Home Lead মশার কয়েলে বিপন্ন খুলনাবাসীর ফুসফুস: মশক নিধনে ৫ বছরে কেসিসির ব্যয় ৩৭...

মশার কয়েলে বিপন্ন খুলনাবাসীর ফুসফুস: মশক নিধনে ৫ বছরে কেসিসির ব্যয় ৩৭ কোটি!

39


মোস্তফা জামাল পপলু।।


খুলনা মহানগরী এলাকায় মশার কামড় থেকে বাঁচতে আপনি কি ঘরে কয়েল জ্বালাচ্ছেন? তবে সাবধান! আপনি হয়তো মশার চেয়েও বড় শত্রুকে ঘরে ডেকে আনছেন| খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের এক গবেষণায় উঠে এসেছে পিলে চমকানো তথ্য—একটি মশার কয়েল থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া প্রায় ৭৫ থেকে ১৩৭টি সিগারেটের সমান ক্ষতি করছে মানবদেহে| এই বিষাক্ত কুণ্ডলীতে আটকে পড়ে খুলনার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বস্তিবাসী ও নিম্নআয়ের মানুষ এখন এক দীর্ঘমেয়াদি ¯^াস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে| একদিকে মশার উপদ্রব, অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) অকার্যকর ভূমিকা; সব মিলিয়ে খুলনাবাসীর জীবন এখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন|


গবেষণার তথ্যমতে, খুলনার রূপসা ও রেলওয়ে বস্তি এলাকার প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ কয়েল ব্যবহার করেন| সস্তা কয়েলে থাকা পাইরেথ্রয়েড ও ডি-অ্যালথ্রিনের মতো রাসায়নিক উপাদানগুলো দীর্ঘক্ষণ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুসকে চিরতরে অকেজো করে দিচ্ছে| এর ফলে বাসিন্দারা শুধু কাশি বা হাঁপানিতেই ভুগছেন না, বরং নিউমোনিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত| গবেষকদের মতে, বদ্ধ ঘরে কয়েল জ্বালানো মানে হলো ¯ে^চ্ছায় নিজের ফুসফুসকে বিষাক্ত গ্যাসে ডুবিয়ে রাখা| নগরবাসী যখন কয়েলের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে ভুগছেন, তখন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) মশা নিধন কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে|


কেসিসির তথ্য বলছে, মশা নিধনে কেসিসি ২০২০-২১ অর্থ বছরে ৩৯ লাখ ৪১ হাজার ৯ টাকা, ২০২১-২২ অর্থ বছরে ১০ লাখ ৮৩ হাজার ৪ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬১ লাখ ২১ হাজার ২১৩ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ২১ লাখ ৭১ হাজার ৮২৯ টাকা ও ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ১৭ লাখ ১৮ হাজার ৯৮৮ টাকা ব্যয় করেছে| অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা খাতে ২০২০-২১ অর্থ বছরে ৩ কোটি ৭৭ লাখ ২২ হাজার ৩৯২ টাকা ২০ পয়সা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ কোটি ৪৪ লাখ ৪ হাজার ৭৯৬ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ কোটি ২১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮ কোটি ৮২ লাখ ৮ হাজার ৫২৩ টাকা ২৫ পয়সা এবং ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৬ কোটি ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ২২৫ টাকা ২৫ পয়সা ব্যয় করেছে|


অপরদিকে, মশা মারতে ৫ বছরে কেসিসি মোট ১ কোটি ৫০ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩ টাকা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৩৫ কোটি ৫৬ লাখ ৪০ লহাজার ৯৫৫ টাকা ৭০ পয়সা ব্যয় করেছে| মশা নিধনে ও মশার আবাসস্থল ধ্বংস করতে এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং শতাধিক ফগার ও লার্ভিসাইড স্প্রে মেশিন থাকার কথা থাকলেও, রাজপথ ছাড়া অলিগলি বা বস্তি এলাকায় তাদের উপস্থিতি নামমাত্র| যান্ত্রিক ত্রুটি আর জ্বালানি সংকটের অজুহাতে অধিকাংশ সময় মেশিনগুলো পড়ে থাকে গ্যারেজে|


