমতল: পরিবেশবাদীদের মতে, ঘর তৈরি ও মাটি ভরাটের জন্য নির্বিচারে পাহাড় কাটা এবং জ্বালানির চাহিদা পূরণে বনের গাছ সাবাড়ের ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত বনভূমি অতিবর্ষণে ধসের এই চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে। উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝে অন্তত আটটি ক্যাম্প পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা পাহাড়ের পাদদেশে ও ঢালজুড়ে বাস করছেন।
ক্যাম্প-৯ ও ১০ এর একাধিক বাসিন্দা জানান, সমতলে জায়গা না পেয়ে তারা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের ওপরে-নিচে ঘর করেছেন। বৃষ্টি হলেই তারা নির্ঘুম রাত কাটান, কিন্তু তাদের অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে, টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে কঙ্বাজারের ঈদগাঁও বাজার, ফসলি জমি, পোকখালী, চৌফলদন্ডী, পেকুয়া, চকরিয়া, রামু, কঙ্বাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্প, আলীরজাহাল, এসএমপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া, পর্যটন জোন এবং মহেশখালীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশাসনের তৎপরতা ও মাইকিং: পাহাড়ধসের আরও আশঙ্কা থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার এবং কঙ্বাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানিয়েছেন, সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং কঙ্বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
কঙ্বাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা গতবছরের মতোই সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।”











































