স্টাফ রিপোর্টার
‘মহান মে দিবস আসেলেই একটা উৎসব উৎসব ভাব হতো খুলনার শিল্পাঞ্চলে| সভা-সমাবেশ ও শোভাযাত্রার কত প্রতিশ্রুতি| একদিনে পিপলস- ক্রিকেন্ট, প্লাটিনাম অন্যদিকে দৌলতপুর, হার্ডবোর্ড ও নিউজপ্রিন্ট| সবখানে হাজার হাজার শ্রমিক| এখন খুব কষ্ট হয়; আর সেই আসবে না|’ হতাশা নিয়ে এভাবেই কথা বলছিলেন খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলের কর্মরত দেলোয়ার উদ্দিন|
শিল্পাঞ্চল খ্যাত খুলনার রূপসা থেকে খালিশপুর, দৌলতপুর, দিঘলিয়া, খানজাহান আলী ‘সাইরেন’র শব্দ নেই| রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর সঙ্গে বন্ধ হয়েছে একাধিক ব্যক্তি মালিকাধীন জুটমিল| ফলে গত এক দশকে শিল্পহীন নগরীতে পরিণত হয়েছে|
২০২০ সালের ১ জুলাই এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ জুটমিল করপোরেশন (বিজেএমসি)’র অধীনে খুলনার ৯টিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকল বন্ধ ঘোষণা করা হয়| এরপর দিঘলিয়ার স্টার, খালিশপুরে প্লাটিনাম, ক্রিসেন্ট, খালিশপুর (পিপলস), দৌলতপুর, ইস্টার্ন, আলিম, যশোরের জেজেআই, কাপেটিং জুট মিল শ্রমিকরা কলোনি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন| কথা ছিল লে-অফ অর্থাৎ তিন মাস পর আবার চালু করবেন| কিন্তু প্রায় ৬ বছর হলেও এখনো কোনো মিল চালু হয়নি|
অপরদিকে খুলনার দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, ট্রেক্সটাইল মিল, নিউজপ্রিন্ট মিলস, হার্ডবোর্ড মিল দুই দশকের বেশী সময় বন্ধ রয়েছে| বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মহসেন, সোনালী ও এজাক্স জুট মিলের চাকাও ঘুরছে না|
বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালে দৌলতপুর জুট মিলটি ফরচুন গ্রুপ সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনি ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজিকে ও পরে খালিশপুর জুট মিলটিকে রেডিয়্যান্ট গ্রুপকে ইজারা দেওয়া হয়| ২০২৫ সালে আজিজ গ্রুপকে যশোরের রাজঘাটের জেজেআই জুট, ইস্টার্ন ও কার্পেটিং মিল দুটি ভারতের রিগ্যাল গ্রুপকে ও মিমো জুট অ্যান্ড ফাইবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডতে খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিল ইজারা দেওয়া হয়েছে| ইতিমধ্যে খুলনার খালিশপুর ও দৌলতপুর মিলটি বন্ধ রযেছে|
কর্মরত শ্রমিকরা জানান, ইজারা দেওয়া মিলগুলোর মালিকানা জুট মিলে ৮ ঘন্টার বেশী সময় কাজ করে ২৬০ টাকা মজুরি দেয়| তারা কোন শ্রম কোন আইন মানছে না| এ অবস্থা চলতে পারে না|
জাতীয়তাবাদী পাট শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আবুল কালাম জিয়া আপেক্ষ করে বলেন, একে একে খুলনার শিল্পাঞ্চল শেষ হয়ে গেছে| শিল্প এলাকাগুলো বিরাণভূমি| আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে মিলগুলো চালুর জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পাটমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে আসছি| ১ মে মহান মে দিবসে ঢাকায় কর্মসূচি রয়েছে| সেখান থেকেও দাবি তোলা হবে| আমরা আমাদের সেই ঐতিহ্য ফিরে পেতে চাই|’
প্লাটিনাম জুট মিলের সিবিএ নেতা বলেন, মো: খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা মৃতভাবে বেঁচে আছি| মহান মে দিবস করে কী হবে| ইজারা নিয়েও শ্রমিকদের ঠকানো হচ্ছে| দৌলতপুর লে-অফ করার পরও শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে না| দৈনিক মজুরি সবমিলিয়ে ২৬০ টাকাও নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে না| বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নয়, সরকারি উদ্যোগে মিলগুলো চালু করতে হবে|’
খালিশপুরের স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম রসুল| তিনি বলেন, আমরা মিলে কাজ করিনি| কিন্তু মিল আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল| এখন মনটা খুব খারাপ হয়| কত চেনা মানুষ হারিয়ে গেছে| এক সময়ে আমাদের ১০-১২জন ভাড়াটিয়া থাকতো| তারা যেদিন সপ্তাহের মজুরি পেতেন, সেদিন বাসা জুড়ে উৎসব হতো| মে দিবসে রাতদিন অনুষ্ঠান চলতো| &েখন সারাদিনেও ১০জন লোকের দেখা পাইনা| পাটকল বন্ধ হওয়ায় শুধু শ্রমিকরাই নয়, আমরাও শেষে হয়ে গেছি| কখনো ভাবিনি এমন অবস্থা হবে|’
শ্রমিক নেতা দীন মোহাম্মদ জানান, মিল যখন বন্ধ করা হয় তখন বলা হয়েছিল এটা সাময়িক ভাবে বন্ধ করা হলো| আগামী তিন মাস পর মিল চালু করা হবে| কিন্তু ৬ বছরেও খালিশপুর, খানজাহান আলী ও অভয়নগর থানার নয়টি জুট মিলের ৬টির অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি|
দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিক মনির আহমেদ বলেন, বছরের বছর আন্দোলন করেছি| আশ্বাস পেয়েছি| মিল চালু হয়নি| এখন ওই মিল ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে| খুলনার শিল্পাঞ্চলে আর শ্রমিক দিবস নেই|
বন্ধ মিল-কারখানা চালু করা ও বেসরকারি খাতে লিজ বিষয়ে করেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির| গত ২৩ এপ্রিল ঢাকায় সচিবালয়ে সভা শেষে তিনি গণমাধ্যমে জানান, এরই মধ্যে কিছু পাটকল বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয়েছে| সেগুলোতে বিনিয়োগকারীরা উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, যা বেশ ইতিবাচক| চলতি বছরের ডিসে¤^রের মধ্যেই আরও ছয়টি পাটকল বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে| প্রতিটি মিলেই এক হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে| এছাড়া মিলভেদে প্রায় ২০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগ আসবে বলে প্রাথমিক প্রক্ষেপণ আছে|
মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আরও বলেন, আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী অদূর ভবিষ্যতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন সব মিলই পুনরায় উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে ফিরবে কিছু পাট খাতে, আবার কিছু ভিন্ন শিল্পখাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে চালু হবে|










































