Home খেলাধুলা ‘স্বপ্ন দেখি একদিন জাতীয় দলে খেলব’

‘স্বপ্ন দেখি একদিন জাতীয় দলে খেলব’

1


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

পরিবারের আর্থিক অবস্থা মোটেও ভালো না। বাবা মো. সাইদুর রহমান পেশায় ভ্যানচালক। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে শামীমের অবস্থান দ্বিতীয়। নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতায় প্রতিভাবান ক্ষুদে এ বালককে এনেছে আলোচনায়। রাজশাহী বিভাগের হয়ে খেলেছেন মিস্ট্রি স্পিনার শামীম। আট উইকেট নিয়ে হয়েছেন টুর্নামেন্ট সেরা। গতকাল শুক্রবার নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে শামীম বলেন, ‘আমি আট উইকেট পেয়েছি, মনে হচ্ছিল, টুর্নামেন্ট সেরা হতে পারি। হয়েছি আলহামদুল্লিলাহ।’ জাতীয় ক্রিকেট দলের হোম ভেন্যু মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম। এখানেই ফাইনাল ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সাকিব, তামিম, মাশরাফিদের ড্রেসিংরুমে বসতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান ভাবছেন শামীম। তিনি বলেন, ‘আলহামদুল্লিলাহ ভালো লাগছে। একসময় টিভিতে খেলা দেখেছি। বলেছি একদিন ওই মাঠে (মিরপুর) খেলব। আজ সুযোগ হয়েছে এ মাঠে খেলার। এজন্য খুব ভালো লাগছে। এখন স্বপ্ন দেখি একদিন জাতীয় দলে খেলব।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে মুন্সি হযরত আলী উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শামীম। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা। বল হাতে নিজের ক্যারিশমা দেখাতেন নিয়মিত। একদিন একাডেমির খোঁজ পেলেন। সেখানে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নিজের স্বপ্নের পরিধি আরও ডালপালা মেলেছে তার। একাডেমির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকেই তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন বলে জানিয়েছেন শামীম। তিনি বলেন, ‘আমি বল করতাম। জানতাম না একাডেমি আছে। তারপর একাডেমির খোঁজ পেলাম। এনকেএসপি। প্রতিষ্ঠাতা শাহীন স্যার। তিনি অনেক কষ্ট করে একাডেমিটা চালান। খুব ছোট্ট একাডেমি। সেখানে যাওয়ার পর বলল এভাবে বলটা করো, ভালো হবে।’ শামীমের নিজের প্রতি অগাধ বিশ^াস রয়েছে। বিভাগ পর্যায়ের প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়লেও কখনো মন খারাপ হয়নি তার। তিনি জানতেন, একদিন নিজেকে ঠিকই প্রমাণ করতে পারবেন। বলেন, ‘জেলা পর্যায়ে খেলেছি। তারপর বিভাগে ডাক পেয়ে বাদ পড়েছিলাম। তবে মন খারাপ করিনি। নিজেকে বলেছি, সমস্যা নেই। পরে আবার হবে। এখন জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত এসেছি। টুর্নামেন্ট সেরাও হয়েছি। আলহামদুল্লিলাহ খুব ভালো লাগছে।’ বাবা ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। অভাব-অনটন থাকলেও শামীম জানান, তার পিতার চেষ্টার কোনো কমতি থাকে না। তিনি বলেন, ‘যতটুকু পেরেছে সাপোর্ট করেছে। তার (বাবা) কষ্ট হয়। কিন্তু আমাকে কষ্টটা বুঝতে দেয় না। আমার বড় ভাইও সবসময় পাশে থাকে। নিজেরা যেখান থেকে পারে আমাকে দেয়। আমি একদিন তাদের কষ্ট দূর করব জাতীয় দলে খেলে।’ শামীম জানান, তিনি সুনিল নারিনের খেলা পছন্দ করেন। তার বোলিং অ্যাকশন দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সুনিল নারিনকে অনুসরণ করি। কলকাতায় ওর খেলা দেখতাম। সুনিল নারিনকে আমার ভালো লাগে। তার মতো বল করি। ওকে এখনো অনুসরণ করি, সবসময়ই করব।’ নারিন ছাড়া তার পছন্দের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। বলেন, ‘বাংলাদেশে সাকিব আল হাসানকে ভালো লাগে। যে যাই বলুক, আমি সাকিবকে পছন্দ করি।’ নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতায় ভালো করা ক্রিকেটারদের নিয়ে দুই মাসের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন করবে বিকেএসপি। শামীমের চোখ এখন সেদিকেই। এই ক্যাম্পে নিজেকে মেলে ধরতে চান তিনি। শামীম বলেন, ‘বিকেএসপিতে সুযোগ পেলে আমার কষ্টটা আর হবে না।’ শামীম জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামার স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমি নিজেকে জাতীয় দলে দেখতে চাই।’ শিষ্যর সাফল্য দেখে চোখে জল ধরে রাখতে পারেননি গুরু দেবাশীষ। নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতায় বালক ক্রিকেট দলের ফাইনালে রংপুরকে বৃষ্টি আইনে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রাজশাহী। শামীম টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার পেয়েছেন। ম্যাচশেষে প্রিয় শিষ্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন দেবাশীষ। তিনি বলেন, ‘শামীম একটা অ্যাকশনে বোলিং করত, দেখতাম যে সুনিল নারিন অ্যাকশনে বোলিং করছে ও। তখন আমি তাকে বলেছিলাম, এভাবে বোলিং করে যাও, ভবিষ্যতে তোর কাজে লাগবে। কারণ বিশ^ খুঁজে ব্যতিক্রম কিছু। তোর মধ্যে সেটা আছে।’ দেবাশীষ জানান, তারা সবসময়ই শামীমকে আগলে রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘শামীম অনেক কষ্ট করে। তার বাবা রিকশাচালক। শামীমকে কখনোই খারাপ সময়টা আমরা বুঝতে দেয়নি। তার পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড বা অনেক কিছু আছে। আমাদের একাডেমির যারাই আছে, সবাই সবসময় শামীমের পাশে আছে। একটা কথা সবসময় বলেছি, শামীম নিয়মিত পরিশ্রম করে যা। একজন আছে উপরে।’ দেবাশীষের চাওয়া এখন একটাই- শামীম যেন বিকেএসপিতে সুযোগ পাই। এতে করে সে তার পরিবারের কষ্ট দূর করতে পারবে। তিনি বলেন, ‘শামীমের একটা সুযোগ এখানে ছিল জাতীয় পর্যায়ে খেলার। খেলেছে। এখন সামনে একটা পথ আছে, হয়তো বিকেএসপির ক্যাম্পে। আমি চাইব, শামীম যেন সেখানেও ভালো করে বিকেএসপিতে জায়গা করে নেয়। বিকেএসপিতে জায়গা পেলে তার পরিবারের যে সমস্যাটা ছিল বা আছে, তা হয়তোবা আর হবে না। সরকারের সহযোগিতায় শামীম বাংলাদেশের একটা ভালো খেলোয়াড় হতে পারে।’ কোচের প্রতি কৃতজ্ঞ শামীম নিজেও। তিনি বলেন, ‘আমার কোচ আমার জন্য অনেক কিছু করেছে। আমাকে কোনো সময় কষ্ট বুঝতে দেয়নি। সাহায্য লাগলে সাহায্য দেবে। ভালোভাবে আমাকে অনুশীলন করায়। সবসময় আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো দেখে। আমি জাতীয় দলে খেলব এবং সবার মুখ উজ্জ্বল করব।’