ঢাকা অফিস।।
প্রতিবন্ধীদের সমাজের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী থেকে কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীতে পরিণত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তারা বলেছেন, প্রতিবন্ধিতা মোকাবিলা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, স্থানীয় সরকারসহ সব মন্ত্রণালয় এবং সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাজধানীর কড়াইলে এরশাদ মাঠে আয়োজিত ‘প্রতিবন্ধী স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান।
প্যানেল আলোচনায় ‘স্পেশাল চাইল্ড’দের বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার বলেন, সমাজে প্রতিবন্ধীদের বোঝা হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার তাদের ‘প্রতিবন্ধী’ নয়, ‘স্পেশাল চাইল্ড’ হিসেবে দেখতে চায়।
তিনি বলেন, যে পরিবারে একটি স্পেশাল চাইল্ড জন্ম নেয়, সেই পরিবারের সংগ্রাম শুরু হয় প্রথম দিন থেকেই। তাই দ্রুত শনাক্তকরণ বা আর্লি ডায়াগনোসিস খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিজের পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এই চিকিৎসক বলেন, তার বড় বোন জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী ছিলেন। তার মা সবসময় মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় থাকতেন। এ ধরনের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার জানান, প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুদের আচরণ ও নড়াচড়া বিশ্লেষণ করে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুলভাবে স্পেশাল চাইল্ড শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
করুণা নয়, দক্ষতা উন্নয়ন দরকার
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, প্রতিবন্ধীবান্ধব বাংলাদেশ গড়তে হলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো প্রতিবন্ধীদের সমাজের বোঝা না ভেবে কর্মক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
তিনি প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা বুথ চালুর প্রস্তাব দেন, যাতে তারা দ্রুত চিকিৎসাসেবা পান।
ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, তাদের প্রতি করুণা দেখানোর প্রয়োজন নেই। বরং তাদের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ক্রীড়া আয়োজন বাড়ানো উচিত এবং নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মতো আলাদা প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যেতে পারে।
জন্মনিবন্ধন ও চিকিৎসাসেবায় সহায়তা
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ৬৩ জনের জন্মনিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জন্মনিবন্ধন থাকলে চিকিৎসাসেবা পাওয়া সহজ হয়। আমরা আরও অনেকের জন্য কাজ করছি।
ডিএনসিসি প্রশাসক জানান, আর্থিক সমস্যার কারণে যারা চিকিৎসা নিতে পারেন না, তাদেরও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবন্ধীরাও এই সমাজের সমান নাগরিক
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়া, যেখানে প্রতিবন্ধীরাও সমান নাগরিক হিসেবে মর্যাদা পাবে।
তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীদের ভিন্ন মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, থেরাপি ও স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, প্রতিবন্ধী স্কুলগুলো নিয়মিত তদারকি করা হবে। ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও উন্নত করা হবে এবং ভুয়া প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে মায়েরা অনেক মানসিক কষ্টের মধ্যে থাকেন। আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই।
প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো বাধ্যতামূলক করা হবে উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, নতুন ও পুরোনো সব সরকারি-বেসরকারি ভবনে প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার নির্দেশনা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ভবনে ওঠানামার জন্য র্যাম্প ও আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও আবাসিক হোটেলগুলোতে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার আগে প্রতিবন্ধীদের জন্য র্যাম্প ও আলাদা টয়লেট আছে কি না, তা যাচাই করা হবে। এসব ব্যবস্থা না থাকলে লাইসেন্স দেওয়া হবে না।
মীর শাহে আলম বলেন, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফিজিওথেরাপি সেবা চালু ও ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এসময় তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক অকার্যকর প্রতিবন্ধী স্কুল অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠান পর্যালোচনা করে কার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে, যাতে প্রকৃত প্রতিবন্ধীরা সেবা পায়।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এ কার্যক্রমের আওতায় প্রথমে ১০টি এলাকায় পাইলট প্রকল্প চালু করা হবে। পরে ধাপে ধাপে দেশের সব উপজেলায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।











































