Home আঞ্চলিক ইজারায় নেতাদের সমঝোতা, সরকারের রাজস্ব তলানিতে

ইজারায় নেতাদের সমঝোতা, সরকারের রাজস্ব তলানিতে

3

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।


খুলনার স্থায়ী বড় পশুর হাটের মধ্যে তেরখাদা উপজেলার ইখড়ি ও ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া হাট অন্যতম। কোরবানির ঈদের আশপাশের জেলার মানুষও এখান থেকে পশু কেনেন। উপজেলা প্রশাসনের বিপুল রাজস্ব আয়ও হয়। তবে চলতি বছর হাট ইজারার আয়ে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে।

২০২৫ সালে তেরখাদা উপজেলা প্রশাসন ইখড়ি হাট ইজারা দিয়েছিল ৯৫ লাখ টাকায়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই হাট এবার ইজারা হয় ৩১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩০ টাকায়। গতবারের মতো এবারও ইজারা পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মিল্টন হোসেন মুন্সী।

অন্যদিকে ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া হাট ২০২৪ সালে ইজারা হয় ৬৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকায়। ২০২৫ সালে কাউকে ইজারা নিতে দেননি বিএনপি নেতারা। উপজেলা প্রশাসনের নামে তারাই খাস আদায় করেন। বছর শেষে রাজস্ব জমা হয় মাত্র ২০ লাখ টাকা। চলতি বছরও দৃশ্যপটে আছেন বিএনপি নেতারা।

চলতি বছর এ হাটের ইজারা মূল্য ধরা হয় ৬১ লাখ টাকা। কিন্তু ‘ইজারাদার না পাওয়ায়’ এবারও খাস আদায় চলছে। গতবারের মতোই দৃশ্যপটে স্থানীয় বিএনপি নেতারা। জানা গেছে, স্থানীয় বিএনপি নেতারা একজোট হয়ে এবারও কাউকে দরপত্রে অংশ নিতে দেননি।

পাঁচ বার দরপত্রে কেউ অংশ না নেওয়ায় ইজারা নীতিমালা অনুযায়ী খাস আদায় অথবা উন্মুক্ত নিলামের আহ্বান করা হয়। সেখানেও বিএনপি নেতারা জোটবদ্ধ হয়ে তাদের পক্ষে একজন অংশ নেন। ওই নেতার দেওয়া কম মূল্যেই হাট ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

নেতাদের সমঝোতার কারসাজিতে সরকারের রাজস্ব কমলেও আয় বেড়েছে তাদের। তবে বিএনপি নেতারা কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

যেভাবে কারসাজি হলো
তেরখাদার বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আগে আওয়ামী লীগ নেতারা স্থানীয় মাদ্রাসার নামে হাট পরিচালনা করতেন। তারাও কারসাজি করে মূল্য কমিয়ে হাট ইজারা নিতেন। গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নেতারা আত্মগোপনে গেলে দৃশ্যপটে আসেন বিএনপি নেতারা। ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হয়।

সেখানে ইজারা মূল্য ছিল ৮৫ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। দরপত্রে একাধিক ব্যক্তি অংশগ্রহণ করে তীব্র প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ৯৫ লাখ টাকায় হাট ইজারা পান বিএনপি নেতা মিলটন হোসেন মুন্সি।

চলতি বছরের জন্য ইজারার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয় গত ২ ফেব্রুয়ারি। ইজারা মূল্য ছিল ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। ৫ দফায় দরপত্র বিক্রি করা হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতারা সমঝোতা করে প্রথম চার বার দরপত্র অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

শেষবার গত ৩১ মার্চ মিলটন মুন্সী একাই সিডিউল জমা দেন। সেখানে দর ছিল মাত্র ৩০ লাখ টাকা। ব্যবধান বেশি হওয়ায় সেটি বাতিল করা হয়।

