মোহাম্মদ শাহ নওয়াজ।।
‘এই মানুষটি যদি আর পাঁচটি বছর বেঁচে থাকতেন, তাহলে বাংলাদেশ এক ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে যেত’- প্রায় ৪৫ বছর আগে সংঘটিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শেষ মুহুর্তগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আক্ষেপ করে এ মন্তব্য করেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়ার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক ও সেক্টর কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাতে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্যের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন মনে করেন, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।
মেধাবী শিক্ষাবিদ ও পরে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া প্রায় অশিতিপর এই অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন ছিলেন বিএনপি গঠনের আগে রাষ্ট্রপতি জিয়ার প্রথম রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘জাগদল’-এর চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক।
পরবর্তীতে তিনি জিয়ার মন্ত্রিসভায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি জিয়ার জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন।
অধ্যাপক আরিফ নিজে উদ্বুদ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বহু মানুষকে সংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করেন, যাতে তারা জিয়ার দর্শন ও তাঁর লালিত অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার চিন্তাধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। জিয়ার অর্থনৈতিক দর্শন ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি পরবর্তীতে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হন।
এর আগে অধ্যাপক আরিফ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
চট্টগ্রাম শহরের এক সম্ভ্রান্ত ও সুপরিচিত পরিবারে জন্ম নেওয়া আরিফ ছিলেন খ্যাতিমান আজিম ব্যারিস্টার (ব্যারিস্টার আনোয়ারুল আজিম)-এর পুত্র, যিনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য ছিলেন। তাঁর মা বেগম তোহফাতুন্নেসা যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে ১৯৫৪ সালে এমএলএ নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৮১ সালের ২৯ মে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম সফরে রাষ্ট্রপতি জিয়ার সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাটানো মুহুর্ত, কথোপকথন ও স্মৃতিচারণের অনুরোধ জানালে অধ্যাপক আরিফ সানন্দে ও স্বতঃস্ফুর্তভাবে তাতে সম্মতি জানান।
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে একটি ফোন পেয়ে আমি জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে যাই। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সেখানে গিয়ে দেখি, জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় সারিতে রয়েছেন জহিরউদ্দিন খান (১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী), ফজল করিম চৌধুরী (চট্টগ্রাম পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান), প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মওলানা আবু তাহের এবং ‘পিপলস ভিউ’-এর সম্পাদক নুরুল ইসলাম চৌধুরী।’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘সবার মধ্যে আমিই প্রথম তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (ডিসিএমএলএ) জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাই। এটিই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। সংক্ষিপ্ত পরিচয় পর্বের পর তিনি আমার সংসদীয় আসন সম্পর্কে জানতে চান এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করার পরামর্শ দেন। এরপর থেকে আমি প্রতি মাসে একবার তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতাম।’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ১৯৭৭ সালের ৩ অক্টোবর আমাকে বঙ্গভবনে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ডাকা হয়। সেখানে তিনি তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প- যশোরের উলশী-যদুনাথপুরের ‘স্বনির্ভর প্রকল্প’ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করেন এবং কয়েকজন ছাত্র ও যুবককে সঙ্গে নিয়ে প্রকল্পটি পরিদর্শনের পরামর্শ দেন। পরে আমি প্রায় ৩৫-৪০ জন ছাত্রকে নিয়ে সেখানে যাই এবং আমাদের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে তুলে ধরি।’
