স্টাফ রিপোর্টার।।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনের নদী-খালে চলছে অবাধে পারশে মাছের পোনা নিধন| নিষিদ্ধ জাল দিয়ে এ পোনা ধরতে গিয়ে বিপুল হারে উঠে আসছে অন্যান্য জলজ প্রাণ-সম্পদও| এতে সুন্দরবনের জীব-ˆবচিত্র্য ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ার কথা বলছেন গবেষকরা| দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি ঘেরগুলো সু¯^াদু এই পারশে মাছের পোনার অন্যতম গন্তব্য| পোনা নিধনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ঘের মালিকরা তা কেনার বিষয়ে তথ্য দিতে চান না| তাদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা করা যায়, চাহিদামত তারা পোনা পাচ্ছেন এবং চিংড়ির পাশাপাশি ঘেরে তা চাষও করছেন| এতে সুন্দরবনের জীব-ˆবচিত্র্েয কী আঘাত পড়ছে তার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীন খুলনার পাইকগাছা নোনা পানি গবেষণা কেন্দ্র| তাদের তথ্য বলছে, একটি পারশে পোনা আহরণের বিপরীতে কমপক্ষে ১১৯ চিংড়ি, ৩১২ প্রাণিকণা ও ৩১টি অন্য প্রজাতির মাছের পোনা ধ্বংস হয়|
সুন্দরবন নিয়ে কাজ করেন এমন সংগঠক-পরিবেশবাদী, বনজীবী ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারশে মাছের পোনার সংগ্রহের একটি ‘জঙ্গল’ চক্র সারাবছরই সুন্দরবনে সক্রিয় থাকে| এদের সঙ্গে বনের অসৎ নিরাপত্তা কর্মী, বন বিভাগের লোকজনেরও যোগসাজশ থাকার অভিযোগ আছে| এদের মাধ্যমেই এ মাছের পোনা চিংড়ি ঘের পর্যন্ত পৌঁছায়| সুন্দরবন ঘেঁষা মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের বনজীবী সামাদ শেখ বলেন, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের চিংড়ি ঘেরে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা পারশে পোনার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে| ২০-২৫টি দল সুন্দরবনে এ পোনা শিকার করে|
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবনের আলোর কোল, দুবলার চর, বঙ্গবন্ধুর চর, বাটলুরচর, নেরালী, কালার মাথা, মজ্জতের গোড়া, মানিকখালী, নীলবাড়ী, নারিকেলবাড়িয়া, টিয়ের চর, আগুন জ্বলা, মজ্জত এলাকার নদী-খাল থেকে বিপুল পরিমাণ পারশে পোনা শিকার করা হচ্ছে| সাধারণত টানা বা বেহুন্দী জাল দিয়ে চিংড়ির পোনা ধরেন স্থানীয় বাসিন্দারা| এসব জাল মশারির মত প্রায় নিশ্ছিদ্র| একই জাল ব্যবহার করা হয় পারশে মাছের পোনা ধরতে| বাংলাদেশ মৎস্য আইনে মাছের পোনা সংরক্ষণে সোয়া চার ইঞ্চির কম ফাঁস জাল ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ|
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন সুরক্ষা ও উপকূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয় ˆতরি করা হচ্ছে| এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে| কোনো অনৈতিক কাজে বন বিভাগের কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে|
কমছে মাছের ভাণ্ডার: বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমাণ ১৮৭৪ বর্গকিলোমিটার; যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ| বর্তমানে ১৩টি বড় নদীসহ ৪৫০টির মত খাল রয়েছে সুন্দরবনে| সুন্দরবনের আয়তনের অর্ধেকের বেশি এলাকা এখন অভয়ারণ্য| এসব এলাকায় জেলেদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ| ‘পূর্ব’ ও ‘পশ্চিম’ এই দুটি প্রশাসনিক বিভাগে বনের বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত| খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন| বাগেরহাট ও খুলনার কিছু অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন|
জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়া সুন্দরবনের জলাধার ভেটকি, রূপচাঁদা, দাঁতনে, চিত্রা, পাঙাশ, লইট্যা, ছুরি, মেদ, পারশে, পোয়া, তপসে, লাক্ষা, কই, মাগুর, কাইন, ইলিশসহ ২১০ প্রজাতির সাদা মাছের আবাস| রয়েছে গলদা, বাগদা, চাকা, চালী, চামীসহ ২৪ প্রজাতির চিংড়ি| শিলাসহ ১৪ প্রজাতির কাঁকড়ার প্রজনন হয় এখানে|
