সাবজাল হোসেন, কালিগঞ্জ
ভরাট হয়ে কমে গেছে গভীরতা। আর এ সুযোগে দু’পাড়ের দখলবাজেরাও চেপে ধরেছে। এখন দুর থেকে দেখলে মনে হয় এটি যেন একটি সরু খাল। এমন অবস্থা দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চালের কয়েকটি জেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত চিত্রা নদীর। অথচ এক সময় এই চিত্রার পানি দিয়েই চলতো কৃষকদের ফসলী ক্ষেতের সেচকাজ। দেশী জাতীয় নানা ধরনের মাছে আমিষের চাহিদা মেটাতো বিস্তর এলাকার মানুষ। সর্বোপরি সে সময়ে কয়েকটি জেলার কৃষি অর্থনীতিতে চিত্রার ভূমিকা থাকলেও সময়ের আবর্তে এখন তা অতীত।
বিগত বেশ কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর বর্ষা মৌসুমে বেশ ভারী বৃষ্টির দেখা মেলে। সে কারনে এখনও নদীর যে অংশ কিছুটা গভীর সেখানে পানি জমে আছে। এ পানিতেই জন্মেছে শিং,কই, মাগুর, টেংরা, সরপুটি, পাকালসহ নানা ধরনের দেশী মাছ। অনেকদিন পরে হলেও সকাল থেকেই নদীর দু’পাড়ের নারী পুরুষেরা মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠছেন। বসে থাকছে না বাড়ির ছোটরাও।
তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে,চিত্রা নদীটি দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চালের চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনার নিম্নাঞ্চল থেকে উৎপত্তি। যা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ,যশোরের বাঘাপাড়া ও নড়াইলের কালিয়া মধ্যদিয়ে নবগঙ্গায় মিলিত হয়েছে। পরে তা খুলনা দৌলতপুরের একদিকে ভৈরব অন্যদিকে খুলনার রুপসা নদীতে পড়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭২ কিলোমিটার। এক সময় এই নদীর পানির উপর নির্ভর করে এ অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ একর জমিতে উৎপাদিত হতো ধান,গম, আখ,পাটসহ নানা রকমের সবজি। কালীগঞ্জ উপজেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত চিত্রা নদীর অংশ দিয়েই এক সময় ঢাকা,ফরিদপুর,বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা আসতেন মালামাল বেচাকেনা করতে। নদী পথে মানুষ কম খরচে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতো। উন্মুক্ত নদী থেকে নানা জাতের মাছ ধরে মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ হতো।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীটির ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের অংশের কিছু কিছু এলাকা মাটি ভরাট হয়ে ফসলী মাঠে পরিণত হয়েছে। আর যেখানে একটু গভীর আছে সেখানে হাঁটু থেকে কোমর পানি জমে আছে। সরকারী নজরদারি ও খননের অভাবে দু’পাড়ের বাসিন্দাদের জমির পাশ ঘেষে নদীর জায়গা জড়িয়ে কেউ কেউ কেটেছেন বড় বড় পুকুর,গড়ে তুলেছেন বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ফলে চিত্রার কিছু অংশ আজ চিকন খালে পরিণত হয়েছে। দখলে দখলে মাটি ভরাট হওয়া এই নদী এখনই দখলে নিয়ে খননের সময়। না হলে এক সময়ের দক্ষিণাঞ্চালের কৃষি অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা চিত্রা নদী খননের জন্য অতীতে শুধু আশ্বাসই দেয়া হয়েছে। কিন্ত খনন হয়নি। তবে তাদের আশা দখলমুক্ত করে তাদের চিত্রা খননের এখনই সময়। তইে আগের মত প্রবাহমান হবে চিত্রা। আর না হলে এক সময় নদী খেকোদের পেটেই চলে যাবে দক্ষিণাঞ্চালের ঐতিহ্যবাহী চিত্রা।
মাছ ধরতে আসা কালীগঞ্জের হেলাই গ্রামের বাসিন্দা আমানত আলী জানান, ছোটবেলায় এ নদীতে বড় বড় নৌকা চলতে দেখেছি। মানুষ তখন নদী থেকে পর্যাপ্ত পরিমানে মাছ পেতো। কিন্ত এখন নেই। কারন নদীতে এখন পানি থাকে না। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। যতটুকু পানি তা আবার অল্প দিনেই শুকিয়ে যায়। কিন্ত ১০ বছর পর এ বছর বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় নদীতে পানি রয়েছে। যে পানিতে দেশী প্রজাতির অনেক মাছ জন্মেছে। প্রতিদিন কয়েক গ্রামের মানুষ আনন্দের সহিত মাছ ধরছেন। সকাল হলেই নদীতে মাছ ধরতে নেমে যাচ্ছে নারী পুরুষসহ সব বয়সী মানুষ। মোট কথা খুব আনন্দ পাচ্ছেন তারা। আবার মাছও পাচ্ছেন। তার দাবি, বর্তমান সরকার এ নদীটি খননের আওতায় আনলে নদীটির দুপাড়ের মানুষের মাছ চাহিদা পূরনসহ কৃষি কাজে এ নদীর পানি ব্যবহার করতে পারবেন।
কলেজছাত্র একই গ্রামের মাহাবুবুর রহমান জানান, সবাই নধীতে মাছ ধরছেন। তাই তিনিও এসেছেন। তিনি বলেন এ বছর নদীতে পানি থাকায় প্রচুর পরিমানে মাছ জন্মেছে যা এখন উৎসবের সাথে ধরছেন। তিনি বলেন, মাছ ধরা যে কত আনন্দ তা তিনি অনেকগুলো মাছ পেয়ে অনুভব করছেন।
ফয়লা গ্রামের সালেহা বেগম জানান, এক সময় তারা সারাবছর নদীতে গোসল করতেন। মাছ ধরতেন। কিন্ত এখন নদীতে তেমন পানি থাকে না। কিন্ত এবছর পানি থাকায় নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যাচ্ছে। তিনিও দুই ছেলেকে নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে এসেছেন। অনেকগুলো মাছ পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তাদের গ্রামের অনেক নারী পুরুষ বেশ কয়েকদিন ধরে আনন্দের সঙ্গে মাছ ধরছেন। শিশু কিশোররাও সাথে থাকছে। এক কথায় বেশ আনন্দ লাগছে।
তোতা মিয়া জানান, নদীতে ছোটবেলায় মাছ ধরেছেন। আর এ বছর নতুন করে ধরছেন। নদীতে এ বছর প্রচুর মাছ পাওয়া যাচ্ছে। সকাল হলেই নদীর দুপাড়ে অসংখ্য মানুষ জড়ো হচ্ছেন মাছ ধরতে এটি সকলকেই আনন্দ দিচ্ছে। তিনি বলেন নদীটি খনন করা হলে তারা সারা বছর দেশী জাতীয় মাছ ধরে খেতে পারবেন।
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস জানান, চিত্রানদী দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চালের মধ্যে অন্যতম বড় নদী। কিন্ত এখন ভরাট হয়ে গেছে। কৃষি অর্থনীতি জোরদান করতে হলে অবশ্যই সরকারীভাবে নদী খননের বিষয়টির গুরুত্ব দেয়া জরুরী। তিনি বলেন সুযোগ আসলে অবশ্যই চিত্রা নদী খননের বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া হবে।











