তিনি বলেন, ‘ওই বছরের শেষ দিকে জিয়ার লক্ষ্য ও দর্শনের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চট্টগ্রামের মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে ছাত্রদের এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করি।’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘সমাবেশের মঞ্চে আমরা ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’-এর ব্যানার টাঙিয়েছিলাম এবং প্রধান অতিথি হিসেবে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার।’
তিনি দাবি করেন, ‘আমরাই এ প্রথম ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’ নামটি ব্যবহার করি, যা পরবর্তীতে বিএনপির ছাত্রসংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।’
অধ্যাপক আরিফ স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়ার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর দেশে পরিণত করা, বিশেষ করে সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। এমনকি তিনি খাদ্যশস্য রপ্তানির স্বপ্নও দেখতেন।’
রাষ্ট্রপতি জিয়ার শেষ চট্টগ্রাম সফরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়ার চট্টগ্রাম সফরের কর্মসূচিটি বেশ তড়িঘড়ি করেই নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নির্ধারিত তারিখের মাত্র একদিন আগে, অর্থাৎ ২৮মে তৎকালীন বিএনপির দপ্তর সম্পাদক কর্নেল (অব.) আলাউদ্দিনের ফোনে আমি প্রথম সফরের বিষয়টি জানতে পারি। তিনি আমাকে পরদিন সকাল সাড়ে ৮টায় তৎকালীন টঙ্গী বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত থাকতে বলেন।’
সফরসঙ্গীদের মধ্যে তৎকালীন দলের মহাসচিব ডা. বি. চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা নির্ধারিত সময়ে বিশেষ বিমানে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্নেল মাহফুজ জিয়ার পাশের আসনে বসেছিলেন। সামনের দুটি আসন সরিয়ে সেখানে একটি ছোট টেবিল রাখা হয় এবং সিভিল পিএস সৈয়দ আমিনুর রহমান একের পর এক ফাইল এগিয়ে দিলে রাষ্ট্রপতি জিয়া সেগুলোতে স্বাক্ষর করতে শুরু করেন।
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘সকাল প্রায় ১০টার দিকে আমরা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পৌঁছি। সেখানে ওপরে লাউঞ্জে অপেক্ষমাণ রাষ্ট্রপতি জিয়া আমাকে ডাকেন। একপর্যায়ে তিনি কালো সানগ্লাস পরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন। দক্ষিণ দিকের বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা থেকে আসা মৃদু বাতাস তাঁকে স্পর্শ করছিল। হঠাৎ জিয়া আমাকে বললেন, ‘আরিফ, তুমি চট্টগ্রামে থাকো না কেন ? কী সুন্দর শহর! আমি চট্টগ্রামের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় একটি বাড়ি করতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ এফ এম ইউসুফ সেখানে উপস্থিত হন।
তখন রাষ্ট্রপতি জিয়া তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমার জন্য একটি জায়গা দেখুন, আমি এখানে থাকার জন্য একটি বাড়ি করতে চাই।’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর আমরা রাষ্ট্রপতি জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে শতবর্ষী ও অনন্য স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত উঁচু মিনারবিশিষ্ট চন্দনপুরা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করি। এটিও পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ ছিল না।’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘জুমার নামাজ শেষে আমরা সার্কিট হাউসে ফিরে আসি। সেখানে রাষ্ট্রপতি আমাকে ডাকেন এবং অন্যদের কাছ থেকে আমার সম্পর্কে শোনা একটি বিষয় নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করেন। আমি তাঁর প্রশ্নগুলোর জবাব দিই।’
তিনি আরও বলেন, ‘একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি আমাকে বলেন, ‘এসব বাদ দিন, সিরিয়াস রাজনীতি করুন।’
এরপর তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্যদের কাছে জানতে চান, তাঁরা আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে চান কি না।
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর রাষ্ট্রপতি জিয়া আমাকে তাঁর কক্ষে নিয়ে যান এবং কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘ওস্তাদ (সামরিক পরিভাষায় অনানুষ্ঠানিকভাবে সুবেদার মেজরকে সম্বোধনের একটি শব্দ), তাকে সমর্থন করবেন না।’
তবে রাষ্ট্রপতি জিয়া কাকে ইঙ্গিত করে এ কথা বলেছিলেন, সেই নামটি অধ্যাপক আরিফ প্রকাশ করেননি।
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘আমি তাকে সমর্থন করেছি, কারণ তিনি আপনার খুব ঘনিষ্ঠ।’
