মোস্তফা জামাল পপলু।।
খুলনা মহানগরী এলাকায় মশার কামড় থেকে বাঁচতে আপনি কি ঘরে কয়েল জ্বালাচ্ছেন? তবে সাবধান! আপনি হয়তো মশার চেয়েও বড় শত্রুকে ঘরে ডেকে আনছেন| খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের এক গবেষণায় উঠে এসেছে পিলে চমকানো তথ্য—একটি মশার কয়েল থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া প্রায় ৭৫ থেকে ১৩৭টি সিগারেটের সমান ক্ষতি করছে মানবদেহে| এই বিষাক্ত কুণ্ডলীতে আটকে পড়ে খুলনার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বস্তিবাসী ও নিম্নআয়ের মানুষ এখন এক দীর্ঘমেয়াদি ¯^াস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে| একদিকে মশার উপদ্রব, অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) অকার্যকর ভূমিকা; সব মিলিয়ে খুলনাবাসীর জীবন এখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন|
গবেষণার তথ্যমতে, খুলনার রূপসা ও রেলওয়ে বস্তি এলাকার প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ কয়েল ব্যবহার করেন| সস্তা কয়েলে থাকা পাইরেথ্রয়েড ও ডি-অ্যালথ্রিনের মতো রাসায়নিক উপাদানগুলো দীর্ঘক্ষণ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুসকে চিরতরে অকেজো করে দিচ্ছে| এর ফলে বাসিন্দারা শুধু কাশি বা হাঁপানিতেই ভুগছেন না, বরং নিউমোনিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত| গবেষকদের মতে, বদ্ধ ঘরে কয়েল জ্বালানো মানে হলো ¯ে^চ্ছায় নিজের ফুসফুসকে বিষাক্ত গ্যাসে ডুবিয়ে রাখা| নগরবাসী যখন কয়েলের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে ভুগছেন, তখন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) মশা নিধন কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে|
কেসিসির তথ্য বলছে, মশা নিধনে কেসিসি ২০২০-২১ অর্থ বছরে ৩৯ লাখ ৪১ হাজার ৯ টাকা, ২০২১-২২ অর্থ বছরে ১০ লাখ ৮৩ হাজার ৪ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬১ লাখ ২১ হাজার ২১৩ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ২১ লাখ ৭১ হাজার ৮২৯ টাকা ও ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ১৭ লাখ ১৮ হাজার ৯৮৮ টাকা ব্যয় করেছে| অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা খাতে ২০২০-২১ অর্থ বছরে ৩ কোটি ৭৭ লাখ ২২ হাজার ৩৯২ টাকা ২০ পয়সা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ কোটি ৪৪ লাখ ৪ হাজার ৭৯৬ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ কোটি ২১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮ কোটি ৮২ লাখ ৮ হাজার ৫২৩ টাকা ২৫ পয়সা এবং ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৬ কোটি ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ২২৫ টাকা ২৫ পয়সা ব্যয় করেছে|
অপরদিকে, মশা মারতে ৫ বছরে কেসিসি মোট ১ কোটি ৫০ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩ টাকা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৩৫ কোটি ৫৬ লাখ ৪০ লহাজার ৯৫৫ টাকা ৭০ পয়সা ব্যয় করেছে| মশা নিধনে ও মশার আবাসস্থল ধ্বংস করতে এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং শতাধিক ফগার ও লার্ভিসাইড স্প্রে মেশিন থাকার কথা থাকলেও, রাজপথ ছাড়া অলিগলি বা বস্তি এলাকায় তাদের উপস্থিতি নামমাত্র| যান্ত্রিক ত্রুটি আর জ্বালানি সংকটের অজুহাতে অধিকাংশ সময় মেশিনগুলো পড়ে থাকে গ্যারেজে|
নগরবাসী বলছে, এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে অব্যবস্থাপনা ও অকার্যকর ওষুধ| কোটি টাকা খরচ করেও মশা না কমার পেছনে তিনটি বড় ঘাটতি পাওয়া গেছে| প্রথমত, নগরীর ড্রেন ও খালগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় সেগুলো এখন মশার ‘নার্সারি’তে পরিণত হয়েছে| দ্বিতীয়ত, মশা মারতে যে লার্ভিসাইড ব্যবহার করা হচ্ছে তার মান নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে; ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের সংমিশ্রণে ˆতরি ওষুধ অনেক ক্ষেত্রেই মশার বংশবিস্তার রোধে ব্যর্থ হচ্ছে| তৃতীয়ত, সঠিক তদারকির অভাবে কর্মীরা প্রধান সড়কগুলোতে ধোঁয়া দিয়েই দায় সারছেন, যার ফলে মশার মূল উৎসগুলো রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে|
মশা শুধু রক্তই চুষছে না, শুষে নিচ্ছে দরিদ্র মানুষের কষ্টার্জিত অর্থও| গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, মশা ও কয়েলের ধোঁয়াজনিত বয়সে আক্রান্ত হয়ে বস্তি এলাকার ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত একজন মানুষ বছরে গড়ে ৫০ দিন কাজ করতে পারেন না| এতে তাদের বছরে গড় চিকিৎসা খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার টাকারও বেশি| অর্থাৎ, কেসিসির মশা দমনে ব্যর্থতা খুলনার জনগোষ্ঠীর ওপর এক বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে|
কেসিসির কনজারভেন্সি অফিসার মো. আনিসুর রহমান সাম্প্রতিক সময়ে জিআইজেডের গবেষণায় অংশগ্রহণ করে দাবি করেছেন, তাঁরা নগরী পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সব ধরনের কাজ করে যাচ্ছেন| তবে নগরবাসী যত্রতত্র ড্রেনে ময়লা ফেলায় পানি জমে মশার উপদ্রব বাড়ছে| পাশাপাশি জনবল সংকট থাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে| নগরীর ওয়ার্ডগুলোতে প্রতিদিন কী পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হয় এবং কী পরিমাণ কালেকশন করে সেকেন্ডারি ও চূড়ান্ত ডাম্পিং স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে, তার জরিপ চলছে| বর্তমান বর্জ্য পুনঃব্যবহারের যে প্রকল্প চলছে তা চালু হলে বর্জ্য সংকট ও মশার উপদ্রব কমবে বলে দাবি করেন তিনি|
জন¯^াস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট থেকে বাঁচতে কেসিসিকে কেবল ‘ধোঁয়া দেওয়া’র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন একটি সমšি^ত মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা| পাশাপাশি নালা-নর্দমার পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করে মশার প্রজনন উৎস ধ্বংস করতে হবে| মানহীন ও ক্ষতিকর কয়েলের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনসচেতনতা বাড়িয়ে কয়েলের পরিবর্তে মশারির ব্যবহার উৎসাহিত করা প্রয়োজন| সময় এসেছে বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে বেরিয়ে আসার|
সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপ আর নাগরিক সচেতনতাই পারে খুলনার ফুসফুসকে পুনরায় সতেজ করতে| অন্যথায়, কেসিসির আশ্বাস বাস্তবায়িত হতে হতে এই বিষ একদিন পুরো শহরের জন¯^াস্থ্য ধ্বংস করে দেবে এবং বিশুদ্ধ বাতাস গ্রহণের জন্য খুলনা মহানগরবাসীর আর কোনো সুস্থ ফুসফুস অবশিষ্ট থাকবে না|









































