Home Lead রাজবাঁধ যেন বিষাক্ত এক ‘ম্যানমেড’ পাহাড়!

রাজবাঁধ যেন বিষাক্ত এক ‘ম্যানমেড’ পাহাড়!

14

কেসিসির বর্জ্যে বিপন্ন সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার, তীব্র দুর্গন্ধ ও বিষ-পানিতে নরকযন্ত্রণা ভোগ করছেন লাখো মানুষ!

স্টাফ রিপোর্টার।।


খুলনা মহানগরী ও আশপাশের এলাকার পরিবেশের ওপর এক নীরব কিন্তু মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে। খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) এলাকার প্রতিদিনের শত শত টন গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক বর্জ্য কোনো প্রকার আধুনিক শোধন ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে একতরফা ডাম্পিং করা হচ্ছে শহরের অদূরে বটিয়াঘাটার রাজবাঁধ এলাকায়। দীর্ঘদিনের এই অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পুরো রাজবাঁধ এলাকা এখন আর কেবল ময়লা ফেলার স্থান নয়, বরং এটি এক বিশাল, বিষাক্ত ও দুর্গন্ধময় ময়লার পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। ডাম্পিং স্টেশন থেকে অনবরত ছড়িয়ে পড়া তীব্র পচা দুর্গন্ধ, বাতাসে উড়ে যাওয়া ক্ষতিকর উপাদান এবং ময়লার স্তূপ থেকে চুইয়ে পড়া মারাত্মক রাসায়নিক মিশ্রিত বিষাক্ত পানির (লিচেট) কারণে স্থানীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবন সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। স্থায়ী কোনো সুরাহা বা বৈজ্ঞানিক বর্জ্য শোধনাগার গড়ে না তোলায় চরম ক্ষোভ, রোগব্যাধি ও তীব্র দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই অঞ্চলের হাজার হাজার অবহেলিত বাসিন্দা।


দৈনিক ৫০০ টনেরও বেশি বর্জ্যের ভারে ন্যুব্জ রাজবাঁধ: কেসিসি ও স্থানীয় ডাম্পিং স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, সেই পৌরসভার আমল থেকেই রাজবাঁধ এলাকাটিকে শহরের বর্জ্য ফেলার প্রধান ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে শহরের পরিধি ও জনসংখ্যা বাড়ার কারণে বর্জ্যের পরিমাণও জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বর্তমানে খুলনা মহানগরীর নিরালা, বয়রা বাজার মোড়, ময়লাপোতা, পিটিআই, নতুন বাজার, দৌলতপুর, কবির বটতলা, গোয়ালখালী এবং খালিশপুরসহ ১২টি অত্যাধুনিক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৫৫০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়।


সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ আবর্জনা কেসিসির প্রায় ৭৭২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ৮২টি ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের ট্রাকের মাধ্যমে শহরের বাইরে রাজবাঁধ এলাকায় নিয়ে আসা হয়। রাজবাঁধ ময়লা ডাম্পিং স্টেশনের সুপারভাইজার হাফিজুর রহমান রাশেদ এই সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরে জানান, প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি ময়লা বোঝাই ট্রাক এখানে বর্জ্য আনলোডিং করে। এমনকি সরকারি ছুটির দিনেও এর ব্যতিক্রম হয় না; বন্ধের দিনগুলোতেও প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ গাড়ি ময়লা রাজবাঁধে ফেলা হয়। বিশাল এই বর্জ্যের স্তূপকে জায়গা দিতে বড় বড় ক্রলার মেশিন বা বুলডোজার দিয়ে ময়লাগুলো কেবল পেছনের দিকে ঠেলে ঠেলে জমিয়ে রাখা হচ্ছে। বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, রিসাইক্লিং বা বৈজ্ঞানিক ডিকম্পোজিশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এটি এখন আশেপাশের গ্রামীণ জনপদের জন্য এক স্থায়ী মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।


