আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরেুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে তেহরানের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারকারী ফিরোজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি তার সব সঞ্চয় ইরানের বৃহত্তম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘নোবিটেক্স’ থেকে সরিয়ে নিজের ব্যক্তিগত ডিজিটাল ওয়ালেটে নিয়ে যান। তার আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধের মধ্যে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো প্ল্যাটফর্মে তার অর্থের মালিকানা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে কিংবা সাইবার হামলার শিকার হতে পারে।
আল-জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদনে ক্রিপ্টো লেনদেন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা চেইনালাইসিসের তথ্যমতে, গত বছর ইরানের ক্রিপ্টো অর্থনীতির আকার ছিল ৭৭৮ কোটি ডলারেরও বেশি।
তবে এটি কেবল সাধারণ নাগরিকদের উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে বাঁচার পথ নয়; বরং ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) এই খাতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
দেশটির প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার চেয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করা সহজ এবং এটি শনাক্ত করাও বেশ কঠিন। ফলে তেল বিক্রি, অস্ত্র কেনা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে একে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে আইআরজিসি।
এদিকে তেহরানের এই অর্থনৈতিক পথ বন্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠছে ওয়াশিংটন।
গত এপ্রিলে ইরান ঘোষণা দেয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলের জাহাজগুলোকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মাশুল দিতে হবে।
প্রতিবেদনে চেইনালাইসিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ক্যাটলিন মার্টিন বলেন, ‘ভারী নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলো সাধারণত ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে ঝুঁকে পড়ে কারণ এটি বিকল্প পথে অর্থায়নের সুযোগ করে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো ওয়ালেটগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ৩৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ডিজিটাল সম্পদ জব্দ করেছে।’
এ বিষয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘তেহরান মরিয়া হয়ে দেশের বাইরে যে অর্থ সরানোর চেষ্টা করছে, আমরা তার প্রতিটি উৎস শনাক্ত করবো এবং শাসনের সঙ্গে যুক্ত সব আর্থিক লাইফলাইন লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেব। ’
সাধারণ ইরানিদের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ছিল তাদের কষ্টার্জিত উপার্জনের মান ধরে রাখার শেষ অবলম্বন। ২০১৮ সাল থেকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু আইআরজিসি এই খাতের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তেহরানভিত্তিক একজন গবেষক বলেন, ‘আইআরজিসি ভর্তুকি মূল্যের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ক্রিপ্টো মাইনিং করছে এবং এর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ উপার্জন করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ’
ইরানের পুরো ক্রিপ্টো ব্যবস্থাকেই ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওফ্যাক)। ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো এখন ইরানিদের সঙ্গে কাজ করতে ভয় পাচ্ছে।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানে ক্রিপ্টো কার্যক্রম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের আগে নোবিটেক্স থেকে অর্থ সরানোর হার ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
ব্লকচেইন বিশ্লেষক সংস্থা এলিপ্টিক জানায়, হামলার প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই লেনদেনের পরিমাণ ৭০০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। এমনকি গত ১৮ জুন এক সাইবার হামলায় নোবিটেক্স থেকে ৯ কোটি ডলার সমমূল্যের সম্পদ চুরি হয়। তবে ইরানও তাদের কৌশল বদলাচ্ছে।
জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশ্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়াতে ৫০ কোটি ডলারের বেশি ‘ইউএসডিটি’ (ডলার সমর্থিত ক্রিপ্টোকারেন্সি) কিনেছে।
ইরান বড় পরিসরে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। তারা বলছে, দেশটির পক্ষ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারে সামনে আরও কঠোর পদক্ষেপ আসতে পারে।











































