চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি।।
সৌদি আরবে ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের প্রলোভনে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার পাঁচটি পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ২৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি দালালচক্রের বিরুদ্ধে। কাজের ভিসার আশ্বাস দিলেও চারজনকে টুরিস্ট ভিসায় সৌদি পাঠানো হয়।
সেখানে গিয়ে তারা চাকরি না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। আর এসব অভিযোগ উঠেছে দর্শনা থানাধীন জিরাট বাগানপাড়া গ্রামের মিনু খাতুন ও তার সহযোগী দামুড়হুদা উপজেলার বক্কর মাস্টারের ছেলে মো. সবুজের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কাজের ভিসার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে চারজনকে টুরিস্ট ভিসায় সৌদি আরব পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের বিভিন্ন কফিলের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রতিশ্রুত চাকরি, নিয়মিত বেতন কিংবা পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরে জরিমানার অজুহাতে আরও ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিদেশে থাকা ব্যক্তিরা বেতন না পেয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। অন্যদিকে দেশে থাকা পরিবারগুলো বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যাংক, এনজিও ও বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যরা বিদেশে আটকে থাকায় স্বজনরা অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
সৌদি আরবে অবস্থানরত ভুক্তভোগী রুবেল, আজানুরসহ তিনজন ভিডিও বার্তায় বলেন, এখানে এনে বিভিন্ন কফিলের (সৌদির স্থানীয়) কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে। কোনো বেতন দেওয়া হয় না। একবেলা খেয়ে, না খেয়ে বেচে আছি। দেশে ফিরতেও পারছি না। বাচার জন্য অন্যত্র চলে এসেছি। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতারণার শিকার হয়েছেন জিরাট বাগানপাড়া গ্রামের এজের আলীর ছেলে রুবেল (৩৫), আকবর আলীর ছেলে আজানুর (৪০), আয়ুব আলীর ছেলে আবু সাইদ ওরফে পিন্টু (৩৬), কাতব আলীর ছেলে সুরুজ (৪০) এবং মো. সাদির ছেলে সজিব। সজিব বলেন, গ্রামের চারজনের দুরবস্থা দেখে তিনি শেষ পর্যন্ত বিদেশে যাননি। তবে বিদেশ পাঠানোর নামে আগেই তার কাছ থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় গত ৫ জুলাই দর্শনা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন সজিব উদ্দীন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, প্রায় সাত মাস আগে মিনু খাতুন বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সজিবের কাছ থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং অপর চারজনের পরিবারের কাছ থেকে প্রথমে জনপ্রতি ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা, পরে জরিমানা কথা বলে সে বাবদ আরও ৩০ হাজার টাকা করে এবং অন্যান্য খরচের নামে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে প্রায় ২৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পরে চারজনকে সৌদি আরব পাঠানো হলেও সেখানে কোনো বৈধ কর্মসংস্থান ছিল না।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তারা টুরিস্ট ভিসায় যাওয়ায় বর্তমানে আইনি জটিলতায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। টাকা ফেরত বা সমস্যার সমাধান চাইলে অভিযুক্তরা হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মিনু খাতুন মোবাইল ফোনে বলেন, তারা আমার কাছে এসেছিল। আমার মাধ্যমে টাকা-পয়সার লেনদেন হয়েছে। বিদেশ ভাগ্যের ব্যাপার, কার কপালে কী আছে সেটা তো বলতে পারব না। যেখানে পাঠিয়েছিলাম, সেখান থেকে তারা পালিয়ে গেছে।
বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর বৈধ লাইসেন্স আছে কি না জানতে চাইলে তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, বিষয়টি দামুড়হুদার বক্কর মাস্টারের ছেলে সবুজ দেখেছেন। অভিযোগ অস্বীকার করে মো. সবুজ বলেন, আপনি আমাদের খুব ডিস্টার্ব করছেন। মিনু আপার বাড়িতে কেন গিয়েছেন? তিনি পর্দাশীল মহিলা। আমাদেরকে হয়রানি করছেন, আমরা শুধু মাধ্যম। যা করার ঢাকা থেকে আল আমিন ভাই করেন। বিষয়টি নিয়ে মামলাও চলছে। বৈধ রিক্রুটিং লাইসেন্সের বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট তথ্য দেননি। তবে ঢাকার আল আমিনের বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। যার ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে থানায় ডেকে বসানো হয়েছিল। তবে সমঝোতা না হওয়ায় তাদের আদালতের মাধ্যমে আইনগত প্রতিকার নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে একটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির বাইরে দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।









































