শামিম শিকদার।।
অফিসের অনুমোদন নেই, নেই সরকারের বাধ্যতামূলক অনাপত্তি পত্রও (এনওসি)। অথচ সরকারি চাকরির আইন-কানুনকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টানা ১০ দিন ( চলতি মাসের ১৬-২৫ তারিখ) বিদেশ সফর করেছেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী (মাস্টাররোল) অনুপম চক্রবর্তী। এখানেই শেষ নয়; ভারতে অবস্থানকালেও কেসিসির হাজিরা খাতায় উঠেছে তাঁর নিয়মিত স্বাক্ষর, এমনকি একধাপ এগিয়ে আজ বুধবার (২৯ জুলাই) অফিসে বসেই কালকের অর্থাৎ ৩০ জুলাইয়ের হাজিরা খাতায় অগ্রিম স্বাক্ষর করে রাখার মতো চরম জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি।
আইনের তোয়াক্কা নেই: সরকারি চাকরির স্পষ্ট আইন ও প্রশাসনিক বিধিমালা অনুযায়ী, স্বায়ত্তশাসিত বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের যেকোনো স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমোদন ও এনওসি (No Objection Certificate) গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।
এনওসি ছাড়া বিদেশ গমন প্রশাসনিক শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, কেসিসি থেকে কোনো অনুমতি বা এনওসি না নিয়েই গত ১৬ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ১০ দিন ভারতে অবস্থান করেন অনুপম চক্রবর্তী।

অনুপস্থিত থেকেও অগ্রিম হাজিরা স্বাক্ষর: সবচেয়ে নজিরবিহীন জালিয়াতি ঘটেছে হাজিরা খাতায়। অনুপম যখন ভারতে অবস্থান করছিলেন, তখনও হাজিরা খাতায় তাঁর স্বাক্ষর পড়ে নিয়মিত।
আজ ২৯ জুলাই অফিসে গিয়ে দেখা যায়, তিনি আগামী দিন অর্থাৎ ৩০ জুলাইয়ের ঘরেও অগ্রিম স্বাক্ষর সেরে রেখেছেন! একজন অস্থায়ী বা মাস্টাররোল কর্মচারীর এমন বেপরোয়া দুঃসাহসে ক্ষুব্ধ সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অবৈধ সম্পদের পাহাড় ও রাজনৈতিক চাটুকারিতা: অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের সরাসরি মদদে কেসিসিতে মাস্টাররোল পদে যোগ দেন অনুপম। খালেক তালুকদারের সাথে একই বাড়িতে ভাড়া থাকার সুবাদে এবং সেই রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে রাতারাতি বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক বনে যান তিনি। খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে তাঁর নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার আমানত ও গাড়ির মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনা ও তৎকালীন বিতর্কিত কাউন্সিলর টোনার ছবির সাথে নিজের ছবি জুড়ে দিয়ে কেসিসির ভেতরে টাঙিয়ে প্রভাব জাহির করতেন এই কর্মকর্তা। পটপরিবর্তনের পরও সাবেক মেয়রের সাথে গোপন তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগ রাখতেই তিনি গোপনে ভারতে যাতায়াত করছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি।
আইন ভেঙে মেজারমেন্ট বুক (এমবি) তৈরি: নিয়ম অনুযায়ী কোনো মাস্টাররোল কর্মচারী উন্নয়ন কাজের মেজারমেন্ট বুক (এমবি) লিখতে বা পাস করতে পারেন না। কিন্তু ওপর মহলের আশ্রয়ে কেসিসির ১, ৩ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের উন্নয়ন কাজসহ সিআরডিপি প্রজেক্টের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখে প্রতিনিয়ত বেআইনিভাবে মেজারমেন্ট বুক তৈরি করে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

অভিযুক্ত ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেন অনুপম চক্রবর্তী। এনওসি ছাড়া বিদেশ গমন প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, “মাস্টাররোল পদে কর্মরতদের বিদেশে যেতে কোনো এনওসি লাগে না।” আর ভারতে থেকেও হাজিরা খাতায় নিয়মিত ও অগ্রিম স্বাক্ষর করার বিষয়ে তিনি নির্লজ্জভাবে বলেন, “হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে কোনো বাধা নেই।”
বিষয়টি নিয়ে কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) রাজীব আহমেদ বলেন, “খুলনা সিটি কর্পোরেশনে কর্মরত যেকোনো ব্যক্তি বিদেশে যেতে চাইলে অবশ্যই কেসিসির এনওসি নিতে হবে। অনুপম চক্রবর্তীর ভারতে যাওয়ার বিষয়ে কেসিসি কিছুই জানে না।” বিদেশে অবস্থান করেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর ও অগ্রিম সইয়ের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, “কোনোভাবেই এটি সম্ভব নয়। অনুপম চক্রবর্তী যদি এমন অপরাধের সাথে জড়িত থাকেন, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সরকারি আইন লঙ্ঘন, নথি জালিয়াতি এবং জালিয়াতির মাধ্যমে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী এই দুর্নীতিবাজ মাস্টাররোল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন নগরবাসী।










