ইজারাদার না পাওয়ায় নিজস্ব উদ্যোগে (খাস আদায়) রাজস্ব আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় খাস আদায়ের জন্য আবার উন্মুক্ত নিলাম আহ্বান করা হয়। সেখানেও মিলটন হোসেন একাই অংশ নেন এবং ৩১ লাখ ৪৫ হাজার টাকায় তাকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তেরখাদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা সুলতানা নীলা বলেন, কেউ যদি দরপত্রে অংশ না নেয়, আমাদের কী করার আছে? খাস আদায়ের মতো জনবল আমাদের নেই, এজন্য উন্মুক্ত নিলাম হয়েছে। এর আগে আমরা সব জায়গায় মাইকিং করেছি, সবাইকে অংশ নিতে বলেছি। সেখানে কেউ যদি ১০০ টাকাও দর দিতো, নীতিমালা অনুযায়ী তাকেই দিতে হতো।

২০২৫ সালে হাট ইজারার দরপত্রে অংশ নিয়েছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রবিউল হোসেন। এবার তিনি দরপত্রে অংশ নেননি। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের এলাকার হাট, আমরা মিলেমিশে চালাতে চাই। টেন্ডারে না থাকলেও আমরা একসঙ্গেই আছি।

উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মিল্টন হোসেন মুন্সী বলেন, এই হাটের এত দাম না। এইজন্য কেউ টেন্ডারে যায়নি। গতবার নিজেরা ঝামেলা করে ম্যালা টাকায় ডাক নিতে হইছে। ম্যালা টাকা লস হইছে। আমাগে জমিতে হাট, আমরা সবাই মিলে এইবার চালাবো।

খর্ণিয়া হাটের পেছনেও বিএনপি নেতারা
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া হাট ইজারা পান মাগুরাঘোনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আশরাফ হোসেন। তিনি ৬৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা রাজস্ব জমা দেন। অভ্যুত্থানের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল খর্ণিয়া হাটের ইজারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ইজারা মূল্য ছিল ৭৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা। ৫ দফা দরপত্র আহ্বান করলেও কেউ জমা দেয়নি। তখন উপজেলা প্রশাসন নিজস্ব উদ্যোগে রাজস্ব আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নামে খর্ণিয়া ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল হোসেন সরদার, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক শেখ শাহিনুর রহমান শাহিন এবং ইউনিয়ন সহ-সম্পাদক রেজওয়ান হোসেনসহ কয়েকজন সমঝোতা করে কাউকে দরপত্রে অংশ নিতে দেননি।

পরে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত হলে তারাই উপজেলা প্রশাসনের হয়ে রাজস্ব আদায় করেন। ওই বছর সরকারের কোষাগারে মাত্র ২০ লাখ টাকার রাজস্ব জমা পড়ে। যা অন্যান্য বছরের তিন ভাগের এক ভাগ।

চলতি বছরের জন্য গত ২২ জানুয়ারি ডাকা দরপত্রে ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬১ লাখ ১২ হাজার টাকা। এবারও কেউ অংশ নেননি। গত ১৩ এপ্রিল চলতি বছরের জন্য শোভনা ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে খাস আদায়ের নির্দেশ দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার। তবে এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ভূমি অফিসের পক্ষে বিএনপি নেতারাই খাজনা আদায় করছেন।

বিএনপি নেতা আবুল হোসেন সরদার বলেন, ইউএনও এবং নায়েবের সঙ্গে কথা বলে আমরা প্রায় ৬০ জনের মতো খাজনা তুলি। যা হয় সবই জমা দেই। শেখ শাহিনুর রহমান শাহিন বলেন, আগের মতো হাটে আর গরু উঠে না বলে রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। মাস শেষে আদায় হওয়া টাকা (রাজস্ব) উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জমা দেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, নিয়ম মেনেই হাট ইজারার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো সিডিউল বিক্রি হয়নি। এ কারণে হাটে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইজারা না হওয়ায় রাজস্ব কমে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।