তখনই রাষ্ট্রপতি জিয়া বলেন, ‘আমার কাছে কেউ বিশেষ ঘনিষ্ঠ নয়, প্রত্যেককে তার মেধার ভিত্তিতে বিবেচনা করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাত প্রায় ১২টার দিকে রাষ্ট্রপতি আমাকে বিদায় জানান এবং দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আরিফ, বাসায় যান এবং ফোনের কাছে থাকবেন, আমি আবার আপনাকে ফোন করব।’
নিজের রাজনৈতিক গুরু রাষ্ট্রপতি জিয়ার সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গভীর বেদনায় অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন বলেন, ‘এটাই ছিল আমার প্রিয় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শেষ কথোপকথন। তিনি আর তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমাকে ফোন করতে পারেননি, কারণ ঘাতকরা একজন মহান আত্মা, এই মাটির এক সাহসী সন্তান এবং আধুনিক, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টার জীবন কেড়ে নিয়েছিল।’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘সেই বিভীষিকাময় কালো রাতে, শেষ পর্যন্ত রাত প্রায় ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে আমি ফোন পাই, তবে সেটি আমার রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে নয়, অন্য একজনের কাছ থেকে। হঠাৎ আমার শয়নকক্ষের টেলিফোন বেজে ওঠে। প্রথম ফোনটি আসে তৎকালীন বাগমনিরাম ওয়ার্ড কমিশনার মান্নানের কাছ থেকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর একের পর এক যেসব ফোন পাই, সেগুলোতে হয় সার্কিট হাউসে ব্যাপক গোলাগুলির খবর জানানো হচ্ছিল, নয়তো আগের রাতে সেখানে কী ঘটেছে সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হচ্ছিল।’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘রাত প্রায় ২টার পর থেকে ঝড়ো হাওয়াসহ প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। ভোর প্রায় ৫টার দিকে আমি সার্কিট হাউসের উদ্দেশে রওনা হই। তখনও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। সার্কিট হাউস থেকে কয়েক গজ দুরে কাজীর দেউড়ি মোড়ে এক পুলিশ সার্জেন্ট আমাকে আটকে দেন, তবে মুহুর্তের মধ্যেই তিনি আমাকে চিনতে পেরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রধান ফটকে পৌঁছে দেখি, সব গেট খোলা এবং সব নিরাপত্তাকর্মী (দারোয়ান) দরবার হলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সাধারণত প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা সেই স্থাপনাটির চারপাশে তখন ছিল অস্বাভাবিক নীরবতা, যেন এক ভৌতিক পরিবেশ।’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘প্রধান ফটকে গিয়ে আমি তৎকালীন সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের ডিএসপি ইফতেখারকে দেখতে পাই। তিনি আমাকে সঙ্গে সঙ্গে অনুরোধ করে বলেন, ‘স্যার, এখান থেকে চলে যান, রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর তৎকালীন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থলে এসে আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘স্যার, এসব কীভাবে ঘটল?’ দুই পুলিশ কর্মকর্তা বারবার আমাকে সেখান থেকে চলে যেতে অনুরোধ করে বলেন, ‘স্যার, তারা (বিদ্রোহী সেনাসদস্যরা) ফিরে এলে আপনাকেও হত্যা করবে।’
অধ্যাপক আরিফ জানান, ‘কয়েক মিনিট পর আমি দরবার হলের সামনে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্নেল মাহফুজকে স্থানীয় কয়েকজন শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস সেখানে এসে থামে এবং সেখান থেকে দুজন আলোকচিত্রী নেমে আসেন।’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘এরপর আমি দেখি, তৎকালীন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা চট্টগ্রাম ক্লাবের দিক থেকে ধীরে ধীরে সার্কিট হাউসের দিকে হেঁটে আসছেন। কাছে এসে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আরিফ, কী হয়েছে?’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘আমি উত্তরে বললাম, ‘রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে।’ তখনই তিনি মন্তব্য করেন, ‘তাহলে বিচারপতি সাত্তার বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন।’
অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘তাঁর তাৎক্ষণিক মন্তব্য শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। কারণ, তাঁর মুখে আমি কোনো উদ্বেগ বা শোকের ছাপ দেখিনি; এমনকি তিনি ‘ইন্না লিল্লাহ….’ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর তিনি আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যে গাড়িতে এসেছিলেন, সেটিতে করেই ঢাকা রওনা হন এবং আমাকে চট্টেশ্বরী রোডে রাসুল নিজামের বাসায় নামিয়ে দেন। পরে আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী ও তার আরেক ভাই আমাকে সেখান থেকে নিয়ে যান তাদের মেহেদীবাগের বাসভবনে। বাসভবনটি ছিল বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মরহুম মাহমুদুন্নবী চৌধুরীর, যিনি বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পিতা।’
অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে রাষ্ট্রপতি জিয়া ছিলেন শতভাগ সৎ। সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে তাঁর ডিওএইচএসে ১০কাঠার একটি আবাসিক প্লট পাওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি তাঁর মতো এত সাধারণ ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনকারী মানুষ খুব কমই দেখেছি।
তিনি অকল্পনীয়ভাবে সহজ জীবন যাপন করতেন। তাঁর পরিধানের জন্য ছিল মাত্র তিন সেট সাফারি স্যুট- সাদা, ধূসর ও ক্রিম রঙের।’
শোনা যায়, তিনি যে সাফারি স্যুট পরতেন, তা সারাদিন ব্যবহার করার পর রাতে ধুয়ে নিতেন এবং সার্কিট হাউসের রুমের ফ্যানের বাতাসে শুকিয়ে সকালে আবার তা পরতেন।
তিনি প্রায় ২৪ ঘণ্টাই কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকতেন; রাতের বেলা কখন তিনি ঘুমাতেন, তা কারো পক্ষে নির্দিষ্ট করে জানা ছিল কঠিন। তিনি ছিলেন একেবারেই কর্মনিষ্ঠ ও কাজপাগল মানুষ ‘কোনো কাজকে জরুরি মনে করলে তা সঙ্গে সঙ্গেই সম্পন্ন করার চেষ্টা করতেন এবং সময় নষ্ট করতেন না।’
অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন বলেন, ‘বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশ্বখ্যাত নেতারা রাষ্ট্রপতি জিয়াকে কতটা ভালোবাসতেন ও সম্মান করতেন, তা কল্পনাও করা যায় না।’
তিনি রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হিসেবে উত্তর কোরিয়া সফরের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে এ মন্তব্য করে বলেন, তৎকালীন উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি কিম ইল-সুং তার ক্ষমতায় আরোহণের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। উক্ত সাড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে ১১১টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
অধ্যাপক আরিফ স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমাদের শেষ সফর পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াকে অসাধারণ সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তিনি (জিয়া) মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রয়াত জিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তিনি গিনি প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ড. আহমেদ সেকে তুরে-র সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেন এবং জাপানকে পরাজিত করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন মত প্রকাশ করে বলেন, ‘৩০ মে রাতে জিয়াকে হত্যার ঘটনায় অংশ নেওয়া সেনাসদস্যরা মূলত একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এটি ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র।’
অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন বলেন, ঐতিহাসিক সেই ট্র্যাজেডির ১০ বছর পর ১৯৯১ সালে তৎকালীন যুবলীগ নেতা (১৯৭৮-১৯৮২) প্রয়াত কামাল; যিনি ‘শহরের প্রখ্যাত ‘চিম্বুক রেস্তোরাঁ’র মালিক হিসেবে ‘চিম্বুক কামাল’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে একটি তথ্য আমার সঙ্গে শেয়ার করেন।
কামাল আমাকে জানান, ২৯ মে সকালে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর খালেদ থেকে তিনি এ সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছিলেন।
অধ্যাপক আরিফ কামালের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘মেজর খালেদ আমাকে ঐদিন অর্থাৎ ২৯মে সকালে বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানাতে।
কামাল, তুমি কাউকে বলো যেন রাষ্ট্রপতি জিয়াকে চট্টগ্রাম আসা থেকে বিরত রাখা হয়, কারণ তাঁকে হত্যা করা হবে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা যথাসময়ে জিয়ার কাছে পৌঁছায়নি।
কারণ, কামাল কাউকে এ তথ্য জানিয়েছিলেন কিনা আমাকে নির্দিষ্ট করতে পারেননি।’
আমি কামালকে তীব্র হতাশা নিয়ে জিজ্ঞেস করি, তিনি কেন এমন একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাকে জানাননি। কামাল নিচু স্বরে অস্পষ্টভাবে কিছু বলেন, তবে তিনি কারও নাম উল্লেখ না করেই তথ্যটি শেয়ার করেন বলে জানান।
অধ্যাপক আরিফের ভাষায়, ‘এমন একজন দূরদর্শী নেতার হত্যাকাণ্ডের পেছনের পরামর্শদাতা, উসকানিদাতা, পরিকল্পনাকারী এবং প্রকৃত উদ্দেশ্য আজও রহস্যাবৃত রয়ে গেছে।’-বাসস









































