তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ হয়নি কাজ, ভবন নির্মাণের অগ্রগতি ৮০ শতাংশ
স্টাফ রিপোর্টার।।
ক্যানসার, কিডনি ও হৃদ্রোগের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে খুলনায় নির্মাণাধীন বিশেষায়িত হাসপাতালের জন্য অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। ২০২৩ সালের জুনে ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তিন দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পর এখন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জুন। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজারো রোগীর জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা চালুর সময় আরও পিছিয়ে গেল।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে নির্মাণাধীন ১৭ তলা এই হাসপাতাল ভবনের মূল কাঠামোর কাজ শেষ হয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, দরজা-জানালা, টাইলস ও বাইরের অংশের ফিনিশিংসহ বিভিন্ন কাজ এখনো চলছে। গণপূর্ত বিভাগের হিসাবে, ভবন নির্মাণের অগ্রগতি প্রায় ৮০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে প্রকল্পে কিডনি ও হৃদ্রোগের চিকিৎসাসেবা যুক্ত করা হয় এবং শয্যাসংখ্যাও বাড়ানো হয়। খুলনায় ২৮০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২২টি প্যাকেজের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে হাসপাতাল ভবন নির্মাণের চুক্তিমূল্য ৮২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
ভবন নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএন বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর চুক্তি হয়। প্রথমে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর, ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে মেয়াদ বাড়ানো হয়। এতেও কাজ শেষ না হওয়ায় সর্বশেষ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।
খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান জানান, প্রকল্পের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে নির্মাণকাজে বিলম্ব হয়েছে। তবে আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে ভবনটি হস্তান্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএন বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী শেখ দাউদ হায়দার বলেন, নির্মাণকাজ শুরুর আগে নির্ধারিত স্থানে থাকা পুরোনো স্থাপনা সরাতে হয়েছে। নকশা পেতেও দেরি হয়েছে। পাশাপাশি করোনা মহামারি, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, বিদ্যুৎ-সংকট, ডেঙ্গু এবং অর্থ বরাদ্দের জটিলতায় কাজের গতি ব্যাহত হয়েছে। তাঁর দাবি, অন্যান্য কয়েকটি বিভাগের তুলনায় খুলনায় দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করতেও প্রায় এক বছর দেরি হয়েছিল। বরাদ্দের অর্থ শেষ হয়ে গেলে নতুন অর্থছাড়ের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে।
চিকিৎসাসেবা চালু করতে লাগবে আরও সময়
ভবন নির্মাণ শেষ হলেই রোগীরা তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাবেন না। হাসপাতালটি চালু করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন, চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ এবং সেবা পরিচালনার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগের প্রধান চিকিৎসক মো. মুকিতুল হুদা বলেন, পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতালের ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও সেবা চালু করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন, জনবল নিয়োগ এবং অন্যান্য প্রস্তুতির জন্য সময় লাগবে।
বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর বিভাগটি চালু হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আলাদা পূর্ণাঙ্গ ভর্তি ব্যবস্থাও নেই। বহির্বিভাগে সীমিত পরিসরে কেমোথেরাপিসহ বিভিন্ন চিকিৎসা দেওয়া হয়।
বিভাগীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুটি পালায় ১২টি শয্যায় কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ওষুধ সরবরাহ করা হলে রোগীরা তা পান; সরবরাহ না থাকলে বাইরে থেকে কিনতে হয়। বছরে নতুন রোগী আসেন প্রায় দুই হাজার। পুরোনো রোগীদের ফলোআপসহ বছরে মোট রোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
এক ভবনে ক্যানসার, কিডনি ও হৃদ্রোগের চিকিৎসা
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ভবনে মোট ৪৫০টি শয্যা থাকবে। এর মধ্যে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য ১৮২টি, কিডনি রোগীদের জন্য ১৫৬টি এবং হৃদ্রোগের চিকিৎসায় ১১২টি শয্যা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভবনের বেজমেন্টের দ্বিতীয় তলা থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত ক্যানসার চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। সেখানে লিনিয়ার এক্সিলারেটর, সিটি সিমুলেটর, ব্র্যাকিথেরাপি ও কেমোথেরাপিসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
অষ্টম থেকে একাদশ তলা পর্যন্ত কিডনি রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে ডায়ালাইসিস, কিডনি প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার কক্ষ, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পরিচর্যা এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ তলা পর্যন্ত থাকবে হৃদ্রোগের চিকিৎসাসেবা। এ অংশে করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ), আইসিইউ, হৃদ্রোগের অস্ত্রোপচার কক্ষ, শিশুদের হৃদ্রোগের অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা এবং ক্যাথেটারাইজেশন ল্যাবরেটরি (ক্যাথল্যাব) স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, নতুন হাসপাতালটি চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়বে।











































