Home আঞ্চলিক আবু কাজী: সততা, দ্রোহ ও নিবেদিত সাংবাদিকতার এক অনন্য বাতিঘর

আবু কাজী: সততা, দ্রোহ ও নিবেদিত সাংবাদিকতার এক অনন্য বাতিঘর

8


মিজানুর রহমান মিলটন।।


কিছু মানুষ জন্মান কেবল সমাজকে আলো ছড়াতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে আর নিজের জীবনকে অন্যের কল্যাণে বিলিয়ে দিতে। ক্ষমতার বৈভব, বিত্তের মোহ কিংবা সস্তা জনপ্রিয়তার স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া যেখানে সমাজের চেনা চিত্র, সেখানে ব্যতিক্রমী এক আলোকবর্তিকা আবু কাজী (সাহিত্য রত্ন)। তিনি একাধারে একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কালজয়ী সাহিত্যিক (কবি), আপসহীন রাজনীতিক এবং একনিষ্ঠ মানবাধিকার সংগঠক। বহুমাত্রিক এই মানুষটির গোটা জীবনই যেন এক অবিরাম সংগ্রামের মহাকাব্য। দেশ ও দশের কল্যাণে, বিশেষ করে অবদমিত ও শোষিত মানুষের পক্ষে তাঁর কণ্ঠস্বর কখনো রুদ্ধ হয়নি। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার উপকূলীয় জেলা থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে অনন্য আলো ছড়ানো এই ব্যক্তিত্বের জীবনগাথা আজন্ম সততা, দ্রোহ এবং ত্যাগের এক জীবন্ত ইশতেহার।


জন্ম, বংশমর্যাদা ও পারিবারিক আবহ: ১৯৫৭ সালের ১১ই জুলাই; স্বাধীনতাকামী বাংলার এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত, ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহ্যমণ্ডিত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন। তাঁর পুরো নাম কাজী আবু সাঈদ মুহাম্মদ সুফিউল্লাহ্ ফারুকী হলেও, বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ‘আবু কাজী’ নামেই সমধিক পরিচিত ও বরণীয়।


আবু কাজীর পারিবারিক প্রেক্ষাপট ও রক্তধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর সমাজমনস্কতা এবং দ্রোহী চেতনার ভিত্তি গড়ে উঠেছিল সুদূর শৈশবেই, তাঁর নিজ গৃহের আঙিনায়। তাঁর পিতা আলহাজ্ব মৌলভী কাজী শহীদুল্লাহ্ ফারুকী (র.) ছিলেন বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক, অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথপ্রদর্শক এবং একজন অনন্য শিক্ষাবিদ। সমাজ থেকে কুসংস্কার ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে তাঁর পিতা যে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তা এই অঞ্চলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। আবু কাজীর মাতার নাম আলহাজ্ব হোসনে আরা ফারুকী, যিনি ছিলেন মমতাময়ী এবং উচ্চ নৈতিক গুণসম্পন্ন এক মহীয়সী নারী। পিতার সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াইয়ের রক্ত এবং মায়ের সুশিক্ষা-এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে আবু কাজীর মনন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের যে দীক্ষা তিনি শৈশবে পরিবার থেকে পেয়েছিলেন, তা-ই পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।


শৈশবের সাহিত্যিক মনন ও তারুণ্যের অগ্নিগর্ভ রাজনীতি: আবু কাজীর মেধার স্ফুরণ ঘটেছিল অতি অল্প বয়সেই। যখন সমবয়সী অন্যান্য শিশুরা কেবল খেলাধুলায় মত্ত, তখন তাঁর হাত ধরে জন্ম নিচ্ছিল কবিতার পংক্তিমালা। স্কুল জীবনেই তাঁর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটে। চারপাশের প্রকৃতি, গ্রামীণ মানুষের যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখ এবং সমাজের বৈষম্য তাঁর কিশোর মনকে নাড়া দিত, যা তিনি রূপ দিতেন তাঁর ডায়েরির পাতায় ও লিটল ম্যাগের লেখায়।


স্কুল জীবনের সেই সাহিত্যিক মনন যখন কলেজ জীবনে পদার্পণ করে, তখন তা এক বিশাল ক্যানভাসে রূপ নেয়। আশির দশকের সেই উত্তাল সময়ে কলেজ জীবনে পা রেখেই তিনি সমাজকে বদলে দেওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকতা ও রাজনীতির মূল স্রোতে। স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার, প্রখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক ও তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের দর্শনে গভীরভাবে উজ্জীবিত হন তিনি। সিরাজুল আলম খানের আদর্শের একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে তিনি নিজেকে রাজনীতির ময়দানে সঁপে দেন। তাঁর রাজনীতি ছিল শোষিতের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি, তাঁর রাজনীতি ছিল মেহনতি মানুষের মুক্তির ইশতেহার। ফলে কেবল নিজের জেলা বা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলেই নয়, বরং জাতীয় পর্যায়েও তিনি প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে এক চেনা মুখে পরিণত হন।


