Home স্বাস্থ্য গরমে হিট স্ট্রোকের যেসব লক্ষণ অবহেলা করলেই বিপদ

গরমে হিট স্ট্রোকের যেসব লক্ষণ অবহেলা করলেই বিপদ

18

মিলি রহমান।।

গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে তাপমাত্রা যত বাড়ছে, চিকিৎসকেরা ততই সাধারণ মানুষকে সতর্ক করছেন। অনেকেই গরমের শুরুর দিকের কিছু শারীরিক সমস্যাকে ‘সাধারণ ক্লান্তি’ বা ‘রোদের কারণে একটু দুর্বল লাগা’ ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবহেলাই ডেকে আনতে পারে মারাত্মক ‘হিট স্ট্রোক’। সঠিক সময়ে লক্ষণ চিনে ব্যবস্থা না নিলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এটি জীবনঘাতী রূপ নিতে পারে।

অনেকের ধারণা, কেবল ঘণ্টার পর ঘণ্টা সরাসরি কড়া রোদে দাঁড়িয়ে থাকলেই হিট স্ট্রোক হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বদ্ধ বা অতিরিক্ত গরম ঘর, অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচল, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে ঘরের ভেতরে বা ছায়ায় বসেও একজন মানুষ হিট স্ট্রোকের শিকার হতে পারেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হিট স্ট্রোক হলো তীব্র গরমজনিত এমন এক গুরুতর অবস্থা, যার ফলে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায় এবং এটি মানুষের মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, কিডনি ও পেশিকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সময়মতো জরুরি চিকিৎসা না পেলে এতে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

হিট স্ট্রোক আসলে কী?

যখন প্রচণ্ড গরমের কারণে শরীরের নিজস্ব তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ওপরে চলে যায়, তখন তাকে হিট স্ট্রোক বলা হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা পানিশূন্যতার কারণে যখন এই কুলিং সিস্টেম কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখনই শরীর বিপজ্জনকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

যেসব প্রাথমিক লক্ষণ কখনোই এড়িয়ে যাবেন না

হিট স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এর শুরুর দিকের লক্ষণগুলো খুব সাধারণ মনে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে:

• তীব্র মাথা ঘোরানো বা মাথা হালকা লাগা।

• প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা বা অবসাদ।

• তীব্র মাথাব্যথা।

• বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।

• শরীর অতিরিক্ত গরম অনুভূত হওয়া।

• শুরুতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং পরে হঠাৎ ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া।

• হৃদস্পন্দন বা পালস রেট অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া।

• মাংসপেশিতে তীব্র টান বা ব্যথা (মাসল ক্র্যাম্প) ।

মানসিক বিভ্রান্তি: একটি বড় বিপদের সংকেত। হিট স্ট্রোকের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে তা সরাসরি মস্তিষ্কে আঘাত করে। চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণে আচমকা পরিবর্তন আসা সবচেয়ে বড় বিপদের লক্ষণ। যেমন:

• তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি বা হ্যালুসিনেশন।

• যেকোনো কথার উত্তর দিতে দেরি হওয়া বা ধীর প্রতিক্রিয়া।

• কথা জড়িয়ে যাওয়া বা অস্পষ্ট হওয়া।

• চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা হারিয়ে ফেলা।

• মাত্রাতিরিক্ত খিটখিটে মেজাজ, ছটফটানি বা অস্বাভাবিক আচরণ।

অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে বোঝার আগেই তার পরিবারের সদস্যরা এ আচরণগত পরিবর্তনগুলো খেয়াল করতে পারেন। খিঁচুনি বা জ্ঞান হারিয়ে ফেলা হলো হিট স্ট্রোকের চূড়ান্ত জরুরি অবস্থা।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন?

গ্রীষ্মকালীন এ দাবদাহে কিছু মানুষের হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি:

• শিশু এবং প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তি

• তীব্র রোদে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ ও ক্রীড়াবিদ

• যারা দীর্ঘক্ষণ ধরে কম পানি পান করেন

• ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট বা কিডনির মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি

• অতিরিক্ত স্থূলতা বা চলাফেরায় অক্ষম মানুষ

তাৎক্ষণিক করণীয়: আপনার একটি পদক্ষেপ বাঁচাতে পারে প্রাণ

কারো মধ্যে হিট স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:

ঠান্ডা স্থানে সরিয়ে নিন: রোগীকে দ্রুত রোদ থেকে সরিয়ে এসি রুমে বা ফ্যানের নিচে ছায়াযুক্ত ঠান্ডা স্থানে নিয়ে আসুন।

কাপড় হালকা করুন: শরীরের অতিরিক্ত, ভারী বা টাইট জামাকাপড় খুলে দিন বা ঢিলেঢালা করে দিন।

শরীর ঠান্ডা করুন: রোগীর পুরো শরীরে ঠান্ডা পানি ছিটান বা ভেজা তোয়ালে দিয়ে পুরো শরীর বারবার মুছে দিন।

আইস প্যাকের ব্যবহার: রোগীর ঘাড়, বগল, মাথা এবং কুঁচকিতে বরফ বা আইস প্যাক দিন। এতে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত নেমে আসে।

পানি পান: রোগী যদি পুরোপুরি সজ্ঞানে ও সতর্ক থাকেন, তবেই তাকে অল্প অল্প করে পানি বা স্যালাইন খেতে দিন। অজ্ঞান অবস্থায় মুখে কিছু দেওয়া যাবে না।

জরুরি সেবা: এই প্রাথমিক চিকিৎসাগুলো দেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন বা রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।

হিট স্ট্রোক প্রতিরোধের উপায়

চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতাই হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার সবচেয়ে সেরা উপায়:

• তৃষ্ণা না পেলেও সারাদিন প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার (যেমন: ডাবের পানি, লেবুর শরবত) পান করুন।

• দুপুরের চড়া রোদ (বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৪টা) যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।

• বাইরে বের হলে হালকা রঙের, ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরুন এবং ছাতা, টুপি বা রোদচশমা ব্যবহার করুন।

• রোদে যেকোনো পরিশ্রমের কাজের মাঝে মাঝে ছায়ায় গিয়ে বিশ্রাম নিন।

• চা, কফি বা অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় কম খান, কারণ এগুলো শরীরকে আরও পানিশূন্য করে তোলে।

হিট স্ট্রোক কেবলই একটি সাধারণ ক্লান্তি নয়; এটি একটি নীরব ঘাতক। তাই শরীরে কোনো অস্বস্তি দেখা দিলে তা চেপে না রেখে দ্রুত ব্যবস্থা নিন এবং সুস্থ থাকুন।