তবে অতিমাত্রায় মাছ আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার ও পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন ¯^ল্পতার কারণে সামুদ্রিক মাছের মজুদ কমছে বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ও নরওয়ের যৌথ উদ্যোগে ইএএফ-নানসেন সার্ভে-২০২৫ শীর্ষক জরিপে তুলে ধরা হয়েছে| এতে দেখা যায়, ২০১৮ সালের সর্বশেষ জরিপের পর গত সাত বছরে বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুদ কমেছে প্রায় ৭৮ শতাংশ| ২০১৮ সালে ‘স্মল পেলাজিক’ মাছের মজুদ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ১০০ টন, ২০২৫ সালে তা কমে ৩৩ হাজার ৮১১ টনে নেমেছে| সাগরের পানির উপরিস্থ সার্ডিন, ইলিশ, ছুরি, হার্ড টেইল, ম্যাকারেল, পোয়া, আইলাসহ ৬০ প্রজাতির মাছের প্রাচুর্যও কমে গেছে|
মৌসুমী ব্যবসায় ‘সক্রিয় ২৫ চক্র’: পারশে পোনা সংগ্রহ করতে হয় বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়| ডিসে¤^র থেকে মার্চ এ পোনা সংগ্রহ ও বিক্রির উপযুক্ত সময়| এর মধ্যে ডিসে¤^র-জানুয়ারি সুন্দরবনে মাছ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকে| এর মধ্যেও এ পোনা ধরা হয়| সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবনের ভেতর ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও সাদা মাছ পরিবহনের প্রয়োজনীয়তায় কথা বলে বনবিভাগ থেকে ট্রলারের অনুমতি নেয় ‘জঙ্গল’ ব্যবসায়ী মহাজনরা| এরপর তারা বনের বিভিন্ন নদী-খালে অবাধে পারশে মাছের পোনা শিকার করেন| অভয়ারণ্যের নদীতে পোনা ধরতে প্রতিটি দ্রুতগামী ট্রলারে আট থেকে ১০ জন জেলে আর ঘন দীর্ঘ মশারি জাল থাকে| কোনো অভিযান পরিচালনার আগেই বনবিভাগের ‘দালালরা’ জেলেদের জানিয়ে দেয়| সংকেত পেয়ে তারা বনের মধ্যে পালিয়ে যান| অভিযান শেষ হলে আবার তারা পোনা ধরতে শুরু করেন|
বনজীবী সামাদের ভাষ্যমতে, একবার জাল টানলে দুই থেকে তিন মণ পারশে পোনা পাওয়া যায়| দুদিন পর পর এসব ট্রলার সাত থেকে আট মণ পোনা নিয়ে শিবসা নদীতে আসে| সেখান থেকে বনবিভাগের নলিয়ান কার্যালয়ের সামনে দিয়েই নিয়ে যাওয়া হয় পাইকগাছা, দাকোপ ও মোংলায় বিভিন্ন মাছের মোকামে| “খুলনার পাইকগাছা সেতুর নিচে দক্ষিণ পাশে প্রকাশ্যে এ পোনা বেচাকেনা হয়| ঘের মালিকদের কাছে আকার ভেদে প্রতি কেজি পোনা ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়|” সামাদের দাবি, শিবসা নদী দিয়ে পোনা আসার সময় বনবিভাগের স্টেশন ও ক্যাম্পকে ‘ম্যানেজ’ করেন জেলেরা|
তবে এ ধরনের অভিযোগ অ¯^ীকার করে নলিয়ান স্টেশন কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, “আমার এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহল জোরদার আছে| পারশে মাছের পোনা ধরা বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই| যোগদানের পর এসব ট্রলার একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছি|”
গন্তব্য চিংড়ি ঘের: মৎস্য অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, খুলনা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে এক লাখ ৮৫ হাজার ২০৪টি চিংড়ি ঘের রয়েছে| এসব ঘেরে মৌসুমভিত্তিক পারশে পোনার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে| মৎস্য অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের উপ-পরিচালক বিপুল কুমার বসাক বলেন, পারশে মাছ সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের একটি সু¯^াদু মাছ| এ মাছ উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ এবং ক্ষতিকারক চর্বি নেই| উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি ঘের মালিকরা চিংড়ির সঙ্গে ঘেরে এ মাছেরও চাষ করেন| এ মাছ চাষে ঝুঁকি কম| দামও মেলে ভালো|