উন্মুক্ত ট্রাকে ছড়াচ্ছে বিষাক্ত দূষণ, বাতাসে উড়ছে রোগজীবাণু: সরেজমিনে খুলনা-কৈয়া সড়ক এবং রাজবাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বর্জ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পরিবেশগত নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। কেসিসির প্রায় ৯০ ভাগ ট্রাকই ওপরের অংশ সম্পূর্ণ খোলা ও উন্মুক্ত অবস্থায় শহর থেকে রাজবাঁধের দিকে ছুটে আসে। ফলে তীব্র গতিতে চলার সময় ট্রাক থেকে উপচে পড়া বর্জ্য এবং তীব্র দুর্গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে পুরো সড়কের পরিবেশ বিষাক্ত করে তুলছে। অনেক সময় বাতাসের তোড়ে প্লাস্টিক, পলিথিন ও হালকা ওজনের ময়লা-আবর্জনা উড়ে গিয়ে মহাসড়কে চলাচলকারী সাধারণ পথচারীদের গায়ে, মোটরসাইকেল আরোহীদের ওপর এবং রাস্তার দুই পাশের গাছপালায় গিয়ে পড়ছে।


এই রুটের নিয়মিত চলাচলকারী ও খুলনা-কৈয়া সড়কের একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী সোরাব আহমেদ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শহর থেকে আসা অধিকাংশ ময়লার গাড়ি উন্মুক্ত অবস্থায় যায়। এতে যেমন প্রচণ্ড গন্ধ বাতাসে ছড়ায়, তেমনি বাতাসে ময়লাও উড়ে রাস্তায় যায়। পলিথিন ও হালকা ময়লা বাতাসে ভেসে মানুষের গায়েও পড়ে। বর্জ্য পরিবহনের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল ও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।”


কৃষি ও মৎস্য সম্পদে ধস: জীবিকা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন স্থানীয়রা: রাজবাঁধের এই ময়লার পাহাড় কেবল বাতাসকেই বিষাক্ত করছে না, বরং এটি স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি এবং মৎস্য সম্পদের ওপর এক বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। আবর্জনার স্তূপ থেকে বৃষ্টির পানির সাথে মিশে যে গাঢ় কালো রঙের বিষাক্ত কেমিক্যাল বা লিচেট নির্গত হয়, তা সরাসরি আশেপাশের ফসলি জমি, ডোবা এবং খালে গিয়ে পড়ছে।


ডাম্পিং স্টেশনের ঠিক পেছনেই এক মানবেতর পরিবেশে বসবাস করেন শিল্পী রানী। তিনি চোখের জল মুছে বলেন, “আমার এই মাথা গোঁজার জায়গা ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার কোনো ঠিকানা নেই। এজন্য দিন-রাত এই নরকযন্ত্রণা ও তীব্র গন্ধ সহ্য করে এখানেই পড়ে থাকতে হয়। আমরা অনেকবার কেসিসির লোকজনকে এখানে ময়লা না ফেলার জন্য অনুরোধ করেছি, হাত জোড় করেছি। কিন্তু তারা আমাদের কথার কোনো পাত্তাই দেয় না, উল্টো বুক ফুলিয়ে বলে এটা নাকি তাদের নিজেদের জায়গা।”


শিল্পী রানী আরও জানান, পূর্বে এই এলাকায় চমৎকার কৃষি কাজ হতো, যা দিয়ে বহু মানুষের সংসার চলত। কিন্তু বর্জ্যের এই বিষাক্ত পানির কারণে আশেপাশের সমস্ত কৃষি জমি উর্বরতা হারিয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে এবং এখন আর কোনো ফসল উৎপাদন হচ্ছে না। শুধু কৃষিই নয়, এখানকার স্থানীয় খালগুলোতে একসময় প্রচুর পরিমাণে দেশীয় মাছ পাওয়া যেত, যা ধরে জেলেরা জীবিকা নির্বাহ করত। এখন ময়লার বিষাক্ত পানিতে খালের পানি পচে আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে, যার ফলে মাছের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। জীবিকা হারিয়ে এই এলাকার সাধারণ মানুষ এখন অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন।