সাংবাদিকতায় জীবন উৎসর্গ: আপসহীন লড়াই ও বারবার চাকরিচ্যুতি: আবু কাজীর জীবনের মূল এবং সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়টি রচিত হয়েছে সাংবাদিকতার আঙিনায়। সাংবাদিকতাকে তিনি কেবল জীবিকা বা পেশা হিসেবে নেননি; নিয়েছেন এক পবিত্র ব্রত ও নিবেদিতপ্রাণ যুদ্ধ হিসেবে। সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে এবং সত্যের পক্ষে অবিচল থাকতে গিয়ে এই পথ তাঁর জন্য কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না।


আমাদের দেশের সাংবাদিকতার জগতে যেখানে আপসকামিতা ও কর্পোরেট লেজুড়বৃত্তির ভিড়, সেখানে আবু কাজী এক জ্বলজ্বলে ব্যতিক্রম। তিনি সর্বদা বঞ্চিত, শোষিত, নির্যাতিত এবং নিগৃহীত সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে থেকেছেন সম্মুখভাগে। ইউনিয়ন ও পেশাগত আন্দোলনে তাঁর বজ্রকণ্ঠ মালিকপক্ষ ও নীতিনির্ধারকদের কাঁপিয়ে দিত। আর এই আপসহীন, অবাধ্য এবং প্রতিবাদী ভূমিকার কারণে তাঁকে জীবনের বহুবার চরম মূল্য চোকাতে হয়েছে। মালিকপক্ষের অন্যায় ফরমান বা অন্যায্য নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় তাঁকে অসংখ্যবার চাকরিচ্যুতির নির্মম কষ্ট, অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা সইতে হয়েছে।


কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াই লড়ে তিনি বীরের বেশে তাঁর প্রিয় কর্মস্থলে ফিরেছেন, কখনো আবার মাসের পর মাস কাটাতে হয়েছে বেকারত্বের চরম অন্ধকারে। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য জাদুবলে, এক অদম্য আত্মিক শক্তিতে তিনি তাঁর সততা, আত্মবিশ্বাস আর অদম্য মনোবল হারাননি কখনো। অভাবের দিনগুলোতেও কোনো লোভ-লালসা বা অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা তাঁকে তাঁর নীতি থেকে এক চুলও বিচ্যুত করতে পারেনি। নীতির প্রশ্নে তিনি বরাবরই হিমালয়ের মতো অনড়, অবিচল এবং আপসহীন।


নিভৃতচারী কলম, বহুমাত্রিক প্রতিভা ও অন্তর্মুখী জীবন: আবু কাজী একাধারে যেমন মাঠের লড়াকু সৈনিক, তেমনি টেবিলের শান্ত ও গভীর চিন্তক। অসাধারণ মেধার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি সব সময় এক ধরনের অন্তর্মুখী ও নিভৃতচারী জীবনযাপন করতে পছন্দ করেন। আজকের যুগে যেখানে সামান্য লিখেই অনেকে সস্তা জনপ্রিয়তা, প্রচার ও আত্মবিজ্ঞাপনের পেছনে অন্ধের মতো ছোটেন, সেখানে আবু কাজী সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। তিনি বিশ্বাস করেন, কাজই মানুষের আসল পরিচয়, ঢাকঢোল পিটিয়ে আত্মপ্রচার নয়।


তাঁর এই অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণেই তাঁর নামে বাজারে কাঁড়ি কাঁড়ি কিংবা শত শত চটকদার গ্রন্থ বের হয়নি। তিনি যা লিখেছেন, তা অত্যন্ত নিরেট, গবেষণাধর্মী ও সমাজমুখী। ১৯৯৮ সালে ঢাকার বিখ্যাত ‘স্বপ্নীল প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ও অন্যতম কালজয়ী গ্রন্থ ‘সংবাদ, সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা পরিচিতি’। গ্রন্থটি কেবল একটি বই নয়, বরং নবীন ও প্রবীণ সাংবাদিকদের জন্য পেশাগত দায়িত্ব পালনের এক অনন্য গাইডবই বা হ্যান্ডবুক। সাংবাদিকতার ব্যাকরণ, নৈতিকতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা এত চমৎকারভাবে এই গ্রন্থে ফুটে উঠেছে, যা আজও এই অঙ্গনের এক মূল্যবান ও আকর দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়। এর বাইরেও তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ, কবিতা ও কলাম বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, যা সংকলিত হলে বাংলা সাহিত্যের এক বিশাল ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে।