সাধারণত এর ওজন ১৫০-২০০ গ্রাম হয়| ঘেরে পোনা মজুদ করার সাত-আট মাস পর একেকটা মাছের ওজন হয় ১৫০-২০০ গ্রাম| তবে এর ওজন ৪০-৮০ গ্রাম হলেই বাজারজাত করা যায়| বিপুল বলেন, এখনো এ মাছ চাষে উদ্যোক্তাদের প্রাকৃতিক পোনার উপরই নির্ভর করতে হয়| পারশে মাছ প্রাকৃতিক পরিবেশে ডিসে¤^র-ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ শীতকালে প্রজনন করে| এরা সাধারণত অধিক লোনাপানিতে ডিম দেয়| ডিসে¤^রের শেষ দুই সপ্তাহ ও ফেব্রুয়ারির শেষ দুই সপ্তাহে এ মাছ সবচেয়ে বেশি ডিম দেয়| এরা উচ্চ প্রজননকারী| ১৫ মাসের মধ্যে এদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়|
সুন্দরবন সংলগ্ন বঙ্গপোসাগর এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খালে অবাধে পারশে মাছের পোনা নিধনে বিষয়ে তিনি বলেন, সুন্দরবনে সরাসরি অভিযানের অনুমতি না থাকায় মৎস্য বিভাগ অভিযানে যেতে পারে না| খুলনার পাইকগাছার সোলা দানার চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, তার আড়াইশ বিঘা চিংড়ি ঘের রয়েছে| যেখানে তিনি প্রতিবছর চিংড়ির সঙ্গে পারশে মাছের পোনাও ছাড়েন| “সু¯^াদু এই মাছটির সারাদেশেই ব্যাপক চাহিদা রয়েছে| লাভও ভালো|” তবে এক মৌসুমে তিনি কী পরিমাণ পারশে পোনা সংগ্রহ করেন সেটি জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি| বলেন, সাধারণত ফড়িয়াদের মাধ্যমে তিনি তা সংগ্রহ করেন|
চক্রে কারা: সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু, দুর্যোগ, সুন্দরবন সুরক্ষা ও শিক্ষা সহায়তা বিষয়ে নিয়ে কাজ করা কয়রা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি তারিক লিটু বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদের কিছু প্রভাবশালী ‘জঙ্গল’ ব্যবসায়ী মহাজন বনবিভাগকে ‘ম্যানেজ’ করে পারশে পোনা নিধন করছে| এ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করেন বাংলাদেশ সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের মিডিয়া সমš^য়ক ওবায়দুল কবির সম্রাট|
তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে বন কর্মকর্তা-রক্ষীদের উৎকোচ বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে সুন্দরবন| বনবিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-প্রহরীদের যোগসাজশে পশ্চিম সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে খুলনার কয়রা ও দাকোপ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগরকেন্দ্রিক কয়েকটি ‘জঙ্গল’ ব্যবসায়ী চক্র গড়ে উঠেছে| যেটা কয়রা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়|”
তিনি বলেন, “আরও কয়েকটি চক্র রয়েছে পূর্ব সুন্দরবনের বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জকেন্দ্রিক| অসাধু কিছু বন কর্মকর্তা-প্রহরী বছরের পর বছর সুন্দরবনের একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করায় তারা এসব চক্রের সঙ্গে মিশে রয়েছেন|”
প্রশাসন যা বলছে: পূর্ব সুন্দরবন বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক দ্বীপন চন্দ্র দাস বলেন, সুন্দরবনে সব ধরনের মাছের পোনা ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ| সম্প্রতি শেওলা ও বলেশ্বর নদী থেকে দুটি করে পারশে পোনার ট্রলার জব্দ করা হয়েছে| খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, জনবল সংকটসহ বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা ও প্রহরীরা| প্রায়ই কীটনাশক, কীটনাশক দিয়ে ধরা মাছ, নিষিদ্ধ ঘন জালসহ সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশ করা জেলেদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে|











