ডাস্টবিনহীন খুলনা নগরী: বাসাবাড়িতে দুর্ভোগ, হিংস্র হচ্ছে প্রাণীকূল: খুলনা সিটি করপোরেশন আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে শহর থেকে পুরোনো মডেলের স্থায়ী ডাস্টবিনগুলো সম্পূর্ণ তুলে দিয়েছে এবং এর পরিবর্তে ‘ডোর টু ডোর’ বা বাসাবাড়ি থেকে সরাসরি ময়লা সংগ্রহের পদ্ধতি চালু করেছে। কিন্তু নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীদের মতে, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও স্থায়ী সমাধান না করে ডাস্টবিন তুলে দেওয়ায় হিতে বিপরীত হয়েছে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার এই ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “আগের মতো ডাস্টবিন না থাকায় সাধারণ মানুষ এখন বাধ্য হয়ে বাসাবাড়ির ময়লা পলিথিনে মুড়িয়ে ড্রেনে ফেলছে অথবা যত্রতত্র ফেলে রাখছে। বাসাবাড়ি থেকে ময়লা নিলেও তার এই কার্যক্রম স্থায়ী কোনো সমাধান দিচ্ছে না। ময়লা পলিথিন মুড়িয়ে ফেলায় তা মাটির সঙ্গে মিশতে পারছে না, ফলে ড্রেনগুলো পুরোপুরি আটকে গিয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া সেকেন্ডারি স্টেশনে ময়লা এনে সাথে সাথে রাজবাঁধে নেওয়া হয় না, সেখানেও একদিন পড়ে থাকে। তাই বাসাবাড়ির অদূরে আগের মতো ছোট ডাস্টবিন রাখা উচিত।”


এদিকে ডাস্টবিন তুলে নেওয়ার ফলে একটি ভিন্নধর্মী মানবিক ও পরিবেশগত সংকট তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি শহরের অবলা প্রাণীদের ওপর প্রভাব ফেলছে। আগে রাস্তার মোড়ে ডাস্টবিন থাকলে বেওয়ারিশ কুকুর, বিড়াল বা পাখিরা মানুষের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে সহজেই জীবন ধারণ করত। এখন ডাস্টবিন না থাকায় এবং ময়লা পলিথিনে শক্ত করে মোড়ানো থাকায় এই নিরীহ প্রাণীরা পুরোপুরি অভুক্ত থাকছে। খাবারের তীব্র সংকটে পড়ে ক্ষুধার্ত এসব অবলা প্রাণী দিন দিন হিংস্র হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, বাজারে সাধারণ মানুষের হাতে ব্যাগ বা খাবার দেখলে ক্ষুধার্ত কুকুর-বিড়ালগুলো তাদের ওপর হিংস্রভাবে আক্রমণ করতে উদ্যত হচ্ছে।


স্থায়ী সমাধানের দাবিতে ফুঁসে উঠছেন রাজবাঁধের বাসিন্দারা: তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চরম অস্বস্তির মধ্যে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা সুশীল কুমার তার ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “রাজবাঁধের এই ময়লার ভাগাড়ের তীব্র ও পচা গন্ধে আমাদের এখানে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সবসময় তীব্র পচা গন্ধে এই এলাকার মানুষ খুব অশান্তি ও অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটায়। এর ঠিক পেছনেই রয়েছে একটি বড় জনবসতি। এলাকার শিশুদের শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ লেগেই আছে। আমাদের স্পষ্ট দাবি, এই ময়লার ভাগাড় অবিলম্বে লোকালয় থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হোক এবং বর্জ্যের একটি স্থায়ী ও পরিবেশবান্ধব সুরাহা করা হোক।”


এ বিষয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের কনজারভেন্সি অফিসার আনিসুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, “আমরা প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ টন বাসাবাড়ির বর্জ্য অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সংগ্রহ করি এবং সেগুলো রাজবাঁধ ডাম্পিং এলাকায় নিয়ে যাই। ডাস্টবিন ব্যবস্থাটি একটি পুরোনো মডেল ছিল, তাই আমরা আধুনিক ‘ডোর টু ডোর’ ময়লা সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করেছি।” রাজবাঁধের স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন যে, এখনও সেখানে পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী বৈজ্ঞানিক সমাধান করা সম্ভব হয়নি, তবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে কেসিসির বিশেষ প্রকল্প ও কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।


তবে কেসিসির এই রুটিনমাফিক আশ্বাসে আর মোটেও আস্থা রাখতে পারছেন না রাজবাঁধ ও বটিয়াঘাটার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত খুলনার এই অঞ্চলের পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য রক্ষায় অবিলম্বে রাজবাঁধের এই ‘বিষাক্ত ময়লার পাহাড়’ অপসারণ করে সেখানে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি ও রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট) স্থাপনের জন্য খুলনাবাসী জোর দাবি জানিয়েছেন।