মানবাধিকার রক্ষা ও সমাজসেবামূলক কর্মতৎপরতা: সাংবাদিকতা ও রাজনীতির পাশাপাশি আবু কাজীর হৃদয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মানবাধিকার রক্ষা ও সমাজসেবা। রাষ্ট্রের বা সমাজের প্রভাবশালী মহলের দ্বারা যখনই কোনো সাধারণ মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তখনই আবু কাজী তাঁর লেখনী এবং সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে মজলুমের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি এই অঞ্চলের সীমান্ত হত্যা, নারী ও শিশু পাচার, এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে জনমত গড়ে তুলেছেন। সমাজসেবার ক্ষেত্রে তিনি প্রচারবিমুখ এক নিঃশব্দ সমাজকর্মী, যিনি বহু দরিদ্র শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া থেকে শুরু করে দুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সবসময় গোপনে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।


দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি ও সম্মাননার সুবাস: প্রচারবিমুখ এই মানুষটি নিজে কখনো সম্মানের পেছনে ছোটেননি, কিন্তু তাঁর কর্মের সুবাসকে তো আর চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখা যায় না। তাই সম্মাননা ও পদক নিজেই খুঁজে নিয়েছে এই গুণী মানুষকে। দেশ ও বিদেশের বহু মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য ও সামাজিক ফোরাম থেকে তিনি ভূষিত হয়েছেন নানা পদক ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায়।


• উদ্ভাস সাহিত্য পদক (১৯৮২): তাঁর তরুণ বয়সের সাহিত্যিক ও সাংবাদিকতা প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ খুলনা থেকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এই পদকটি লাভ করেন।
• জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা সম্মাননা ও পদক: দেশজুড়ে সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে অনন্য ও দীর্ঘমেয়াদী অবদানের জন্য জাতীয় পর্যায় থেকে তাঁকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
• পশ্চিমবঙ্গের বারাসাত সাহিত্য সম্মাননা ও পদক (২০১৬): ওপার বাংলার সাহিত্যিক মহলেও তাঁর লেখার গভীরতা সমাদৃত হয় এবং তিনি এই আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন।
• হরিণঘাটা বঙ্গসংস্কৃতি ডিএল রায় সম্মাননা ও পদক: ভারতের নদীয়া জেলার এই ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকে বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তাঁকে এই পদক দেওয়া হয়।
• জলঙ্গী সাহিত্যরত্ন সম্মাননা ও পদক: ওপার বাংলা থেকে প্রাপ্ত এই ‘সাহিত্য রত্ন’ উপাধি ও পদকটি তাঁর সাহিত্যিক জীবনের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন।
• ধানফুল সাহিত্য পদক ও বাদশাহ আকবর সাহিত্য সম্মাননা: খুলনার ডুমুরিয়া রায়পুরের বিখ্যাত ‘ধানফুল সাহিত্য পদক’ এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য ‘বাদশাহ আকবর সাহিত্য সম্মাননা পদক’ লাভ করেন।


নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ ও জীবন্ত ইশতেহার: আবু কাজীর এই সংগ্রামী, দ্রোহী এবং অনমনীয় কর্মজীবন বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের তরুণদের জন্য-বিশেষ করে যারা সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সমাজসেবাকে নিজেদের ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে চান, তাদের জন্য এক পরম অনুকরণীয় আদর্শ। বর্তমান যুগে যখন নীতি-আদর্শের চরম আকাল, যখন ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে অনেকেই সত্যকে মিথ্যার চাদরে ঢাকতে দ্বিধাবোধ করেন না, তখন আবু কাজী দেখিয়েছেন কীভাবে বুক ফুলিয়ে, মাথা উঁচু করে সততার সাথে বাঁচা যায়।


তিনি শিখিয়েছেন, চাকরি যেতে পারে, অভাব গ্রাস করতে পারে, কিন্তু নিজের কলম আর বিবেককে কখনো বিক্রি করা যায় না। আবু কাজী আজ কেবল একজন ব্যক্তির নাম নয়; তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক জীবন্ত ইশতেহার। তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে এই সমাজ ও রাষ্ট্র তাঁর দেখানো পথ থেকে আলো নিয়ে এগিয়ে যাবে-এটাই আজ শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা।