কোটচাঁদপুর প্রতিনিধি
মহাকাশে মানুষের টেকসই বসতি গড়ার সাহসী স্বপ্নকে গবেষণার রূপ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পেয়েছে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাত শিক্ষার্থী। খাদ্য নিরাপত্তা, সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তুলে ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ঘধঃরড়হধষ ঝঢ়ধপব ঝড়পরবঃু আয়োজিত “খরারহম রহ ধ ঐবধষঃযু ঝঢ়ধপব” প্রতিযোগিতায় দশম গ্রেড (বড় দল) ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছে।
দলটির সদস্যরা হলেন খাজা আতিফ আবিদ, তসলিম উদ্দিন, আরেফিন সিদ্দিকী, ওমর ফারুক আল সাবিত, তাওফিক আহমেদ, তাসলিম আহমেদ ও মুনতাসির রহমান বিশ্বাস। তাদের গবেষণা প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল “অ ঠরংরড়হ ড়ভ ঐধৎসড়হু, ঐবধষঃয ধহফ চৎড়মৎবংং”। প্রায় এক বছর ধরে বিদ্যালয়ের ল্যাবে একসঙ্গে কাজ করে তারা এই প্রকল্পটি সম্পন্ন করে। নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণার কাজ চালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
খাজা আতিফ আবিদ জানান, ২০২৪ সালে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী একই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করলে তিনি অনুপ্রাণিত হন। এরপর ছয় সহপাঠীকে নিয়ে গঠন করেন একটি দল। ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর তারা গবেষণাপত্র জমা দেয়। ফলাফল প্রকাশিত হয় ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে। সেখান থেকেই তারা জানতে পারেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তাদের দল প্রথম হয়েছে।
তাদের প্রস্তাবিত চন্দ্র বসতি প্রকল্পের নাম “স্টেলার হ্যাভেন”। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে সেখানে ৭০ হাজার মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা থাকবে, যা ধীরে ধীরে ১ লাখ ৩০ হাজারে উন্নীত করা যাবে। পুরো স্থাপনাটি দুটি বৃহৎ ষড়ভুজ কাঠামো ও একটি কেন্দ্রীয় টাওয়ার ঘিরে নির্মিত হবে। এই কেন্দ্রীয় অংশ শক্তি সরবরাহ, বায়ু নিয়ন্ত্রণ, পানি বণ্টন এবং তথ্য আদান-প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে সহজে সম্প্রসারণের সুবিধাও রাখা হয়েছে নকশায়।
প্রকল্প অনুযায়ী প্রথম দুই বছরে ভিত্তি ও অবকাঠামো নির্মাণ, পরবর্তী সময়ে আবাসন, কৃষি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা উন্নয়ন করা হবে। দশ বছরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ চন্দ্র সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শক্তি ব্যবস্থাপনায় দিনের বেলায় সৌরশক্তি ব্যবহার এবং দীর্ঘ চন্দ্ররাতে ৪০ কিলোওয়াট ফিশন সারফেস পাওয়ার সিস্টেম ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। উন্নত শক্তি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষি, পানি পুনর্ব্যবহার ও আবাসিক অংশ সচল রাখা হবে।
খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মোট এলাকার প্রায় ৩৮ শতাংশ কৃষির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চাঁদের মাটিতে সরাসরি চাষ সম্ভব না হওয়ায় হাইড্রোপনিক্স ও অ্যারোপনিক্স প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে পালং শাক, লেটুস, টমেটো, স্ট্রবেরি, মটরশুঁটি, কুইনোয়া, ডাল ও বাদামজাতীয় ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রয়োজনীয় ক্যালরি, প্রোটিন ও ভিটামিন নিশ্চিত রাখতে সাপ্তাহিক খাদ্যতালিকাও পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়েছে।
চাঁদের উচ্চ বিকিরণ ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ প্রতিরোধী প্রাচীর, পানি স্তর, পলিথিন ও ধাতব আবরণ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকিরণ মাত্রা পর্যবেক্ষণ করবে। বাইরে কাজের সময় মহাকাশচারীদের জন্য থাকবে বিশেষ সুরক্ষিত পোশাক ও উন্নত লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক এই সাফল্যে শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বসিত হলেও সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে গিয়ে প্রকল্প উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু যাতায়াত ও অবস্থান ব্যয়ের বিষয়টি তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ। তারা সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে ভবিষ্যতে এগিয়ে যেতে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
কোটচাঁদপুরের এই সাত শিক্ষার্থীর সাফল্য শুধু তাদের বিদ্যালয় নয়, পুরো জেলার জন্যই গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে। মহাকাশে বসতি গড়ার স্বপ্ন এখন আর শুধু কল্পনা নয়, মেধা ও গবেষণার শক্তিতে তা বাস্তব সম্ভাবনার পথে











