নগরবাসী বলছে, এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে অব্যবস্থাপনা ও অকার্যকর ওষুধ| কোটি টাকা খরচ করেও মশা না কমার পেছনে তিনটি বড় ঘাটতি পাওয়া গেছে| প্রথমত, নগরীর ড্রেন ও খালগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় সেগুলো এখন মশার ‘নার্সারি’তে পরিণত হয়েছে| দ্বিতীয়ত, মশা মারতে যে লার্ভিসাইড ব্যবহার করা হচ্ছে তার মান নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে; ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের সংমিশ্রণে ˆতরি ওষুধ অনেক ক্ষেত্রেই মশার বংশবিস্তার রোধে ব্যর্থ হচ্ছে| তৃতীয়ত, সঠিক তদারকির অভাবে কর্মীরা প্রধান সড়কগুলোতে ধোঁয়া দিয়েই দায় সারছেন, যার ফলে মশার মূল উৎসগুলো রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে|

মশা শুধু রক্তই চুষছে না, শুষে নিচ্ছে দরিদ্র মানুষের কষ্টার্জিত অর্থও| গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, মশা ও কয়েলের ধোঁয়াজনিত বয়সে আক্রান্ত হয়ে বস্তি এলাকার ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত একজন মানুষ বছরে গড়ে ৫০ দিন কাজ করতে পারেন না| এতে তাদের বছরে গড় চিকিৎসা খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার টাকারও বেশি| অর্থাৎ, কেসিসির মশা দমনে ব্যর্থতা খুলনার জনগোষ্ঠীর ওপর এক বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে|


কেসিসির কনজারভেন্সি অফিসার মো. আনিসুর রহমান সাম্প্রতিক সময়ে জিআইজেডের গবেষণায় অংশগ্রহণ করে দাবি করেছেন, তাঁরা নগরী পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সব ধরনের কাজ করে যাচ্ছেন| তবে নগরবাসী যত্রতত্র ড্রেনে ময়লা ফেলায় পানি জমে মশার উপদ্রব বাড়ছে| পাশাপাশি জনবল সংকট থাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে| নগরীর ওয়ার্ডগুলোতে প্রতিদিন কী পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হয় এবং কী পরিমাণ কালেকশন করে সেকেন্ডারি ও চূড়ান্ত ডাম্পিং স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে, তার জরিপ চলছে| বর্তমান বর্জ্য পুনঃব্যবহারের যে প্রকল্প চলছে তা চালু হলে বর্জ্য সংকট ও মশার উপদ্রব কমবে বলে দাবি করেন তিনি|


জন¯^াস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট থেকে বাঁচতে কেসিসিকে কেবল ‘ধোঁয়া দেওয়া’র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন একটি সমšি^ত মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা| পাশাপাশি নালা-নর্দমার পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করে মশার প্রজনন উৎস ধ্বংস করতে হবে| মানহীন ও ক্ষতিকর কয়েলের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনসচেতনতা বাড়িয়ে কয়েলের পরিবর্তে মশারির ব্যবহার উৎসাহিত করা প্রয়োজন| সময় এসেছে বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে বেরিয়ে আসার|

সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপ আর নাগরিক সচেতনতাই পারে খুলনার ফুসফুসকে পুনরায় সতেজ করতে| অন্যথায়, কেসিসির আশ্বাস বাস্তবায়িত হতে হতে এই বিষ একদিন পুরো শহরের জন¯^াস্থ্য ধ্বংস করে দেবে এবং বিশুদ্ধ বাতাস গ্রহণের জন্য খুলনা মহানগরবাসীর আর কোনো সুস্থ ফুসফুস অবশিষ্ট থাকবে না|